দাম্পত্য জীবনের শুরুটা সহজ হলেও একে বছরের পর বছর সুন্দর রাখা মোটেই সহজ কাজ নয়। এর জন্য প্রয়োজন ধৈর্য, আন্তরিকতা, ত্যাগ এবং প্রজ্ঞা। অনেক সময় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে নিজের রাগ ও অভিমান সংযত করতে হয়, যেখানে স্বামীর ভূমিকা হতে হয় কৌশলী ও স্নেহশীল অভিভাবকের মতো। স্বামী-স্ত্রীর বোঝাপড়ার অভাব সম্পর্ককে দুর্বল করে বিচ্ছেদের দিকে নিয়ে যেতে পারে, অথচ কিছু সহজ অভ্যাস নিয়মিত চর্চা করলে ভালোবাসা ও বিশ্বাস গভীর হয়।
স্ত্রীর কোনো ভুল হলে অপমান না করে ভালোবাসা দিয়ে তা সংশোধন করা উচিত এবং তাঁকে অনুভব করানো প্রয়োজন যে তিনি আপনার সবচেয়ে আপন মানুষ। পরিবারের জন্য সামর্থ্য অনুযায়ী ভালো খাবারের ব্যবস্থা করা যত্নেরই অংশ, যেখানে কার্পণ্য না করাই শ্রেয়। এ প্রসঙ্গে মহানবী (সা.) বলেছেন, ‘সওয়াবের আশায় কোনো মুসলিম যখন তার পরিবারের জন্য ব্যয় করে, তা তার জন্য সদকা হিসেবে গণ্য হয়’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫৩৫১)।
পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও পরিপাটি থাকা দাম্পত্য জীবনে গভীর প্রভাব ফেলে। সাহাবি ইবনে আব্বাস (রা.) বলেছেন, ‘আমি আমার স্ত্রীর জন্য এমনই পরিপাটি থাকতে পছন্দ করি, যেমন আমি তার কাছ থেকে সাজগোজ পছন্দ করি’ (মুসান্নাফ ইবনে আবি শাইবাহ, হাদিস: ১৯২৬৩)। স্ত্রী যেভাবে দেখতে পছন্দ করেন, সেভাবে থাকা সম্মানের বহিঃপ্রকাশ। এছাড়া ঘরের কাজে সহযোগিতা করা এবং স্ত্রীর ছোট ছোট ভালো কাজের প্রশংসা করা সম্পর্কের বন্ধন দৃঢ় করে। আয়েশা (রা.) থেকে জানা যায়, নবীজি (সা.) প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন, যা নতুন স্ত্রীর সামনেও অব্যাহত ছিল; কারণ প্রশংসা কখনো পুরোনো সম্পর্ককে ছোট করে না, বরং ভালোবাসা বাড়ায়।
দাম্পত্য জীবনে মতবিরোধ স্বাভাবিক, তবে প্রয়োজনে আলাদা থাকা গেলেও গায়ে হাত তোলা ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘তোমরা কেউ যেন নিজের স্ত্রীকে দাসের মতো প্রহার না করো। দিনের শেষে তো তার সঙ্গেই মিলিত হবে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২০৪)। খারাপ নামে ডাকা, অশালীন ভাষা ব্যবহার, স্ত্রীর মা-বাবাকে নিয়ে কটূক্তি বা যৌতুকের দাবি করা সম্পূর্ণ পরিত্যাজ্য। স্ত্রীকে অন্য কারও সঙ্গে তুলনা না করে তাঁকে অনন্য অনুভব করানো উচিত। ভুল সংশোধনের জন্য আড়ালে ভালোবাসার সঙ্গে কথা বলা এবং পুরোনো ভুল বারবার মনে না করিয়ে ক্ষমা করতে শেখাই সুস্থ সম্পর্কের লক্ষণ।
দাম্পত্য জীবনে খেলাচ্ছলে সময় কাটানোর গুরুত্ব অপরিসীম। আয়েশা (রা.) বর্ণনা করেন, এক সফরে নবীজি (সা.) তাঁর সঙ্গে দৌড় প্রতিযোগিতা করেছিলেন। এ ধরনের হালকা ও রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল। তিনি বলেছেন, ‘মানুষ যা নিয়ে খেলাধুলা করে, তার সবই অনর্থক, তিনটি বিষয় ছাড়া—তিরন্দাজি, ঘোড়া প্রশিক্ষণ আর স্ত্রীর সঙ্গে খেলা’ (সুনানে তিরমিজি, হাদিস: ১৬৩৭)। ফলে একসঙ্গে খাওয়া, হাঁটাহাঁটি বা ভ্রমণে যাওয়াকে বিলাসিতা না ভেবে সুন্নাহর অংশ হিসেবে দেখা উচিত।
রাগের মুহূর্তে নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করাই প্রকৃত শক্তির পরিচয়। নবীজি (সা.) বলেছেন, ‘শক্তিশালী সে নয়, যে কুস্তিতে অন্যকে পরাজিত করে; বরং শক্তিশালী সে-ই, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৬১১৪)। সুখী সংসার গড়ে ওঠে পারস্পরিক ভালোবাসা, শ্রদ্ধা, দায়িত্ববোধ এবং ক্ষমাশীলতার ওপর। প্রতিদিনের ছোট ছোট আচরণ ও ত্যাগের মাধ্যমেই একটি সুন্দর দাম্পত্য জীবন গড়ে তোলা সম্ভব।
আয়েশা (রা.) বলেন, ‘নবীজি প্রায়ই খাদিজা (রা.)-এর প্রশংসা করতেন।’ (সহিহ বুখারি, হাদিস: ৫২২৯)এমনকি খাদিজার মৃত্যুর পরও নতুন স্ত্রীর সামনেই প্রশংসা করতেন।
তিনি হেসে বললেন, ‘এটা সেই আগের হারের বদলা।’ (সুনানে আবু দাউদ, হাদিস: ২৫৭৮)এই ছোট্ট ঘটনাই বলে দেয়, স্ত্রীর সঙ্গে হালকা, রসিকতাপূর্ণ সময় কাটানো নবীজির নিজস্ব অভ্যাসের অংশ ছিল।এ বিষয়ে নবীজি (সা.) একটা সাধারণ নীতিও বলে দিয়েছে, মানুষের অধিকাংশ বিনোদনমূলক কাজই অর্থহীন, তবে কয়েকটি ব্যতিক্রম আছে।

















