একাত্তরে জামায়াতে ইসলামীর ভূমিকা নিয়ে ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক যে বিবৃতির খসড়া তৈরি করেছিলেন, সেটিতে তৎকালীন সময়ে স্বাক্ষর করা হলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হয়ে যেত বলে মন্তব্য করেছেন আইন, বিচার ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে তিনি এই দাবি করেন। ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এই অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল।
আইনমন্ত্রী বলেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাক একাত্তর নিয়ে যে মূল্যায়ন করেছিলেন, সে বিষয়ে তিনি জাতির কাছে একটি স্টেটমেন্ট করার কথা বলেছিলেন। মন্ত্রীর মতে, ওই স্টেটমেন্টের আলোকেই জামায়াতের আজকের অবস্থান এবং সেই সময় স্বাক্ষর করা হলে অনেক জটিলতার অবসান ঘটত। এ প্রসঙ্গে তিনি জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল (জামুকা) আইন সংশোধনের বিষয়টি তুলে ধরেন। তিনি ব্যাখ্যা করেন যে, মুক্তিযোদ্ধার সংজ্ঞায় ১৯৭১ সালের পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, তৎকালীন আল-বদর, রাজাকার, মুসলিম লীগ ও জামায়াতে ইসলামীর মতো পক্ষগুলোর বিরোধিতাকারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে।
সংশোধনী নিয়ে আলোচনার সময় জামায়াতে ইসলামীর নাম বাদ দেওয়ার দাবি উঠলেও ঐতিহাসিক সত্য অস্বীকার করা সম্ভব নয় বলে মন্ত্রী জানান। তিনি বলেন, সংসদে আইনটি উপস্থাপনের পর ভোটের সময় জামায়াত ওই সংশোধনীর বিরুদ্ধে ‘না’ ভোট দেয়নি। সংসদীয় প্রক্রিয়ায় অংশ নিয়ে ‘না’ ভোট না দেওয়ার মাধ্যমে জামায়াত পরোক্ষভাবে একাত্তরের সেই ভূমিকা স্বীকার করেছে বলে তিনি মন্তব্য করেন। আসাদুজ্জামান বলেন, ব্যারিস্টার রাজ্জাকের দূরদর্শিতা এখানেই প্রকাশ পায় যে, তিনি রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি অনুসরণ করে একাত্তরের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার জন্য ওই স্টেটমেন্টটি ড্রাফট করেছিলেন।
ব্যারিস্টার রাজ্জাকের সঙ্গে নিজের ব্যক্তিগত সম্পর্কের স্মৃতিচারণ করে আইনমন্ত্রী জানান, আদর্শগতভাবে তারা ভিন্ন মেরুতে থাকলেও আইন পেশায় জুনিয়র হিসেবে রাজ্জাকের নির্দেশনা তার কাছে আলোর দিশারির মতো ছিল। তিনি বলেন, রাজ্জাকের বই পড়ে মনে হয়েছে, প্রতিক্রিয়াশীলতার বৃত্ত ভেঙে জামায়াতকে একটি প্রগতিশীল ইসলামি দলে রূপান্তর করার যে স্বপ্ন তিনি দেখতেন, বইটি তারই বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া ওপর থেকে ইসলামি শাসন চাপিয়ে দেওয়ার পরিবর্তে সমাজ থেকে ইসলামি মূল্যবোধের আলোকে রাষ্ট্র গঠনের যে দর্শন রাজ্জাকের ছিল, তাও বইটিতে উঠে এসেছে।
আইনমন্ত্রী আরও বলেন, বইটি কেবল গবেষণা বা সাহিত্য নয়, বরং এটি একজন জীবন্ত মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো। তিনি আরও যোগ করেন, জামায়াতের সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল হিসেবে দায়িত্ব পালন করলেও রাজ্জাক নিজ গুণে একটি প্রতিষ্ঠানে পরিণত হয়েছিলেন। সবশেষে মন্ত্রীর সঙ্গে রাজ্জাকের শেষ কথোপকথনের স্মৃতিচারণ করে জানানো হয়, রাজ্জাক তার জন্য দোয়া চেয়েছিলেন এবং বাংলাদেশের মাটিতে দাফন হওয়ার ইচ্ছার কথা জানিয়েছিলেন, যা জুলাইয়ের আন্দোলনের মধ্য দিয়ে পূর্ণ হয়েছে। অনুষ্ঠানে জামায়াতের আইনজীবী হিসেবে পরিচিত ব্যক্তিদের উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, তাদের দ্বিমত পোষণ করার সুযোগ ছিল, কারণ সেটিই গণতন্ত্রের অংশ।
শুক্রবার (১৮ সেপ্টেম্বর) সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে প্রয়াত ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের ‘বাংলাদেশ জামায়াত-ই-ইসলামী: ইটস হিস্ট্রি অ্যান্ড পলিটিকস’ বইয়ের প্রকাশনা অনুষ্ঠানে সমাপনী বক্তব্যে এসব কথা বলেন আইনমন্ত্রী। বইটির প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান ইউনিভার্সিটি প্রেস লিমিটেড (ইউপিএল) এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করে।

















