প্রতি বছর ১৫ সেপ্টেম্বর বিশ্বজুড়ে পালিত হয় ‘আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবস’। গণতন্ত্রকে কেবল একটি শাসনব্যবস্থা নয়, বরং মানুষের মৌলিক সম্মান ও অধিকারের প্রতিফলন হিসেবে বিবেচনা করা হয়। একটি প্রকৃত গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে নাগরিকের ভোট ও ভাতের অধিকার সুনিশ্চিত থাকে। অন্ন, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসা, শিক্ষা ও বিনোদন—এই ছয়টি মৌলিক মানবিক অধিকার যেসব দেশে নিশ্চিত, সেগুলোকে গণতান্ত্রিক দেশ হিসেবে গণ্য করা হয়। তবে ইতিহাসের পাতায় চোখ রাখলে দেখা যায়, গণতন্ত্র অর্জনের পথ কখনোই সহজ ছিল না; প্রতিটি দেশকেই রক্ত ও ত্যাগের বিনিময়ে এই অধিকার অর্জন করতে হয়েছে।
২০০৭ সালে জাতিসংঘের সাধারণ পরিষদে প্রস্তাব গ্রহণের মাধ্যমে ১৫ সেপ্টেম্বরকে এই দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়। এর নেপথ্যে ছিল ১৯৮৭ সালে শুরু হওয়া গণতান্ত্রিক রূপান্তরের উদ্যোগ এবং ১৯৯৭ সালে ইন্টার-পার্লামেন্টারি ইউনিয়নের ‘গণতন্ত্র সংক্রান্ত সার্বজনীন ঘোষণা’। আন্তর্জাতিক গণতন্ত্র দিবসে জাতিসংঘের মূল প্রতিপাদ্য হলো: “Raising Hands and Voices – Fostering Agency and Ownership through Deliberative Democracy” বা হাত ও কণ্ঠস্বর তোলা – আলোচনামূলক বা deliberative গণতন্ত্রের মাধ্যমে নাগরিক সক্ষমতা ও মালিকানা বৃদ্ধি করা। ১৮৬৩ সালের ১৯ নভেম্বর আব্রাহাম লিঙ্কনের সেই ঐতিহাসিক ২৭২ শব্দের ভাষণ আজও গণতন্ত্রের মূলমন্ত্র হিসেবে স্বীকৃত, যেখানে তিনি বলেছিলেন, “গণতন্ত্র হচ্ছে জনগণের, জনগণের দ্বারা এবং জনগণের জন্য।”
তবে বর্তমান সময়ে গণতন্ত্রের বিশ্বব্যাপী পশ্চাদযাত্রা এক বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। অনেক দেশে গণতান্ত্রিক কাঠামোর আড়ালে কর্তৃত্ববাদ মাথাচাড়া দিয়ে উঠছে। আমেরিকান রাষ্ট্রবিজ্ঞানী স্যামুয়েল ফিলিপস হান্টিংটন তার ‘দ্য থার্ড ওয়েভ’ গ্রন্থে গণতন্ত্রের তিনটি জোয়ারের কথা উল্লেখ করেছেন। প্রথম জোয়ার ছিল ১৮২৮ থেকে ১৯২৬ সাল পর্যন্ত, দ্বিতীয়টি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর এবং তৃতীয়টি ১৯৭৪ থেকে ১৯৯১ সাল পর্যন্ত। ১৯৯৪ সাল নাগাদ বিশ্বে গণতান্ত্রিক দেশের সংখ্যা ৭২-এ পৌঁছালেও বর্তমানে সেই সংখ্যায় ভাটা পড়েছে। এরপর ১৯২০ থেকে ১৯৪০ সাল পর্যন্ত ২০ বছর গণতন্ত্রের ভাটার সময় ছিল। ১৯৫৮ থেকে ১৯৭০ সাল পর্যন্ত আবার গণতান্ত্রিক ধারায় নিম্নগামী দেখা যায়। বিশেষ করে ২০১৬ সাল থেকে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র এবং ২০১৪ সালের পর থেকে ভারতের গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানের ওপর আঘাত, বিভাজন ও মেরুকরণের ঘটনা বিশ্বজুড়ে সমালোচিত হচ্ছে।
গণতন্ত্রের অন্যতম মৌলিক ত্রুটি হিসেবে প্লেটো ‘দ্য রিপাবলিক’ গ্রন্থে এর সংখ্যাতাত্ত্বিক বিচারকে সমালোচনা করেছিলেন। তাঁর মতে, রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব প্রজ্ঞাবানদের হাতে থাকা উচিত, কিন্তু গণতন্ত্রে বিশেষজ্ঞের মত ও সাধারণ আবেগের মূল্য সমান হয়ে পড়ে। নির্বাচনে জেতার জন্য রাষ্ট্র পরিচালনার জ্ঞান নয়, বরং জনতাকে আবেগপ্রবণ করার ক্ষমতা (Demagoguery বা জনতুষ্টিবাদ) বেশি প্রয়োজন হয়। ফলে জনতুষ্টিবাদী বা পপুলিস্ট নেতারা অনেক সময় দূরদর্শী অর্থনীতিবিদদের চেয়ে বেশি ভোট পেয়ে যান। জন স্টুয়ার্ট মিল একে ‘সংখ্যাগরিষ্ঠের স্বৈরাচার’ (Tyranny of the Majority) হিসেবে অভিহিত করেছিলেন, যেখানে সংখ্যাগরিষ্ঠের ভুল সিদ্ধান্তও বৈধতা পায়। বর্তমানে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের অপব্যবহার ও আবেগ ম্যানিপুলেশনের মাধ্যমে কৃত্রিম জনমত তৈরি করা আরও সহজ হয়ে গেছে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, গণতন্ত্রকে সচল রাখতে নিরপেক্ষ নির্বাচন, সর্বজনীন শিক্ষা, সামাজিক ন্যায়বিচার এবং আইনের শাসন অপরিহার্য। উইনস্টন চার্চিলের ভাষায়, “গণতন্ত্র হলো নিকৃষ্টতম শাসনব্যবস্থা, তবে অন্য যেসব ব্যবস্থা এ পর্যন্ত পরীক্ষা করা হয়েছে, সেগুলোর চেয়ে এটি উন্নত।” অর্থাৎ গণতন্ত্র নিখুঁত নয়, এটি ক্রমাগত সংশোধনের দাবি রাখে। তাই একে অভ্রান্ত না ভেবে মেধাতন্ত্র ও স্বচ্ছতার সমন্বয় ঘটানোই এখন সময়ের দাবি।
একে পবিত্র ও অভ্রান্ত মনে না করে বরং এর ভেতরে মেধাতন্ত্রের (Meritocracy) সমন্বয় এবং প্রাতিষ্ঠানিক স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা না গেলে এটি বারবার ব্যর্থ হতে বাধ্য।

















