সাত ম্যাচে আট গোল ও চার অ্যাসিস্টের অবিশ্বাস্য পারফরম্যান্সে আর্জেন্টিনাকে বিশ্বকাপের ফাইনালে তুলে লিওনেল মেসি এখন ফুটবল বিশ্বের অন্যতম সুখী মানুষ। ৩৯ বছর বয়সে এসেও তিনি সবুজ গালিচায় যে ফুটবলীয় ঐশ্বর্য প্রদর্শন করছেন, তাতে বিশ্ববাসী বিস্মিত। রোজারিওর সেই ছেলে, যার শৈশবের স্বপ্নে বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছিল হরমোনজনিত রোগ, তিনি আজ নিজের ষষ্ঠ বিশ্বকাপে এসে এক অত্যাশ্চর্য জাদুকরে পরিণত হয়েছেন। তার ফুটবল-যৌবন হয়তো আগের মতো নেই, কিন্তু তার ফুটবলীয় বুদ্ধিমত্তা তাকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে।
বিশ্বকাপের দ্বিতীয় সেমিফাইনালে আটলান্টায় ইংল্যান্ডের বিপক্ষে তার এই জাদুকরী রূপ আবারও ফুটে উঠেছে। ১-০ গোলে পিছিয়ে থাকা ম্যাচে যখন ইংল্যান্ড জয়ের স্বপ্ন দেখছিল, ঠিক তখনই মাঠে থাকা আর্জেন্টিনার আসল কোচ হিসেবে মেসি আবির্ভূত হন। ৮৫ ও ৯২ মিনিটে তার দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্ট থেকে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাওতারো মার্তিনেজ গোল করে ইংল্যান্ডের স্বপ্ন ধূলিসাৎ করে দেন। এই জয়ে লন্ডন স্তব্ধ হলেও বুয়েনস এইরেসে ছড়িয়ে পড়ে উৎসবের আমেজ।
পুরো ম্যাচে ৯০ মিনিটে ৯৪ বার বল স্পর্শ করা মেসি নয়টি সফল ড্রিবল ও চারটি সুযোগ তৈরির পাশাপাশি দুটি ম্যাচজয়ী অ্যাসিস্ট করেছেন। বিশ্বকাপের ইতিহাসে ১২টি অ্যাসিস্টের মালিক হয়ে তিনি তার পূর্বসূরি দিয়েগো ম্যারাডোনাকে চার ধাপ পেছনে ফেলেছেন, যিনি মোট আটটি গোলে সহায়তা করেছিলেন। এই বিশ্বকাপে মেসি কম দৌড়ালেও সুযোগ তৈরিতে অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ৩৩টি শট ও ২১টি সুযোগ তৈরির মাধ্যমে তিনি প্রমাণ করেছেন কেন তাকে ফুটবলের রাজা বলা হয়।
শৈশবের আইডল পাবলো আইমারের কথা অনুযায়ী, শেষ মেসিই সবসময় সেরা মেসি। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপ তাকে সোনালি ট্রফি উপহার দিয়ে বর্ণিল ক্যারিয়ার পূর্ণতা দিয়েছিল। ২০২৬ বিশ্বকাপেও যদি তিনি মুকুট ধরে রাখতে পারেন, তবে সেটি হবে এক ঐতিহাসিক অর্জন। মেসি এই জয় উৎসর্গ করেছেন ম্যারাডোনা ও তার দাদিকে, যিনি শৈশবে তাকে বল পায়ে সমুদ্রের ঢেউয়ের মতো আছড়ে পড়ার শিক্ষা দিয়েছিলেন। নিউইয়র্ক-নিউজার্সির মেটলাইফ স্টেডিয়ামে রবিবাসরীয় ফাইনালে মেসির সেই ঢেউয়ের দাপটে স্পেন যদি ভেসে যায়, তবে তা অবাক করার মতো কিছু হবে না।
ফুটবলে একজন কোচ থাকেন ডাগআউটে। আরেকজন মাঠে। মেসি তখন মাঠে আর্জেন্টিনার কোচ। বাঁশিটা হাতে নিলেন। ৮৫ ও ৯২ মিনিটে তার দুটি জাদুকরী অ্যাসিস্টে এনজো ফার্নান্দেজ এবং লাওতারো মার্তিনেজের গোল। মেসি যেন গোল নয়, রসগোল্লা বানিয়ে দিয়েছিলেন। তার দুই সতীর্থ টপ করে গিলে ফেললেন। ইংল্যান্ড হতবাক। লন্ডন স্তব্ধ। বুয়েনস এইরেসে যৌবন গর্জন। টেমস নদীর ঢেউয়েরও আফসোস-‘ইটস নট কামিং হোম’। সেই ১৯৬৬ থেকে অপেক্ষায় ইংল্যান্ড। খরা ঘুচবে। সাহেবদের খরাজর্জর দুঃসময় আরও দীর্ঘায়িত করলেন ম্যাজিশিয়ান মেসি।
এও এক জাদু যে, এই বিশ্বকাপে মেসি দৌড়াচ্ছেন কম, সুযোগ তৈরি করছেন বেশি। আটটি গোল এবং চারটি অ্যাসিস্ট। সেমিফাইনাল পর্যন্ত সাত ম্যাচে জাদুকর ৩৩টি শট নিয়েছেন। সুযোগ তৈরি করে দিয়েছেন ২১টি। ১৯৮৬ বিশ্বকাপে ম্যারাডোনার অবদান ছিল এরচেয়ে কম। আরেকটি আশ্চর্যের বিষয়, মেসি মাঠে যেন হাঁটছেন। কিন্তু বল তার পায়ে গেলে বিদ্যুতায়িত হয়ে যান তিনি। দর্শকরা চোখের পলক ফেলেন না। যদি কোনো হিরণ্ময় মুহূর্ত মিস হয়ে যায়। গোটা পৃথিবী তখন বদলে যায়। চাঁদ ফিসফিস করে জ্যোৎস্নাকে বলে, নাচ তো একটু। মেসি এখন ম্যাজিক দেখাবে।

















