আইন, বিচার ও সংসদ বিষয়ক মন্ত্রী আনিসুল হক বলেছেন, জামায়াতে ইসলামী ক্ষমা না চাইলেও পরোক্ষভাবে ১৯৭১ সালে তাদের অবস্থান মেনে নিয়েছে। তিনি শুক্রবার সকালে রাজধানীর গুলশানের একটি হোটেলে ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের লেখা বইয়ের মোড়ক উন্মোচন অনুষ্ঠানে উপস্থিত হয়ে এ মন্তব্য করেন।
প্রসঙ্গত, জামায়াতের সাবেক সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাক তার বইয়ে দলটিকে ১৯৭১ সালের অপরাধের জন্য জাতির কাছে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানিয়েছিলেন। এই তথ্যটি তিনি তার বইয়ে উল্লেখ করেছেন এবং এর পরিপ্রেক্ষিতেই আইনমন্ত্রী এই মন্তব্য করেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, ইসলামিক শাসন কায়েম করে চাপিয়ে দেওয়া একটি ভ্রান্ত নীতি। বরং সমাজ থেকে ইসলামিক মূল্যবোধের আলোকে একটি রাষ্ট্র গঠিত হোক এবং রাষ্ট্র পরিচালিত হোক— এটাই হবে প্রকৃত ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের সঠিক পথ। তিনি বলেন, ব্যারিস্টার আব্দুর রাজ্জাকের বইয়ে বিষয়টি ঠিক এভাবেই এসেছে। আমি রাজ্জাক সাহেবের ইসলামিক রাষ্ট্র ব্যবস্থা কায়েমের চিন্তার সাথে দ্বিমত পোষণ করতে পারি, কিন্তু একটি মূল্যবোধের জায়গা থেকে, একটি রাষ্ট্রব্যবস্থার জায়গা থেকে আমার ধারণা, এটি আইনজ্ঞদের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এই বইটি আমার কাছে সাহিত্য বা গবেষণাধর্মী মনে হয়নি, বরং এটি একজন জীবন্ত মানুষের এনসাইক্লোপিডিয়ার মতো মনে হয়েছে। রাজ্জাক সাহেব একটি সমাজকে তার জীবন দিয়ে যেভাবে দেখেছেন, তার জীবন দর্শন যেভাবে ছিল— এই বইটি তারই প্রতিফলন।
তিনি আরও বলেন, বইটিতে জামায়াতের কথা বলা হয়েছে। আজকে জামায়াতের যারা মূলধারার আইনজীবী হিসেবে সুপ্রিম কোর্ট বা আমাদের এই অঙ্গনে পরিচিত, জামায়াতের যারা নেতৃত্ব দিচ্ছেন— তাদের আজকের আলোচনায় উপস্থিত থাকার প্রত্যাশা ছিল। তারা কেউ উপস্থিত হতে পারেনি, যা তাদের দীনতা, ব্যর্থতা, সংকীর্ণতা ও সীমাবদ্ধতা। তারা উপস্থিত হয়ে বইয়ের সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করতে পারতেন, কারণ এটাই গণতন্ত্র। আপনি রাজ্জাক সাহেবের সব কথার সঙ্গে একমত হবেন— এটা যেমন সত্যি নয়, আবার তার সমালোচনা গ্রহণ করতে পারবেন না— এটাও সঠিক নয়। এই বইয়ের মধ্যে বিএনপি সম্পর্কে সমালোচনা করা হয়েছে, যা আমাদের গ্রহণ করতে হবে। আমরা যদি এটা ধারণ করতে না পারি, তাহলে সমাজ ব্যবস্থা নিয়ে আমরা এগিয়ে যেতে পারবো না।
আইনমন্ত্রী বলেন, রাজ্জাক সাহেব ৭১ নিয়ে যে মূল্যায়ন করেছেন এবং জাতির কাছে একটি স্টেটমেন্ট দেওয়ার কথা বলেছেন, রাজ্জাক সাহেবের এই স্টেটমেন্টটি ২০১৬ সালে যদি জামায়াত গ্রহণ করতো, তাহলে দলটির অনেক প্রশ্নের সমাধান হতো। তিনি মনে করেন, এই স্টেটমেন্টের আলোকেই জামায়াতের আজকের অবস্থান।
জাতীয় মুক্তিযোদ্ধা কাউন্সিল আইন ২০২২-এ মুক্তিযোদ্ধাদের একটি সংজ্ঞা দেওয়া হয়েছে। সেই সংজ্ঞার মধ্যে ১৯৭১ সালে জামায়াতে ইসলামী যে বাংলাদেশের স্বাধীনতাকামী মানুষের বিরোধিতা করেছিল, সেই বিষয়টি অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। এটিতে ২০২৫ সালের সংশোধনীতে কিছু পরিবর্তন আনা হয়। আমরা ২০২৬ সালে এটি অ্যাক্ট অফ পার্লামেন্ট করতে গেলে বিশেষ কমিটিতে এই বিষয়টি আনা হয়। তখন দলটির পক্ষ থেকে বলা হয়েছিল, জামায়াতের নামটা এখান থেকে বাদ দেওয়া যাবে কিনা।
তিনি আরও বলেন, সেখানে সংশোধনীতে বলা হলো যে, ‘মুক্তিযোদ্ধা কারা?’ সংজ্ঞায় বলা হয়েছে, যারা ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী, পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী, রাজাকার, আল বদর, জামায়াতে ইসলামী, মুসলিম লীগ ও নেজামে ইসলামী পার্টির বিরোধিতা করেছেন, দেশ স্বাধীনের জন্য সংগ্রাম করেছেন— তারাই মুক্তিযোদ্ধা। জামায়াতের দাবি ছিল, জামায়াতের নামটা ওখান থেকে বাদ দিয়ে দেওয়া হোক। আমরা বলেছিলাম, ঐতিহাসিক সত্যটাকে আমরা অস্বীকার করতে পারি না। আলোচনার এক পর্যায়ে সেখানে শুধু লেখা হলো ‘তৎকালীন জামায়াতে ইসলামী’, ‘তৎকালীন মুসলিম লীগ’, ‘তৎকালীন নেজামে ইসলাম’। পরে পার্লামেন্টে এই আইনটি পেশ করা হয়। আপনারা জানেন যে পার্লামেন্টে আইন পাস করতে গেলে ‘হ্যাঁ’ এবং ‘না’ ভোট দেওয়া যায়। জামায়াতে ইসলামীর কোনো সদস্য এতে ‘না’ ভোট দেননি। এটা রেকর্ডভুক্ত, জামায়াত ‘না’ ভোট দেয়নি।
তিনি আরও বলেন, ২০১৬ সালে ব্যারিস্টার রাজ্জাক যে রাজনৈতিক দর্শন ও নীতি অনুসরণ করে একটি স্টেটমেন্ট ড্রাফট করেছিলেন, যেখানে তিনি একাত্তরে জামায়াতের ভূমিকাকে জাতির সামনে আনার চেষ্টা করেছেন। জামায়াত পরোক্ষভাবে ‘না’ ভোট না দেওয়ার মধ্য দিয়ে একাত্তরের সেই ভূমিকাকে মেনে নিল, পার্লামেন্টারি প্রক্রিয়ায় অংশগ্রহণ করে। এখানেই রাজ্জাক সাহেবের দূরদর্শিতা প্রকাশ পায়।
ব্যারিস্টার আবদুর রাজ্জাক রচিত বইটি প্রকাশ করেছে University Press Limited।
অনুষ্ঠানে প্যানেলিস্ট হিসেবে আরও উপস্থিত ছিলেন যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির ডিপার্টমেন্ট অব পলিটিক্স অ্যান্ড গভর্নমেন্টের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর আলী রীয়াজ, ওয়াশিংটন ডিসিভিত্তিক Right to Freedom-এর প্রেসিডেন্ট ও সাবেক মার্কিন কূটনীতিক জন ড্যানিলোভিচ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সাবেক অধ্যাপক দিলারা চৌধুরী এবং দ্য ডেইলি স্টার-এর কনসালটিং এডিটর ও বিগত অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের সময়ে গঠিত মিডিয়া রিফর্ম কমিশনের চেয়ারম্যান কামাল আহমেদ।
















