দীর্ঘ ১৬ বছর পর আবারও ফুটবল বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়েছে ইউরোপের দেশ স্পেন। টানটান উত্তেজনার ফাইনালে তারা আর্জেন্টিনাকে ১-০ গোলে পরাজিত করে শিরোপা ঘরে তুলেছে। এই জয়ের মধ্য দিয়ে স্পেন ২০১০ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো বিশ্বকাপ শিরোপা জিতল। অন্যদিকে, নিজেদের ইতিহাসে প্রথমবারের মতো টানা দুই বিশ্বকাপ জয়ের হাতছানি ছিল আর্জেন্টিনার সামনে, যা অধরাই রয়ে গেল।
ম্যাচের ১০৫ মিনিটে স্পেনের হয়ে জয়সূচক গোলটি করেন ফেররান তরেস। বক্সের বাইরে থেকে নিকো উইলিয়ামস বলটা মাঠের ভেতরে রাখলে, অনেকটা ফাঁকায় পেয়ে যান তরেস। এরপরই তাঁর আগুনে এক শটে বল জালে জড়ায়। এই গোলের পর বিশ্বকাপ শিরোপা থেকে মাত্র ১৪ মিনিটের দূরত্বে চলে আসে স্পেন।
এর আগে, ম্যাচের শুরু থেকেই স্পেন ছিল শ্রেয়তর দল। প্রথমার্ধের প্রথম ৪৫ মিনিট এবং দ্বিতীয়ার্ধের শুরুর ২২ মিনিটেও তারাই বেশি আক্রমণ করেছে। প্রথমার্ধে বলের দখল ৬৫ শতাংশ সময় স্পেনের কাছে ছিল এবং তাদের শটও ছিল বেশি। ম্যাচের পঞ্চম মিনিটেই গোলের খুব কাছে চলে গিয়েছিল স্পেন, যখন ইয়ামালের শট দারুণভাবে ঠেকিয়ে দেন এমিলিয়ানো মার্তিনেজ। ৩৮ মিনিটে মিকেল ওইয়েরজাবালের একটি দারুণ শটও সহজেই ঠেকিয়ে দেন মার্তিনেজ।
আর্জেন্টিনা মাঝমাঠে লিয়ান্দ্রো পারেদেসের অনুপস্থিতি ভালোভাবেই টের পাচ্ছিল। তার অনুপস্থিতিতে ৪ জনের মিডফিল্ডকেও ভালোভাবেই চাপে রেখেছিল স্পেন। শারীরিক ফুটবলের সঙ্গে টেকনিক্যালিটির মিশেলে স্প্যানিশরাই হয়ে উঠেছিল শ্রেয়তর দল। প্রথমার্ধের ৪০ মিনিটে লিসান্দ্রো মার্তিনেজ ফাউল করে হলুদ কার্ড দেখেন এবং ৪৪ মিনিটে চোট নিয়ে মাঠ ছাড়তে বাধ্য হন। তার বদলে মাঠে নামেন নিকলাস ওতামেন্দি। প্রথমার্ধ গোলশূন্য (০-০) স্কোরলাইনে শেষ হয়।
দ্বিতীয়ার্ধের শুরুতে আর্জেন্টিনা কোচ স্কালোনি লিয়ান্দ্রো পারেদেসকে মাঠে নামাতে বাধ্য হন, নিকো গনজালেসকে তুলে নেন। এর আগে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৬০ মিনিট খেলে ইংলিশদের মাঝমাঠ অনেকটাই নিস্ক্রিয় রেখেছিলেন পারেদেস। দ্বিতীয়ার্ধে স্পেনের দানি অলমো দারুণভাবে আক্রমণে ঢুকে কুকুরেয়ার জন্য কাটব্যাক করলেও, গনজালো মন্তিয়েল দারুণভাবে বল ক্লিয়ার করে আর্জেন্টিনাকে বিপদ থেকে রক্ষা করেন।
ম্যাচের একপর্যায়ে আর্জেন্টিনা ১০ জনের দলে পরিণত হয়। এনজো ফার্নান্দেজ মাঝমাঠের ওপরে পাউ কুবারসির পায়ে পা লাগিয়ে দ্বিতীয় হলুদ কার্ড দেখে মাঠ ছাড়েন। এর আগে রদ্রি এর্নান্দেজের সঙ্গে সংঘর্ষে মাটিতে পড়ে গেলে রেফারি তাকে অভিনয়ের কারণে একটি হলুদ কার্ড দেখিয়েছিলেন। স্পেনের মিকেল মেরিনো একটি বড় সুযোগ পেয়েছিলেন, বাম পাশ থেকে ভেসে আসা ক্রসে ফাঁকায় বল পেয়েও তার হেড লক্ষ্যের বাইরে দিয়ে যায়। স্পেনের একটি গোল বাতিলও হয়। মেরিনোর শট মার্তিনেজ ঠেকিয়ে দিলে ফিরতি শটে নিকো উইলিয়ামস বল জালে জড়ান, তবে প্রথম শটের আগে মেরিনো নিকলাস ওতামেন্দিকে ফাউল করায় রেফারি গোলটি বাতিল করেন। বক্সের ঠিক বাইরে থেকে লামিন ইয়ামালের দারুণ ফ্রি কিক মার্তিনেজের সেভে আর্জেন্টিনাকে ম্যাচে টিকিয়ে রাখে।
বিশ্বকাপ ফাইনালের আগে ১৯৭৮ সালে জোড়া গোল করে আর্জেন্টিনাকে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপ জিতিয়েছিলেন মারিও আলবার্তো কেম্পেস। ২০১০ বিশ্বকাপের ফাইনালে আন্দ্রেস ইনিয়েস্তার গোলে প্রথম শিরোপা জিতেছিল স্পেন। এই দুই দলের প্রথম বিশ্বকাপ জয়ের নায়কদ্বয় আজ শিরোপা উঁচিয়ে ধরেন। মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পও এই ফাইনাল দেখতে নিউ জার্সি স্টেডিয়ামে হেলিকপ্টারে চড়ে এসেছিলেন এবং জয়ী দলের হাতে শিরোপা তুলে দেওয়ার কথা ছিল তার।
আর্জেন্টিনা এই ফাইনালে ৩টি পরিবর্তন নিয়ে নেমেছিল। গঞ্জালো মন্তিয়েল নাহুয়েল মলিনার জায়গায়, রদ্রিগো দে পল জুলিয়ানো সিমিওনের জায়গায় এবং ফিটনেস সমস্যায় থাকা লিয়ান্দ্রো পারেদেসের জায়গায় নিকোলাস গঞ্জালেস একাদশে ছিলেন।
স্পেনের একাদশ ছিল: সিমন; পোরো, কুবারসি, লাপোর্তে, কুকুরেয়া; রদ্রি, রুইজ; ইয়ামাল, ওলমো, বায়েনা; ওইয়েরজাবাল।
আর্জেন্টিনার চূড়ান্ত একাদশ ছিল: এমিলিয়ানো মার্তিনেজ; গঞ্জালো মন্তিয়েল, ক্রিশ্চিয়ান রোমেরো, লিসান্দ্রো মার্তিনেজ, নিকোলাস তালিয়াফিকো; রদ্রিগো দে পল, এনজো ফার্নান্দেজ, আলেক্সিস ম্যাক অ্যালিস্টার, নিকোলাস গঞ্জালেস; লিওনেল মেসি, হুলিয়ান আলভারেজ।
শুরুর ৪৫ মিনিটে আর্জেন্টিনা-স্পেনের কোনো দলই গোলের দেখা পেল না। ০-০ স্কোরলাইন নিয়ে প্রথমার্ধ শেষ ২০২৬ বিশ্বকাপের ফাইনালে।

















