চট্টগ্রাম বন্দরের সবচেয়ে বড় নিউমুরিং কনটেইনার টার্মিনাল (এনসিটি) পরিচালনার জন্য দুবাইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান ডিপি ওয়ার্ল্ডের সঙ্গে ১৫ বছরের একটি চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়েছে। ২০১৯ সালে দুবাই সরকারের সঙ্গে সমঝোতা স্মারক সইয়ের পর দীর্ঘ প্রক্রিয়া শেষে এই চুক্তি হলো। বৃহস্পতিবার রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইনভেস্ট বাংলাদেশের (সাবেক বিডা) কার্যালয়ে আয়োজিত অনুষ্ঠানে এই চুক্তি সই হয়। চট্টগ্রাম বন্দরের চেয়ারম্যান রিয়ার অ্যাডমিরাল মো. মনিরুজ্জামান এবং ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম নিজ নিজ প্রতিষ্ঠানের পক্ষে চুক্তিতে স্বাক্ষর করেন।
২০০৭ সালে নির্মিত প্রায় এক কিলোমিটার দীর্ঘ এই টার্মিনাল দিয়ে চট্টগ্রাম বন্দরের মোট কনটেইনার ওঠানো-নামানোর ৪৪ শতাংশ সম্পন্ন হয়। বর্তমানে নৌবাহিনীর প্রতিষ্ঠান চিটাগং ড্রাইডক লিমিটেড এটি পরিচালনা করছে। নৌপরিবহনমন্ত্রী শেখ রবিউল আলম জানিয়েছেন, আগামী ছয় মাসের মধ্যে টার্মিনালটি পুরোপুরি ডিপি ওয়ার্ল্ডের কাছে বুঝিয়ে দেওয়া হবে। ১৫ বছর মেয়াদী এই চুক্তি দুই পক্ষের সম্মতিতে পরবর্তীতে নবায়ন করা সম্ভব হবে।
চুক্তি অনুযায়ী, ডিপি ওয়ার্ল্ডকে টার্মিনাল বুঝে নেওয়ার আগে স্থানীয় কোম্পানি গঠন, পরিবেশগত সমীক্ষা ও ছাড়পত্র জমা দিতে হবে। এছাড়া বন্দর কর্তৃপক্ষ একজন স্বতন্ত্র প্রকৌশলী নিয়োগ করবে যিনি যন্ত্রপাতি ও সম্পদের অবস্থা যাচাই করে প্রতিবেদন দেবেন। মন্ত্রী জানান, প্রথম ১০ বছরে ডিপি ওয়ার্ল্ড টার্মিনাল আধুনিকায়ন ও প্রযুক্তিতে এক হাজার কোটি টাকার বেশি বিনিয়োগ করবে। বর্তমানে প্রতি একক কনটেইনারে ১৪০ থেকে ১৫০ মার্কিন ডলার আয় হয় বন্দরের। এর বিপরীতে বন্দর কর্তৃপক্ষ এককালীন প্রায় ৬০০ কোটি টাকা অগ্রিম ফি পাবে এবং কনটেইনার প্রতি আয়ের ভিত্তিতে ৪০ থেকে ৬৭ শতাংশ পর্যন্ত রাজস্ব পাবে। এই আয়ের ৬৭ শতাংশ হিসাবে বন্দর পাবে ৯৩ ডলার ৮০ সেন্ট থেকে ১০০ ডলার ৫০ সেন্ট। এছাড়া ডিপি ওয়ার্ল্ড বছরে ১০ কোটি টাকার নির্ধারিত ফি দেবে এবং বছরে অন্তত ১২ লাখ ৩০ হাজার একক কনটেইনার হ্যান্ডলিংয়ের লক্ষ্যমাত্রা পূরণ করবে।
চুক্তি স্বাক্ষর অনুষ্ঠানে নৌপরিবহন প্রতিমন্ত্রী মো. রাজিব আহসান, বাংলাদেশে নিযুক্ত সংযুক্ত আরব আমিরাতের রাষ্ট্রদূত আবদুল্লাহ আলী আল হুমুদি ও ইনভেস্ট বাংলাদেশের চেয়ারম্যান আশিক চৌধুরী উপস্থিত ছিলেন। ডিপি ওয়ার্ল্ডের চেয়ারম্যান এসা কাজিম বাংলাদেশের লজিস্টিকস খাতে ভবিষ্যতে আরও বড় বিনিয়োগের আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। বন্দরের বে টার্মিনাল, রেলসংযোগ, সরবরাহব্যবস্থা ও মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল উন্নয়নে ১০০ কোটি বা এক বিলিয়ন ডলার পর্যন্ত বিনিয়োগের সুযোগ রয়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
তবে এই চুক্তি নিয়ে তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন বন্দর শ্রমিক ও বিভিন্ন বামপন্থী সংগঠন। চুক্তি সইয়ের সময় ইনভেস্ট বাংলাদেশ কার্যালয়ের বাইরে বিক্ষোভ প্রদর্শন করলে পুলিশ তা ছত্রভঙ্গ করে দেয়। শ্রমিকদের দাবি, বিদেশি অপারেটর নিয়োগের মাধ্যমে টার্মিনাল ইজারা দেওয়া দেশবিরোধী। যদিও সরকার ও নৌপরিবহনমন্ত্রী বারবার আশ্বস্ত করেছেন যে, এই চুক্তিতে বর্তমান কর্মীদের চাকরি হারানো বা ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। এছাড়া টার্মিনালের মালিকানা ও নিয়ন্ত্রণ বন্দর কর্তৃপক্ষের হাতেই থাকবে বলে মন্ত্রী উল্লেখ করেন।
চুক্তি নিয়ে ব্যবসায়ী মহলেও মিশ্র প্রতিক্রিয়া রয়েছে। চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক মাশুল না বাড়ানোর বিষয়টি নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তবে বন্দরের সাবেক পর্ষদ সদস্য জাফর আলম মনে করেন, আন্তর্জাতিক অপারেটর আসায় সেবার মান বাড়বে এবং বাণিজ্যে গতি আসবে। টার্মিনাল আধুনিকায়নের ফলে ব্যবসায়ীদের মাশুল ব্যয় ও পণ্য খালাসের সময় কমবে বলে আশা করা হচ্ছে।

















