গ্রামাঞ্চল ও প্রত্যন্ত এলাকায় মুঠোফোনের নেটওয়ার্ক সেবার মান বৃদ্ধির লক্ষ্যে কম ফ্রিকোয়েন্সির তরঙ্গ বা স্পেকট্রাম অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এই লক্ষ্য সামনে রেখে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশন (বিটিআরসি) ‘ই-জিএসএম’ ব্যান্ডের স্পেকট্রাম বরাদ্দের উদ্যোগ নিয়েছে। মোবাইল অপারেটর রবি ও বাংলালিংকের আবেদনের প্রেক্ষিতে কমিশন এই তরঙ্গ নিলামের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করলেও বর্তমানে বাংলালিংক এ বিষয়ে কিছুটা পিছু হটেছে। অপারেটরটি অনুরোধ জানিয়েছে, নতুন টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্ত না হওয়া পর্যন্ত যেন নিলাম প্রক্রিয়া স্থগিত রাখা হয়। অন্যদিকে, রবি মনে করে সেবার মানোন্নয়নে এই নিলাম এখনই হওয়া জরুরি।
টেলিযোগাযোগ বিশেষজ্ঞদের মতে, মোবাইল নেটওয়ার্কের সিগন্যাল টর্চলাইটের আলোর মতো কাজ করে, যেখানে কিছু তরঙ্গ দূরে যায় আবার কিছু কাছে ছড়িয়ে পড়ে। বর্তমানে অপারেটররা যে তরঙ্গ ব্যবহার করে তা দ্রুতগতির ইন্টারনেটের জন্য কার্যকর হলেও দেয়াল বা ছাদ ভেদ করতে হিমশিম খায়। ফলে টাওয়ার কাছে থাকলেও ঘরের ভেতরে সিগন্যাল দুর্বল হয়ে পড়ে। বিপরীতে ‘লোয়ার-ব্যান্ড’ তরঙ্গ ভবনের ভেতরে সহজে প্রবেশ করতে পারে এবং দীর্ঘ দূরত্ব অতিক্রম করতে সক্ষম, যা গ্রামীণ কভারেজ উন্নত করতে কার্যকর ভূমিকা রাখে।
বিটিআরসির কারিগরি কমিটির সুপারিশ অনুযায়ী, গত জুন মাসে কমিশন অতিরিক্ত লোয়ার-ব্যান্ড বা ই-জিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গ বরাদ্দের সিদ্ধান্ত নেয়। এর আওতায় ৮৮০ থেকে ৮৮৮ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ এবং ৯২৫ থেকে ৯৩৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ রেঞ্জকে চিহ্নিত করা হয়েছে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল (অব.) মো. এমদাদ উল বারী জানিয়েছিলেন, সরকারের কাছ থেকে তরঙ্গের ভিত্তিমূল্যের অনুমোদন পেলেই এক থেকে দেড় মাসের মধ্যে নিলাম আয়োজন করা সম্ভব।
তবে গত ২১ সেপ্টেম্বর বিটিআরসিতে পাঠানো চিঠিতে বাংলালিংক জানায়, সরকার বর্তমানে টেলিযোগাযোগ নীতিমালা চূড়ান্তকরণের কাজ করছে। নতুন এই নীতিতে স্পেকট্রাম ব্যবস্থাপনা, বিনিয়োগ ও দীর্ঘমেয়াদী দিকনির্দেশনা থাকবে। তাই এর আগে তরঙ্গ বরাদ্দ বা মূল্য নির্ধারণের মতো সিদ্ধান্ত নিলে তা ভবিষ্যৎ নীতির সঙ্গে অসামঞ্জস্যপূর্ণ হতে পারে। বাংলালিংকের চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অ্যাফেয়ার্স অফিসার তাইমুর রহমান জানান, তারা ই-জিএসএম স্পেকট্রামের কার্যকর ব্যবহারের পক্ষে, তবে নতুন নীতিমালা চূড়ান্ত হওয়ার অপেক্ষায় থাকাটাই অধিক যুক্তিসঙ্গত।
এর বিপরীতে গত ২৪ সেপ্টেম্বর বিটিআরসিতে চিঠি দিয়ে রবি দ্রুত নিলামের দাবি জানিয়েছে। রবির চিফ করপোরেট অ্যান্ড রেগুলেটরি অফিসার সাহেদ আলম বলেন, গ্রাহকদের ক্রমবর্ধমান চাহিদা পূরণে এই স্পেকট্রাম দ্রুত উন্মুক্ত করা প্রয়োজন। তাদের মতে, টেলিযোগাযোগ নীতিমালার সঙ্গে এই তরঙ্গ নিলামের সরাসরি কোনো বাধ্যবাধকতা নেই। বিটিআরসির তথ্য অনুযায়ী, দেশে ১৯ কোটির বেশি মুঠোফোন গ্রাহক রয়েছে, যেখানে গ্রামীণফোনের গ্রাহক ৮ কোটি ৭২ লাখ, রবির প্রায় ৬ কোটি এবং বাংলালিংকের ৩ কোটি ৭৯ লাখের বেশি।
এদিকে, বিটিআরসি গত বৃহস্পতিবার ই-জিএসএম ব্যান্ডের তরঙ্গের ভিত্তিমূল্য চূড়ান্ত করতে ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে পুনরায় চিঠি দিয়েছে। চিঠিতে ৩ দশমিক ৪ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ২১৪ কোটি টাকা এবং ৫ মেগাহার্টজ স্পেকট্রামের ভিত্তিমূল্য প্রতি মেগাহার্টজ ১৭৮ কোটি টাকা নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে, যা ১৫ বছরের জন্য প্রযোজ্য হবে। বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী পুনরায় নিশ্চিত করেছেন যে, টেলিযোগাযোগ নীতিমালার সঙ্গে এই নিলামের কোনো সম্পর্ক নেই এবং মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন পেলেই নিলাম প্রক্রিয়া শুরু হবে।

















