কিশোরগঞ্জের ইটনা উপজেলায় সরকারি বরাদ্দের ওপর নির্ভর না করে প্রায় এক কোটি টাকা ব্যয়ে গ্রামবাসীর নিজস্ব অর্থায়নে একটি স্টিলের সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণ করা হচ্ছে। উপজেলার রায়টুটি ইউনিয়নের বন্নী নদীর ওপর নির্মিত এই সেতুটি পংধূলন, হরিপুর ও গল্লী গ্রামের প্রায় আট হাজার মানুষের দীর্ঘদিনের যোগাযোগ দুর্ভোগ লাঘবের নতুন আশা জাগিয়েছে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গেছে, রায়টুটি ইউনিয়নের ১ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত এই তিনটি গ্রামের মানুষের চলাচলের প্রধান অন্তরায় ছিল বন্নী নদী। দীর্ঘদিন ধরে নদী পারাপারে, বিশেষ করে বর্ষা মৌসুমে, শিক্ষার্থী, কৃষক ও সাধারণ মানুষ চরম ভোগান্তির শিকার হচ্ছিলেন। নৌকার ওপর নির্ভর করে নদী পার হতে হওয়ায় কৃষিকাজ, ফসল পরিবহন, শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণেও নানা সমস্যা দেখা দিত। এই পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের লক্ষ্যে, সরকারি বরাদ্দের জন্য অপেক্ষা না করে স্থানীয়রা নিজেরাই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেন।
সাবেক ছাত্রদল নেতা মিজানুরের উদ্যোগে স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে সম্মিলিতভাবে অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু হয়েছে। চলতি বছর শুরু হওয়া এই প্রকল্পে গ্রামের বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী আর্থিক সহযোগিতা করছেন। সেতু ও সংযোগ সড়ক নির্মাণে মোট ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় এক কোটি টাকা।
স্থানীয় বাসিন্দা আল মামুন জানান, সেতুটি নির্মিত হলে কৃষিক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সুফল পাওয়া যাবে। এলাকার অধিকাংশ মানুষ কৃষির ওপর নির্ভরশীল হলেও যোগাযোগ ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতার কারণে উৎপাদিত ফসল বাজারজাত করতে সমস্যায় পড়েন। বিশেষ করে বোরো মৌসুমে জমিতে যাতায়াত ও ফসল ঘরে তোলা বেশ কষ্টসাধ্য হয়ে ওঠে। এছাড়া, নদী পারাপারের কারণে শিক্ষা ও চিকিৎসাসেবা গ্রহণেও ভোগান্তি পোহাতে হয়। সেতু চালু হলে এসব সমস্যার অনেকটাই সমাধান হবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।
এমদাদুল হক নামে আরেক বাসিন্দা বলেন, দীর্ঘদিন ধরে সেতুর অভাবে তিন গ্রামের মানুষ দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন এবং বর্ষাকালে নদী পারাপার আরও কঠিন হয়ে পড়ে। নিজেদের অর্থায়নে গ্রামবাসীর এমন উদ্যোগ নিঃসন্দেহে প্রশংসনীয়। সেতুটি চালু হলে যোগাযোগ ব্যবস্থার উন্নতির পাশাপাশি স্থানীয় অর্থনীতিতেও ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। ব্যাটারিচালিত অটোরিকশাসহ বিভিন্ন পরিবহন ও ব্যবসায়িক কর্মকাণ্ডে যুক্ত হওয়ার সুযোগ তৈরি হবে, যা এলাকার বেকার যুবকদের কর্মসংস্থানের সম্ভাবনাও বাড়াবে।
সেতু নির্মাণের উদ্যোগ সম্পর্কে মিজানুর বলেন, তিন গ্রামের মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ বিবেচনা করেই তারা এই উদ্যোগ নিয়েছেন। সরকারি বরাদ্দের অপেক্ষায় থাকলে হয়তো আরও দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতো। তাই স্থানীয়দের সঙ্গে আলোচনা করে নিজেরাই অর্থ সংগ্রহের মাধ্যমে নির্মাণকাজ শুরু করেছেন। তিনি আরও বলেন, একটি সেতুর অভাবে এলাকার মানুষ সামাজিক, অর্থনৈতিক, শিক্ষাসহ চিকিৎসাসেবার ক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছেন। এসব সমস্যা বিবেচনায় নিয়েই সেতু নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তবে, নির্মাণকাজ সম্পন্ন করতে আরও অর্থের প্রয়োজন। এ জন্য কিশোরগঞ্জ-৪ আসনের সংসদ সদস্য অ্যাডভোকেট ফজলুর রহমানের সহযোগিতা ও সুদৃষ্টি কামনা করেন তিনি।
গ্রামবাসীর কাছে এই সেতুটি কেবল নদীর ওপর একটি অবকাঠামো নয়, বরং দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ থেকে মুক্তির প্রত্যাশা। নিজেদের প্রয়োজনেই ঐক্যবদ্ধ হয়ে অর্থ সংগ্রহ করে সেতু নির্মাণের এই উদ্যোগ স্থানীয়দের মধ্যে আশার সঞ্চার করেছে। নির্মাণকাজ শেষ হলে তিন গ্রামের প্রায় আট হাজার মানুষের যোগাযোগ, কৃষি ও দৈনন্দিন জীবনযাত্রায় ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে তারা প্রত্যাশা করছেন।

















