অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি সংক্রান্ত নতুন নীতিমালা বাতিল করেছে অন্তর্বর্তী সরকার। গত ৩ আগস্ট মন্ত্রিসভার বৈঠকে ‘অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা-২০২৬’ এবং ‘ওষুধের মূল্য নির্ধারণ পদ্ধতি-২০২৬’ বাতিলের এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সরকারি নির্দেশনায় বলা হয়েছে, আইন অনুযায়ী এ ধরনের নীতি প্রণয়নের আগে জাতীয় ওষুধ উপদেষ্টা পরিষদের পরামর্শ নেওয়া বাধ্যতামূলক থাকলেও নতুন নীতিমালা তৈরির ক্ষেত্রে তা মানা হয়নি। ফলে এখন থেকে তিন দশক আগের নিয়ম অনুযায়ী অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা ও মূল্য নির্ধারণ ব্যবস্থা কার্যকর থাকবে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ২৯৭টি ওষুধ অন্তর্ভুক্ত করে নতুন তালিকা প্রকাশ করেছিল, যেখানে ১৯৯৪ সালের তালিকায় ছিল মাত্র ১১৭টি ওষুধ। নতুন তালিকা ও মূল্য নির্ধারণের পদ্ধতি নিয়ে শুরু থেকেই বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতি আপত্তি জানিয়ে আসছিল। শিল্প মালিকদের দাবি ছিল, তাদের সাথে কোনো ধরনের পরামর্শ ছাড়াই এই নতুন ব্যবস্থা চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। গত ৩০ জুন সংগঠনটি স্বাস্থ্যমন্ত্রীর কাছে বিষয়টি পর্যালোচনার জন্য জরুরি বৈঠকের আহ্বান জানিয়েছিল।
মন্ত্রিসভার এই সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়ে বাংলাদেশ ঔষধ শিল্প সমিতির কোষাধ্যক্ষ ও হেলথকেয়ার ফার্মাসিউটিক্যালসের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা মুহাম্মদ হালিমুজ্জামান দাবি করেন, নতুন তালিকাটি অবৈধভাবে করা হয়েছিল। তিনি আরও বলেন, এই সিদ্ধান্তের ফলে বাজারে ওষুধের দাম বাড়ার কোনো সুযোগ নেই, কারণ ওষুধ কোম্পানিগুলো প্রতিযোগিতামূলক বাজারে ব্যবসা পরিচালনা করে। তবে জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা ভিন্নমত পোষণ করছেন। তাদের মতে, সরকারি নজরদারি দুর্বল হলে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে রোগীদের ওপর। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাস্থ্য অর্থনীতি ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক সৈয়দ আবদুল হামিদ জানান, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা অনেক ওষুধ এখন আর বাজারে নেই, তাই নতুন করে তালিকা করা জরুরি ছিল।
জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ বে-নজীর আহমেদ ও ডা. এম মুশতাক হোসেনের মতে, সরকারি নজরদারি দুর্বল হলে দরিদ্র রোগীদের চিকিৎসা ব্যয় বেড়ে যাবে। মুশতাক হোসেন পরামর্শ দেন যে, নীতিতে সমস্যা থাকলে তা সংশোধন করা যেত, পুরো কাঠামো বাতিলের প্রয়োজন ছিল না। বর্তমানে সরকার ১৯৯৪ সালের ১১৭টি ওষুধের তালিকা বহাল রাখলেও তা হালনাগাদ করার উদ্যোগ নিয়েছে। স্বাস্থ্য সচিব কামরুজ্জামান চৌধুরী জানিয়েছেন, আগের তালিকা পর্যালোচনা করে নতুন করে একটি তালিকা তৈরি করা হবে। এছাড়া ওষুধের দাম নিয়ন্ত্রণের জন্য একটি নতুন কমিটি গঠন করা হবে, যারা প্রয়োজন অনুযায়ী দাম পরিবর্তনের প্রস্তাব দেবে। ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের তথ্যমতে, ১৯৯৪ সালের তালিকার অনেক ওষুধ এখন আর উৎপাদিত হয় না, যার ফলে কোম্পানিগুলো নিজেদের মতো দাম নির্ধারণের সুযোগ পায় এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হন। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার মানদণ্ড অনুযায়ী, বিশ্বের ১৫০টির বেশি দেশে ওষুধের তালিকা ও মূল্য নিয়ন্ত্রণে সরকারি নির্দেশনা কার্যকর রয়েছে।
স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের ৩ ফেব্রুয়ারি অন্তর্বর্তী সরকার ২৯৭টি ওষুধকে অন্তর্ভুক্ত করে নতুন অত্যাবশ্যকীয় ওষুধের তালিকা প্রকাশ করে। ১৯৯৪ সালের তালিকায় ছিল ১১৭টি ওষুধ। নতুন তালিকায় যুক্ত করা হয়েছিল আরও ১৮০টি ওষুধ।
ঔষধ প্রশাসন অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা জানান, ১৯৯৪ সালের তালিকায় থাকা ১১৭টি ওষুধের মধ্যে বর্তমানে ৫০ থেকে ৬০টি ওষুধ অনেক কোম্পানি উৎপাদন করে না। অনেক ক্ষেত্রে তালিকাভুক্ত ওষুধ ভিন্ন নামে বাজারজাত করা হচ্ছে। এতে নিজেদের মতো করে দাম নির্ধারণের সুযোগ তৈরি হচ্ছে এবং ভোক্তারা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। সূত্র: সমকাল

















