আল্লাহ তাআলা, যিনি মানবজাতির স্রষ্টা, তিনি ভালোভাবেই অবগত আছেন যে কোন পরিস্থিতিতে মানুষের জন্য কোন বিধান কল্যাণকর এবং কেমন দিকনির্দেশনা উপযোগী। একসময় কার্যকর কোনো বিধানের স্থলে পরবর্তী ওহির মাধ্যমে নতুন বিধান আসার মধ্যে এক গভীর প্রজ্ঞা নিহিত রয়েছে। ইসলামী পরিভাষায় এই বিধান পরিবর্তনকে ‘নাসখ’ বলা হয়। তবে প্রশ্ন জাগতে পারে, এই পরিবর্তন কি পূর্ববর্তী বিধানের কোনো ত্রুটি সংশোধনের জন্য, নাকি এর পেছনে বান্দার কল্যাণ ও আনুগত্যের পরীক্ষা রয়েছে?
‘নাসখ’ শব্দটি আরবি, যার আভিধানিক অর্থ হলো অপসারণ, পরিবর্তন বা এক বস্তুর স্থলে অন্য কিছু প্রতিস্থাপন করা। ইসলামী পরিভাষায়, পূর্ববর্তী কোনো বিধানের কার্যকারিতা পরবর্তী নির্ভরযোগ্য দলিলের মাধ্যমে সমাপ্ত হওয়াকে নাসখ বলে। পবিত্র কোরআনেই এই বিষয়টি সুস্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আমি কোনো আয়াত রহিত করলে কিংবা ভুলিয়ে দিলে তার চেয়ে উত্তম অথবা তার অনুরূপ কিছু নিয়ে আসি।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৬)
এই আয়াতটি প্রমাণ করে যে, বিধান রহিত করা আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও ইচ্ছার অধীন। তাঁর কোনো সিদ্ধান্তই অজ্ঞতা, ভুল, অপারগতা কিংবা অসহায়ত্বের ফল নয়। বরং রহিত বিধানের পরিবর্তে যে বিধান আসে, তা মানুষের জন্য সাধারণত অধিক উপকারী বা সহজতর হয়। আবার কখনো তা আগেরটির অনুরূপও হতে পারে, যেমনটি ইবনে কাসির তাঁর ‘তাফসিরুল কুরআনিল আজিম’ গ্রন্থে (১/২৯৫, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১) উল্লেখ করেছেন।
আলেমরা এই নাসখ বা রহিতকরণ পদ্ধতিকে মূলত তিন ভাগে ভাগ করেছেন। প্রথমত, তেলাওয়াত বা পাঠ্যরূপ বহাল থাকে কিন্তু বিধান রহিত হয়, কোরআনে এ ধরনের উদাহরণই বেশি আলোচিত। দ্বিতীয়ত, পাঠ্যরূপ রহিত হয় কিন্তু বিধান বহাল থাকে। তৃতীয়ত, পাঠ্যরূপ ও বিধান উভয়ই রহিত হয়। (মুহাম্মদ আবদুল আজিম জুরকানি, মানাহিলুল ইরফান ফি উলুমিল কুরআন, ২/১৬৭, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ১৯৯৫)। এ কারণে কোনো আয়াতের পাঠ্যরূপ থাকা মানেই তার বিধান কার্যকর, এমন ধারণা সঠিক নয়। আবার বিধান রহিত হলে আয়াতের মর্যাদা কমে যায়, এ ধারণাও ভুল। বিধানের কার্যকারিতা ও আল্লাহর বাণী হিসেবে আয়াতের মর্যাদা দুটি আলাদা বিষয়। বিধান রহিত হলেও যে আয়াত কোরআনের অংশ হিসেবে বহাল থাকে, তার পাঠ্যরূপ ও মর্যাদা অক্ষুণ্ন থাকে।
নাসখের অন্যতম তাৎপর্য হলো, মানুষের সামর্থ্য ও সামাজিক বাস্তবতা বিবেচনায় আল্লাহর নির্ধারিত সময়ে বান্দার জন্য উপযোগী বিধান কার্যকর হওয়া। এর একটি সুস্পষ্ট দৃষ্টান্ত যুদ্ধক্ষেত্রে মুমিনদের দৃঢ়তাসংক্রান্ত বিধান। প্রথমে আল্লাহ বলেন, ‘তোমাদের মধ্যে বিশজন ধৈর্যশীল থাকলে তারা দুই শজনের ওপর বিজয়ী হবে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৫)। পরের আয়াতে দায়িত্ব হালকা করে বলেন, ‘এখন আল্লাহ তোমাদের ভার লাঘব করে দিলেন এবং তিনি জানেন যে তোমাদের মধ্যে দুর্বলতা রয়েছে।’ (সুরা আনফাল, আয়াত: ৬৬)। প্রথম আয়াতে একজন মুমিনকে দশজনের মোকাবিলার নির্দেশ ছিল, পরে তা একজনের বিপরীতে দুজনের অনুপাত নির্ধারণ করা হয়। অধিকাংশ মুফাসসির এই ঘটনাকে নাসখের আলোচনায় উল্লেখ করেছেন। (ইমাম কুরতুবি, আল-জামি লিআহকামিল কুরআন, ১০/৭০-৭১, মুআসসাহ আর-রিসালাহ, বৈরুত, ২০০৬)। এখানে লক্ষণীয়, আল্লাহ শুরু থেকেই মুমিনদের শক্তি ও দুর্বলতা জানতেন; পরের আয়াতে দুর্বলতার উল্লেখ নতুন তথ্য জানার ফল নয়, বরং সময়ের বাস্তবতা অনুযায়ী বিধানের ভার লাঘব করা হয়েছে মাত্র। এতে বোঝা যায়, শরিয়তের বিধান মানুষের সামর্থ্য ও কল্যাণের সঙ্গে সম্পর্কিত। সহজতার এ নীতি কোরআনের সাধারণ শিক্ষাও বটে, যেমন রমজানের রোজা প্রসঙ্গে আল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান, কঠিন করতে চান না।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৮৫)।
আয়াত রহিত করার আরেকটি তাৎপর্য হলো ক্রমান্বয়ে মানুষকে বড় পরিবর্তনের জন্য প্রস্তুত করা। মদ হারাম হওয়ার ধাপগুলো এর স্পষ্ট উদাহরণ। প্রথমে মদ ও জুয়া সম্পর্কে বলা হয়েছে, এ দুটিতে বড় পাপ ও মানুষের জন্য কিছু উপকারও আছে, তবে পাপ উপকারের চেয়ে বড়। (সুরা বাকারা, আয়াত: ২১৯)। পরে নেশাগ্রস্ত অবস্থায় নামাজের কাছে যেতে নিষেধ করা হয়। (সুরা নিসা, আয়াত: ৪৩)। সবশেষে সুরা মায়িদায় মদকে শয়তানের কাজ আখ্যা দিয়ে তা বর্জনের চূড়ান্ত নির্দেশ আসে। (সুরা মায়িদা, আয়াত: ৯০)। গভীর অভ্যাসে পরিণত হওয়া একটি বিষয় এক ধাপেই ছাড়ানো কঠিন ছিল। আল্লাহ তাঁর প্রজ্ঞা অনুযায়ী সমাজকে ধীরে ধীরে প্রস্তুত করেছেন। প্রতিটি ধাপ নিজ সময়ে যথাযথ ছিল ও চূড়ান্ত বিধানের পথ সুগম করেছে।
কিবলা পরিবর্তন আয়াত রহিত করার অন্যতম সুস্পষ্ট ও শিক্ষণীয় দৃষ্টান্ত। রাসুল (সা.) ও সাহাবিরা প্রথমে বাইতুল মুকাদ্দাসের দিকে মুখ করে নামাজ আদায় করতেন। পরে আল্লাহর নির্দেশে কাবা শরিফ মুসলমানদের কিবলা নির্ধারিত হয়। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আপনি আগে যে কিবলার ওপর ছিলেন, তা এ উদ্দেশ্যেই নির্ধারণ করেছিলাম, যাতে প্রকাশ পায় কে রাসুলের অনুসরণ করে আর কে পেছনে ফিরে যায়।’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১৪৩)। এ আয়াত পরিবর্তনের একটি গুরুত্বপূর্ণ হেকমত প্রকাশ করেছে। এত দিন যেদিকে মুখ করে নামাজ পড়া হয়েছে, নতুন নির্দেশ আসার পর অন্য দিকে মুখ করতে হবে। এ পরিবর্তন মেনে নেওয়ার মধ্য দিয়েই প্রকাশ পায়, কার আনুগত্য আল্লাহ ও রাসুলের প্রতি অবিচল। কিবলা পরিবর্তন আরেকটি শিক্ষাও দেয় যে, ইবাদতের ভিত্তি নিজের পছন্দ বা প্রচলিত অভ্যাস নয়, বরং আল্লাহর নির্দেশ। বিধানের সব হিকমত বোধগম্য না হলেও নির্দেশ মেনে নেওয়াই মুমিনের কর্তব্য।
নাসখ নিয়ে ভুল ধারণার একটি বড় কারণ হলো একে মানুষের আইন পরিবর্তনের সঙ্গে তুলনা করা। মানুষ সাধারণত নতুন পরিস্থিতি বুঝে, আগের সিদ্ধান্তে ভুল ধরা পড়লে কিংবা পুরোনো আইন অকার্যকর হলে আইন বদলায়। আল্লাহর বিধানে এমন ধারণা প্রযোজ্য নয়। মানুষের জ্ঞান সীমিত, ভবিষ্যৎ সে জানে না। কিন্তু আল্লাহর জ্ঞান অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যৎকে পরিব্যাপ্ত করে। কোন বিধান কখন কার্যকর হবে, কত দিন থাকবে, কখন তার স্থলে অন্য বিধান আসবে, সবই তাঁর অনাদি জ্ঞানের অন্তর্ভুক্ত। সুরা বাকারার ১০৬ নম্বর আয়াতে নাসখের উল্লেখের পর আল্লাহ বলেন, ‘তুমি কি জানো না, নিশ্চয়ই আল্লাহ সবকিছুর ওপর ক্ষমতাবান?’ এবং পরের আয়াতে বলেন, ‘তুমি কি জানো না, নিশ্চয়ই আসমানসমূহ ও জমিনের রাজত্ব আল্লাহরই?’ (সুরা বাকারা, আয়াত: ১০৭)। এতে বোঝা যায়, বিধান নির্ধারণ ও পরিবর্তনের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। তিনি সৃষ্টিজগতের মালিক, তাঁর নির্দেশের ওপর কারও কর্তৃত্ব নেই।
একটি উপমা হিসেবে ভাবা যেতে পারে, একজন চিকিৎসক রোগীকে বর্তমান অবস্থার জন্য একটি ওষুধ দেন এবং আগে থেকেই জানেন যে কয়েক দিন পর অবস্থা বদলালে অন্য ওষুধ লাগবে। পরে ওষুধ বদলানো তাঁর আগের সিদ্ধান্ত ভুল প্রমাণ করে না, বরং তা চিকিৎসার নির্ধারিত প্রক্রিয়ারই অংশ। অবশ্য আল্লাহর জ্ঞান মানুষের জ্ঞানের সঙ্গে তুলনীয় নয়। উপমাটি শুধু এটুকু বোঝানোর জন্য যে মেয়াদ আগে থেকে নির্ধারিত থাকলে পরবর্তী পরিবর্তন আগের সিদ্ধান্তকে ভুল প্রমাণ করে না। একইভাবে প্রথম বিধান ও পরবর্তী বিধান উভয়ই আল্লাহর পূর্ণাঙ্গ পরিকল্পনার অংশ।
আল্লাহ তাআলা বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন নবী-রাসুলের মাধ্যমে মানুষকে হেদায়েত দিয়েছেন। পূর্ববর্তী উম্মতের কিছু বিধান পরবর্তী উম্মতের জন্য ভিন্ন হতে পারে। আবার একই যুগের ভেতরেও পরবর্তী ওহির মাধ্যমে কোনো বিধান পরিবর্তিত হতে পারে। এ দুটি এক বিষয় নয়। উভয় ক্ষেত্রে আল্লাহর নির্দেশের কর্তৃত্ব প্রকাশ পেলেও আলোচনার ক্ষেত্র ও দলিল আলাদা। আল্লাহ বলেন, ‘আর যখন আমি এক আয়াতের স্থলে অন্য আয়াত পরিবর্তন করে দিই, তখন আল্লাহ যা অবতীর্ণ করেন, সে সম্পর্কে তিনিই সর্বাধিক জ্ঞাত।’ (সুরা নাহল, আয়াত: ১০১)। অর্থাৎ কেন একটি বিধানের স্থলে অন্য বিধান আসে, তার পূর্ণ জ্ঞান তাঁরই। মানুষের পক্ষে প্রতিটি বিধানের অন্তর্নিহিত হিকমত সম্পূর্ণ উপলব্ধি করা সম্ভব না-ও হতে পারে।
তবে এর অর্থ এই নয় যে বিধান পরিবর্তন ইচ্ছামতো বা মানুষের সুবিধা অনুযায়ী নির্ধারণ করা যাবে। রহিত হয়েছে কি না, তা নির্ধারিত হবে কোরআন, হাদিস ও নির্ভরযোগ্য ইসলামি দলিলের আলোকে। কেউ নিজের যুক্তি, পছন্দ বা সমসাময়িক পরিস্থিতির অজুহাতে কোরআনের কোনো বিধানকে রহিত ঘোষণা করতে পারেন না। কোনো আয়াতের বিধান রহিত দাবি করার আগে কয়েকটি বিষয় যাচাই জরুরি: সংশ্লিষ্ট আয়াত ও হাদিসের দলিল কী, দাবির পক্ষে নির্ভরযোগ্য বর্ণনা আছে কি না এবং দুই আয়াতের মধ্যে সমন্বয়ের কোনো গ্রহণযোগ্য পদ্ধতি আছে কি না। নাসখের আলোচনা মূলত আদেশ, নিষেধ ও বিধানসংক্রান্ত বিষয়ের সঙ্গে সম্পর্কিত। অতীতের কোনো ঘটনা সম্পর্কে কোরআনের বিবরণকে সাধারণ শরয়ি বিধানের মতো রহিত হওয়ার বিষয় হিসেবে বিবেচনা করা যায় না। (ইবনে কাসির, তাফসিরুল কুরআনিল আজিম, ১/২৯৪, দারুল কিতাব আল-আরবি, বৈরুত, ২০১১)। অতএব দুটি আয়াতের মধ্যে আপাত অর্থগত পার্থক্য দেখলেই একটিকে অন্যটির দ্বারা রহিত ঘোষণা করা সঠিক পদ্ধতি নয়। অনেক ক্ষেত্রে তাফসির, অবতরণের প্রেক্ষাপট ও ভাষাগত বিশ্লেষণের মাধ্যমে উভয় আয়াতের সমন্বয় সম্ভব। রহিত কি না তা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট প্রমাণ অপরিহার্য।
কোরআনের বিধান রহিত হওয়ার বিষয়টি গভীরভাবে অনুধাবন করলে আল্লাহর প্রজ্ঞা ও বান্দার প্রতি অনুগ্রহের নানা দিক উন্মোচিত হয়। মুমিনের দায়িত্ব হলো কোরআন ও সুন্নাহর নির্দেশ যথাযথভাবে বোঝা এবং আল্লাহর নির্দেশের সামনে নিজের ইচ্ছাকে প্রাধান্য না দেওয়া। বিধানের সব হেকমত বুঝতে না পারলেও মুমিন বিশ্বাস করেন, আল্লাহর প্রতিটি নির্দেশ তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতেই নির্ধারিত।
ফয়জুল্লাহ রিয়াদ: শিক্ষক, জামিয়া আরাবিয়া দারুস সুন্নাহ রাজাবাড়ী, ঢাকা।

















