স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, প্রস্তাবিত ‘গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইন ২০২৬’ বলপূর্বক গুমের শিকার ব্যক্তিদের সরাসরি আদালতে গিয়ে ন্যায়বিচার পাওয়ার পথ সুগম করবে। শনিবার সন্ধ্যায় রাজধানীর বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের প্রধান মিলনায়তনে ‘আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস’ উপলক্ষে ‘মায়ের ডাক’ আয়োজিত এক প্যানেল আলোচনা ও চিত্র প্রদর্শনীতে প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এ কথা বলেন। মন্ত্রী বলেন, এই আইন ভুক্তভোগীদের দীর্ঘমেয়াদী জটিল প্রক্রিয়ায় না ফেলে সরাসরি প্রতিকার পাওয়ার পথ উন্মুক্ত করেছে।
গত ২৭ আগস্ট সংসদে উত্থাপিত এই আইনের বিভিন্ন দিক তুলে ধরে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী জানান, অপরাধের গুরুত্ব অনুযায়ী এতে যাবজ্জীবন থেকে শুরু করে ক্ষেত্রবিশেষে মৃত্যুদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে। এছাড়া কোনো ব্যক্তি দীর্ঘকাল নিখোঁজ থাকলে পাঁচ বছর পর আদালতের অনুমতি সাপেক্ষে ওয়ারিশদের সম্পত্তির অধিকার লাভ এবং দায়ী পক্ষ ক্ষতিপূরণে ব্যর্থ হলে রাষ্ট্রের পক্ষ থেকে ক্ষতিপূরণের বিধানও যুক্ত করা হয়েছে। আইনটি বর্তমানে সংসদীয় কমিটিতে রয়েছে এবং যেকোনো গঠনমূলক পরামর্শ অন্তর্ভুক্ত করার সুযোগ রয়েছে বলে তিনি উল্লেখ করেন। পাশাপাশি ‘জাতীয় মানবাধিকার কমিশন আইন ২০২৬’ আন্তর্জাতিক মানদণ্ড ও জাতীয় চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে তৈরি করা হয়েছে বলেও জানান তিনি।
বাগেরহাটের মোংলায় মিরাজ শেখের কথিত গুমের বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, সুন্দরবন ও উপকূলীয় এলাকায় যৌথবাহিনীর অভিযানের ফলে কোণঠাসা হয়ে পড়া জলদস্যুরা কোস্টগার্ড অফিসে হামলা চালিয়েছিল। মিরাজ শেখের ইস্যুটি দস্যু দলগুলোর নিজেদের মধ্যকার দ্বন্দ্বের ফল। নিরপেক্ষ তদন্তে কোনো সরকারি বাহিনীর সম্পৃক্ততার প্রমাণ পাওয়া যায়নি, তবে স্বচ্ছতা বজায় রাখতে সরকার প্রয়োজনে স্বাধীন তদন্ত কমিশন গঠনে প্রস্তুত।
বর্তমান সরকারের বিগত ছয় মাসের কর্মকাণ্ডের কথা উল্লেখ করে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, এই সময়ে কোনো রাজনৈতিক নিপীড়ন, বিচারবহির্ভূত হত্যা বা গুমের ঘটনা ঘটেনি। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে পেশাদার হিসেবে গড়ে তুলতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে এবং র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়ন (র্যাব)-কে বিলুপ্ত করে জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে ‘স্পেশাল রেসপন্স ব্যাটালিয়ন (এসআরবি)’ গঠনের আইন ক্যাবিনেটে পাস হয়েছে।
নিজের গুম হওয়ার ব্যক্তিগত ভয়াবহ অভিজ্ঞতার বর্ণনা দিয়ে সালাহউদ্দিন আহমদ জানান, তাকে দীর্ঘ দিন অন্ধকার প্রকোষ্ঠে বন্দি রেখে অমানবিক নির্যাতন করা হয়েছিল এবং কোনো চিকিৎসা ছাড়াই চোখ বেঁধে ভারতের শিলংয়ে পাঠিয়ে দেওয়া হয়। সেখানে দীর্ঘ সাড়ে নয় বছর আইনি লড়াই শেষে তিনি খালাস পান। জুলাই গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে দেশ স্বাধীন হওয়ায় তিনি সাধারণ মানুষ ও বীর ছাত্রদের প্রতি গভীর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন।
অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন সংসদ সদস্য ও ‘মায়ের ডাক’-এর সমন্বয়ক সানজিদা ইসলাম তুলি। বিশেষ অতিথি হিসেবে সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়মসহ অন্যান্যদের মধ্যে হুমাম কাদের চৌধুরী, ব্যারিস্টার মীর আহমদ বিন কাসেম, ব্যারিস্টার সারা হোসেন, নূর খান লিটন, শহীদুল আলম ও নাজমুল আহসান বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানের শুরুতে গুম ও নির্যাতনের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে নীরবতা পালন এবং দোয়া করা হয়। এর আগে মন্ত্রী জাদুঘরে আয়োজিত সাত দিনব্যাপী বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন।
তিনি বলেন, অন্ধকার ও স্যাঁতসেঁতে ৫ বাই ১০ ফুটের এক অন্ধকার প্রকোষ্ঠে কোনো প্রকার ভেন্টিলেশন ছাড়াই তাকে দীর্ঘ দিন বন্দি রেখে মানসিক ও শারীরিকভাবে নির্যাতন করা হয়, যেখানে প্রতিটি মুহূর্ত মৃত্যুর আশঙ্কায় কেটেছে।
এর আগে মন্ত্রী বাংলাদেশ জাতীয় জাদুঘরের নলিনীকান্ত ভট্টশালী প্রদর্শনী গ্যালারিতে গুম ও নির্যাতনের ওপর আয়োজিত সাত দিনব্যাপী (২৯ আগস্ট থেকে ৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬) বিশেষ আলোকচিত্র প্রদর্শনীর উদ্বোধন করেন এবং প্রদর্শনীটি ঘুরে দেখেন।

















