ইরানের ওপর মার্কিন-ইসরায়েল যুদ্ধের প্রাক্কালে মধ্যপ্রাচ্যসহ প্রধান শ্রমবাজারগুলোতে তৈরি হওয়া অনিশ্চয়তার কারণে বাংলাদেশের জনশক্তি রপ্তানি উল্লেখযোগ্যভাবে কমে গেছে। যুদ্ধের উত্তাপ এখন রেমিট্যান্সের ওপরও প্রভাব ফেলতে শুরু করেছে। খাত সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমান যুদ্ধাবস্থার কারণে অনেক দেশ তাদের ভিসা প্রক্রিয়া কঠোর করেছে অথবা সাময়িকভাবে নতুন কর্মী নিয়োগ স্থগিত রেখেছে। এছাড়া বিমান চলাচল বিঘ্নিত হওয়ার কারণেও কাঙ্ক্ষিত হারে কর্মী পাঠানো সম্ভব হচ্ছে না। অর্থনীতিবিদরা সতর্ক করে বলেছেন, যুদ্ধ পরিস্থিতি দীর্ঘায়িত হলে এবং দ্রুত বিকল্প শ্রমবাজার উন্মুক্ত করতে না পারলে দেশের সার্বিক বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ ও রেমিট্যান্স প্রবাহে বড় ধরনের আঘাত আসতে পারে। ইতিমধ্যে চলমান এই সংঘাতে ১২ জন বাংলাদেশি প্রাণ হারিয়েছেন এবং তেহরান কর্তৃক মধ্যপ্রাচ্যের আরব দেশগুলোতে অবস্থিত মার্কিন সামরিক ঘাঁটি ও স্বার্থসংশ্লিষ্ট স্থাপনায় ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের ঘটনা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
বিএমইটি-এর সর্বশেষ পরিসংখ্যান অনুযায়ী, ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত এক বছরে বাংলাদেশ থেকে প্রায় ৯ লাখ ৮৫ হাজার কর্মী বিদেশে গেছেন, যা আগের বছরের ১০ লাখ ১৫ হাজার ৭০৭ জনের তুলনায় প্রায় ৩০ হাজার বা ৩ শতাংশ কম। এর মধ্যে মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলোতে কর্মসংস্থান কমেছে ১ লাখ ৪ হাজার বা ১১.৭ শতাংশ। ২০২৪ সালের জুলাই থেকে ২০২৫ সালের জুন পর্যন্ত মধ্যপ্রাচ্যে ৮ লাখ ৮৯ হাজার কর্মী গেলেও, চলতি সময়ে সেই সংখ্যা নেমে এসেছে ৭ লাখ ৮৫ হাজারে। তবে ইউরোপের দেশগুলোতে চিত্র সম্পূর্ণ বিপরীত; সেখানে কর্মী যাওয়ার হার প্রায় দ্বিগুণ বেড়েছে। গত এক বছরে ইউরোপে প্রায় ৩৯ হাজার বাংলাদেশি কর্মী গিয়েছেন, যার মধ্যে সর্বাধিক ১১ হাজার ৪১৭ জন ইতালিতে পাড়ি জমিয়েছেন। এছাড়া পর্তুগাল, রাশিয়া, সার্বিয়া, সাইপ্রাস ও বেলারুশের মতো দেশেও উল্লেখযোগ্য সংখ্যক কর্মী নিয়োগ পেয়েছেন।
চলমান অনিশ্চয়তার কারণে সদ্য সমাপ্ত ২০২৫-২৬ অর্থবছরে বাংলাদেশিদের বৈদেশিক কর্মসংস্থান পাঁচ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পর্যায়ে নেমে এসেছে। বিশেষ করে সংযুক্ত আরব আমিরাত, ওমান এবং জর্ডানের মতো দেশগুলোতে ভিসা সংক্রান্ত কঠোরতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। বায়রার এক শীর্ষ কর্মকর্তা জানান, মধ্যপ্রাচ্যের বড় কোম্পানিগুলো নতুন লোকবল নিয়োগে ঝুঁকি নিতে চাইছে না। এছাড়া বিমান ভাড়া বৃদ্ধি পাওয়ায় মালয়েশিয়া বা পূর্ব এশিয়ার দেশগুলোতে কর্মী পাঠানোর খরচ বেড়ে যাওয়া সাধারণ কর্মীদের জন্য বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে।
অভিবাসন বিশেষজ্ঞ শরিফুল হাসান জানান, ২০১৫ থেকে ২০২৫ অর্থবছরের মধ্যে ৮৬ লাখেরও বেশি মানুষ কাজের জন্য বিদেশে গেছেন, যার তিন-চতুর্থাংশই ছিল মধ্যপ্রাচ্যকেন্দ্রিক। যুদ্ধজনিত অনিশ্চয়তা সৌদি আরব, কাতার ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মতো গন্তব্যগুলোতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলেছে। তিনি মনে করেন, বিকল্প গন্তব্য তৈরি করতে না পারলে রেমিট্যান্সে এর বড় প্রভাব পড়বে। অন্যদিকে, বায়রার সাবেক মহাসচিব আলী হায়দার চৌধুরী জানান, বর্তমানে শুধুমাত্র সৌদি আরবে নিয়োগ প্রক্রিয়া সচল থাকলেও মালয়েশিয়ায় নতুন সুযোগ তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে। রিক্রুটিং এজেন্সি ‘সাদিয়া ইন্টারন্যাশনাল’-এর স্বত্বাধিকারী শামীম আহমেদ চৌধুরী নোমান বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সাম্প্রতিক সফরের ফলে সেপ্টেম্বরে মালয়েশিয়ার শ্রমবাজার পুনরায় চালু হতে পারে। তবে দীর্ঘমেয়াদী সমাধানের জন্য পূর্ব ইউরোপ, দূরপ্রাচ্য ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় দেশগুলোতে বাজার খোঁজার পাশাপাশি দক্ষ কর্মী তৈরির লক্ষ্যে প্রশিক্ষণ কেন্দ্রগুলো আধুনিকায়নের আহ্বান জানান তিনি।
এদিকে, অভিবাসন খাতের উচ্চ ব্যয় এখনো একটি বড় সমস্যা হিসেবে রয়ে গেছে। সৌদি আরব, কুয়েত, কাতার ও সিঙ্গাপুরের মতো দেশগুলোতে যাওয়ার জন্য একজন অদক্ষ কর্মীকে ৪ থেকে ১০ লাখ টাকা পর্যন্ত ব্যয় করতে হচ্ছে, যা ২০০৮ সালের আগের তুলনায় কয়েকগুণ বেশি। প্রবাসী কল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একক অঞ্চলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে পূর্ব ইউরোপ, জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়ার মতো দেশে দক্ষ জনশক্তি পাঠানোর প্রচেষ্টা জোরদার করা হচ্ছে বলে জানানো হয়েছে।
দেশভিত্তিক তথ্যে দেখা যায়, সর্বাধিক ১১ হাজার ৪১৭ জন বাংলাদেশি কর্মী গেছেন ইতালিতে। এরপর রয়েছে পর্তুগাল, যেখানে ৬ হাজার ৩৭০ জন, রাশিয়ায় ৪ হাজার ৭৩৫, সার্বিয়ায় ৪ হাজার ৩৬৯, সাইপ্রাসে ৩ হাজার ৯২৮, বেলারুশে ১ হাজার ৭৬৭, উত্তর মেসিডোনিয়ায় ১ হাজার ৩৮৮, পোল্যান্ডে ৮৬৭ এবং রোমানিয়ায় ১৫৮ জন কর্মী গিয়েছেন।
নোয়াখালীর চাটখিলের আবদুর রহমান ২০১০ সালে একটি মার্কিন কোম্পানির শ্রমিক হিসেবে সৌদি আরবে যান। সবকিছু ভালোই যাচ্ছিল তার। কিন্তু গত ২৮শে ফেব্রুয়ারি ইরানে হামলা শুরু করে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল। এতে তার মতো লাখ লাখ বাংলাদেশি প্রবাসীর স্বপ্ন এলোমেলো হয়ে যায়। রহমান মোবাইল ফোনে বলেন, ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধের ভয়াবহতা ও আতঙ্ক তাড়া করে ফিরছে তাদের।

















