সৌদি আরব, তুরস্ক ও পাকিস্তানের মধ্যে সম্প্রতি স্বাক্ষরিত মক্কা যৌথ প্রতিরক্ষা চুক্তি মধ্যপ্রাচ্যে যুক্তরাষ্ট্রের দীর্ঘদিনের একটি উচ্চাকাঙ্ক্ষাকে নতুন করে সামনে নিয়ে এসেছে। ওয়াশিংটন দীর্ঘদিন ধরেই এই অঞ্চলে নিজেদের নিরাপত্তা স্বার্থ রক্ষায় একটি ‘মধ্যপ্রাচ্য’, ‘আরব’ বা ‘মুসলিম ন্যাটো’ গঠনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে। যদিও কিছু বিশ্লেষক একে ইসরাইলবিরোধী জোট হিসেবে দেখছেন, তবে বাস্তবে এটি শীতল যুদ্ধের সময়কার মার্কিন নীতিরই একটি আধুনিক সংস্করণ। এই নীতির মূল লক্ষ্য হলো পশ্চিমাপন্থী শাসনব্যবস্থা এবং তাদের মিত্র ইসরাইলকে সুরক্ষিত রাখা। অন্যদিকে সৌদিও বছরের পর বছর ধরে তেল আবিবের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালিয়ে আসছে। এমনকি ১৯৮১ সাল থেকেই সৌদি আরব আনুষ্ঠানিকভাবে ইসরাইলকে এই অঞ্চলের সঙ্গে একীভূত করার পক্ষে অবস্থান নিয়ে আসছে।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প এই চুক্তিকে স্বাগত জানিয়ে একে ‘সাহসী ও গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ’ হিসেবে অভিহিত করেছেন। বিশ্লেষকদের মতে, ১৯৫৫ সালে গঠিত বাগদাদ প্যাক্ট বা সেন্ট্রাল ট্রিটি অর্গানাইজেশনের (সেন্টো) আদলেই এই নতুন নিরাপত্তা কাঠামোটি তৈরি করা হয়েছে। মক্কা চুক্তির মাত্র কয়েক দিন আগে, ৩০ জুলাই সৌদি আরব আরও ১৩টি দেশকে নিয়ে লোহিত সাগর ও এডেন উপসাগরের নৌপথ সুরক্ষায় একটি সামরিক জোট গঠন করে, যা যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্বাধীন ‘অপারেশন প্রসপারিটি গার্ডিয়ান’-এরই ধারাবাহিকতা। গত নভেম্বরেই সৌদি যুবরাজ মোহাম্মদ বিন সালমান ওয়াশিংটনে গিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে একটি কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তিতে সই করেন। ওই সফরে সৌদি আরবকে ‘মেজর নন-ন্যাটো অ্যালাই’ বা গুরুত্বপূর্ণ ন্যাটোবহির্ভূত মিত্রের মর্যাদা দেয়া হয় এবং এফ-৩৫ যুদ্ধবিমান দেয়ার প্রতিশ্রুতিও দেয়া হয়।
মক্কা চুক্তিতে মিসর ও জর্ডানের অনুপস্থিতি নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ধারণা করা হচ্ছে, ইসরাইলি আগ্রাসনের মুখে সামরিক হস্তক্ষেপের আশঙ্কায় তারা এই মুহূর্তে যোগ দিতে দ্বিধাগ্রস্ত। একই সঙ্গে ইসরাইলপন্থী বিশ্লেষকরা আশঙ্কা করছেন যে, এই জোট আব্রাহাম অ্যাকর্ডসের অংশীদারদের দুর্বল করে দিতে পারে। কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের স্টিভেন এ কুকের মতে, মার্কিন নির্ভরযোগ্যতা নিয়ে সৌদি আরবের উদ্বেগের কারণেই তারা নতুন বিকল্প খুঁজছে। তবে তুরস্ক ন্যাটোর সদস্য এবং সৌদি ও পাকিস্তান দীর্ঘদিনের মার্কিন মিত্র হওয়ায় এই জোটের স্বাধীনভাবে কাজ করার সক্ষমতা নিয়ে সংশয় থেকেই যায়।
মিডল ইস্ট কাউন্সিল অন গ্লোবাল অ্যাফেয়ার্স-এর নির্বাহী পরিচালক খালিদ আল-জাবেরের মতে, এই চুক্তিটি একটি তৃতীয় শক্তিকেন্দ্র গঠনের প্রাথমিক প্রচেষ্টা হতে পারে, যাতে কোনো একটি পক্ষ একক আধিপত্য প্রতিষ্ঠা করতে না পারে। তবে বাস্তবে সৌদি আরবের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের কৌশলগত প্রতিরক্ষা চুক্তি এবং পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর মার্কিন নেতৃত্বের প্রশংসার বিষয়টি ইঙ্গিত দেয় যে, এটি কোনো স্বাধীন তৃতীয় মেরু নয়। শেষ পর্যন্ত মক্কা চুক্তিটি সেই পুরোনো মার্কিন কৌশলই, যার লক্ষ্য হলো ইসরাইলের স্বার্থ রক্ষা করা এবং মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন আধিপত্য টিকিয়ে রাখা।

















