সরকার বা কোনো আর্থিক প্রতিষ্ঠানের যখন তারল্য সংকট দেখা দেয়, তখন জনগণের কাছ থেকে ঋণ সংগ্রহের প্রক্রিয়াটি বন্ড নামে পরিচিত। বন্ড ক্রয় করার অর্থ হলো ঋণ প্রদান করা, আর বন্ড ইস্যু বা বিক্রয় করার অর্থ হলো ঋণ গ্রহণ করা। এই পুরো প্রক্রিয়াটি সুদভিত্তিক হয়ে থাকে। বাংলাদেশে সাধারণত কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মাধ্যমে সরকারের ঋণ সরবরাহের জন্য বন্ডের ব্যবহার হয়ে থাকে। সরকার যখন এক বছরের বেশি সময়, এমনকি সর্বোচ্চ বিশ বছর পর্যন্ত ঋণ গ্রহণ করে, তখন তার বিপরীতে বন্ড সরবরাহ করা হয়। তবে, এক বছরের কম সময়ের জন্য ঋণ নেওয়া হলে, তার বিপরীতে ব্যাংকগুলোকে ট্রেজারি বিল দেওয়া হয়। বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোই সাধারণত বন্ড কেনাবেচা করে থাকে।
ব্যাংকের বিনিয়োগ নীতি অনুযায়ী, ঋণের প্রবাহ আমানতের চেয়ে কম হতে হয়। অর্থাৎ, ১০০ টাকা আমানত হলে ঋণ প্রদান তার চেয়ে কম হতে হবে, যাতে আমানতকারীদের অর্থের নিরাপত্তা নিশ্চিত হয়। এই কমের পরিমাণ নির্ধারণ করে কেন্দ্রীয় ব্যাংক। গত তিন বছরে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের এই সংক্রান্ত সার্কুলেশন অন্তত চারবার পরিবর্তন করা হয়েছে, যা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যর্থতা ঢাকার একটি প্রয়াস হিসেবে সমালোচিত হয়েছে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে সুদের ভয়াবহতা।
সাধারণ ব্যাংকগুলোকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বাধ্যতামূলকভাবে কিছু অর্থ সংরক্ষণ করতে হয়, যা মূলত আমানতকারীদের স্বার্থ রক্ষার্থে একটি বিধান। এই নীতিকে ‘লিকুইডিটি রেশিও পলিসি’ বা তারল্য হার নীতি বলা হয়। এই নীতি অনুযায়ী, সাধারণ ব্যাংকগুলোকে একটি নির্দিষ্ট পরিমাণ অর্থ নগদ হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে রাখতে হয়, যা ‘সিআরআর’ (Cash Reserve Requirement) বা নগদ জমার হার নামে পরিচিত।
মানুষ ব্যাংকে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে অর্থ জমা রাখে; কেউ যখন তখন টাকা তোলার জন্য কারেন্ট বা তলবি হিসাবে এবং কেউ মেয়াদে টাকা তোলার জন্য টার্ম বা মেয়াদী সঞ্চয় হিসাবে জমা করে। ব্যাংকের কাছে এই উভয় প্রকার সঞ্চয়ই দায় হিসেবে গণ্য হয়। একটি ব্যাংকের মোট মেয়াদি ও তলবি দায়ের ন্যূনতম দৈনিক হার ৩.৫% এবং দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৪% নগদ টাকা প্রতিদিন বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হয়। এই জমার অর্থ হাতে হাতে নয়, বরং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অধীন তফসিলি ব্যাংকের অ্যাকাউন্টে জমা করা হয়।
মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার প্রবাহ নিয়ন্ত্রণে রাখতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক সময়ে সময়ে সিআরআর হার পরিবর্তন করে থাকে। সম্প্রতি সিআরআর হার দৈনিক ভিত্তিতে ৩.৫% এবং দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৪% করা হয়েছে, যা পূর্বে দৈনিক ৪.৫% এবং দ্বি-সাপ্তাহিক গড় ভিত্তিতে ৫% ছিল। করোনার সময়ে দেশের অর্থনীতিতে যেন ক্ষতিকর প্রভাব না পড়ে এবং মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার প্রবাহ ঠিক থাকে, সেজন্য এই হার হ্রাস করা হয়েছিল। সিআরআর হ্রাসের ফলে ব্যাংকগুলোর কাছে অতিরিক্ত অর্থ থাকে, যা তারা বাজারে বেশি বিনিয়োগ করতে পারে এবং মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার প্রবাহ বৃদ্ধি পায়। এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো সুদ প্রদান করে না, যা সুদমুক্ত সঞ্চয় হিসেবে বিবেচিত।
ব্যাংক যে অংশটি বিনিয়োগ করতে পারে না, তার একটি অংশ সিআরআর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংকে জমা দিতে হয়। পাশাপাশি, আরেকটি অংশ সম্পদ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়, যা ‘স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও’ (SLR) বা বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ হার নামে পরিচিত। বর্তমানে এর হার ১৩%। সুদি ব্যাংকগুলো এসএলআর হিসেবে ট্রেজারি বিল ও বন্ড ব্যবহার করে থাকে। অর্থাৎ, একটি অংশ নগদ ক্যাশে জমা করার পাশাপাশি আরেকটি অংশ দিয়ে বন্ড কিনতে হয়। ব্যাংকগুলো তারল্য সংকটে পড়লে এই বন্ড কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে বিক্রি করে নগদ টাকা সংগ্রহ করতে পারে।
ইসলামি ব্যাংকগুলোর জন্য এসএলআর ও সিআরআর-এর ক্ষেত্রে ভিন্ন আইন রয়েছে। তাদের এডিআর (Asset-Liability Ratio) অনুযায়ী, তারা সর্বোচ্চ ৯০% পর্যন্ত বিনিয়োগ করতে পারে। বাকিটা এসএলআর ও সিআরআর হিসেবে রাখতে হয়। এর মধ্যে অন্তত ৫.৫% সিআরআর এবং বাকি ৫.৫% এসএলআর হিসেবে রাখা হয়। এসএলআর সম্পূর্ণ সুদি বন্ড। দীর্ঘকাল ধরে ইসলামি ব্যাংকগুলোকেও এই সুদি বন্ডে বিনিয়োগ করতে হতো এবং প্রাপ্ত সুদ দান করে দিতে হতো। কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নীতি অনুযায়ী, সিআরআর ও এসএলআর হিসেবে মোট ১৮.৫% টাকা জমা দেওয়ার পর বাকি ৮১.৫% পর্যন্ত ঋণ বিতরণ করা যায়। অতিরিক্ত ৩.৫% মূলত বন্ডে বিনিয়োগ হয়, যা বিনিয়োগসীমার মধ্যেই ধরা হয়।
ইসলামি ব্যাংক প্রতিষ্ঠার ২১ বছর পর, ২০০৪ সালের ২ সেপ্টেম্বর বাংলাদেশ সরকার প্রথমবারের মতো ‘বাংলাদেশ সরকার ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড বিধি ২০০৪’ প্রবর্তন করে, যা ‘বিজিআইআইবি’ বা বাংলাদেশ গভর্মেন্ট ইসলামিক ইনভেস্টমেন্ট বন্ড নামে পরিচিত। এটি মূলত ইসলামি ব্যাংকগুলোকে এসএলআর সুবিধা প্রদানের জন্য তৈরি করা হয়। বিধিমালা অনুযায়ী, ইসলামি বন্ড লাভ-ক্ষতির ভিত্তিতে ক্রয় করতে হবে, যদিও আইনে একে কোথাও ‘মোদারাবা’ বলা হয়নি, অথচ বাস্তবে এটি মোদারাবা বন্ড। এই প্রজ্ঞাপন কার্যকর হওয়ার পর ইসলামি ব্যাংকগুলো এসএলআর হিসেবে সুদি বন্ডের পরিবর্তে মোদারাবা বন্ড কেনার সুযোগ পেয়েছে।
ইসলামি বিনিয়োগ বন্ড বিধি ২০০৪-এর কিছু দিক প্রশ্নবিদ্ধ। এতে ‘ইসলামি বন্ড’ শব্দটি ব্যবহার করা হলেও এর ইসলামি প্রকৃতি সম্পর্কে কোনো ব্যাখ্যা নেই। যদিও বাহ্যিকভাবে এটিকে মোদারাবা হিসেবে গণ্য করা যায়। প্রজ্ঞাপনে বন্ড হস্তান্তরযোগ্য হলেও কী নীতিতে হবে তা উল্লেখ নেই। মোদারাবা তহবিল যদি সম্পূর্ণ তরল থাকে, তবে কমবেশি করে মোদারাবা বন্ড কেনাবেচা করা যাবে কিনা, সে বিষয়ে সুনির্দিষ্ট উল্লেখ নেই। প্রজ্ঞাপনের ধারা ৬ অনুযায়ী, অভিহিত মূল্য ও মুনাফা দুটিই ফেরত দেওয়া হবে এবং লোকসান হলে তা বন্ডধারী বহন করবে না। এর অর্থ, বিনিয়োগকৃত পুঁজির পূর্ণ নিরাপত্তা প্রদান করা হয়েছে, যা ইসলামি শরিয়াহ অনুযায়ী সম্পূর্ণ সুদি কারবার, কারণ ঋণের বিপরীতে অতিরিক্ত গ্রহণ ইসলামি বন্ডে অনুমোদিত নয়। ধারা ৭-এ বলা হয়েছে, বন্ড ফান্ড থেকে বিনিয়োগ নেওয়ার সময় দায়মুক্ত সিকিউরিটিজ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে রক্ষিত দায়মুক্ত স্থিতি বন্ধক রাখতে হবে। মোদারাবা সঞ্চয় আমানত হিসেবে মুনাফার হার মাসিক ভিত্তিতে প্রদান করতে হবে। ছয় মাস মেয়াদি ইসলামি বন্ডের ক্ষেত্রে ৮০% ধারক এবং ২০% ইসলামি বন্ড ফান্ড পাবে। ইসলামি ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে ‘আমরা ইসলামি বন্ড বিধানের ধারা অনুযায়ী অর্জিত মুনাফাসহ অর্থায়নের সমুদয় অর্থ মেয়াদ পূর্তির তারিখে পরিশোধ করব’—এই মর্মে আবেদন করতে হবে। এই আলোচনা থেকে স্পষ্ট হয় যে, কেন্দ্রীয় ব্যাংক আলোচিত ইসলামি বন্ডের বিনিয়োগ করে থাকে অন্যান্য ইসলামি ব্যাংকের তারল্য সংকট পূরণের জন্য, যা মূলের নিরাপত্তাসহ হয়ে থাকে এবং একেই ইসলামি বন্ড বলা হচ্ছে।
প্রায় দশ বছর পর, ২০১৪ সালে ইসলামি বন্ড আইন সংশোধন করা হয়। সংশোধিত আইনটি পূর্বের তুলনায় শরিয়াহর দিক থেকে কিছুটা স্বচ্ছ। এতে ‘মেয়াদ পূর্তিতে পরিশোধ পদ্ধতি’র অধীনে বলা হয়েছে, ‘সংঘটিত লোকসানের সব ক্ষেত্রে লোকসান সমন্বয়পূর্বক স্পেশাল ইসলামি বন্ড ফান্ড অ্যাকাউন্ট বিকলন করিয়া বন্ড ধারককে অবশিষ্ট মূল্য পরিশোধ করা হইবে’। পূর্বের প্রজ্ঞাপনে অভিহিত মূল্য ও অর্জিত মুনাফা প্রদানের কথা বলা হয়েছিল, কিন্তু সংশোধিত আইনে লোকসান হলে অবশিষ্টটুকু দেওয়ার কথা বলা হয়েছে, যা শরিয়াহ স্বচ্ছতা বৃদ্ধি করেছে। তবে, কিছু বিষয় এখনো সংশোধন করা প্রয়োজন। যেমন—ইসলামি টার্মস, যেমন মোদারাবা বা মোশারাকা শব্দগুলো ব্যবহার করা উচিত, যাতে ইসলামিকরণ আরও স্পষ্ট হয়। তাই একে ‘মোদারাবা বন্ড’ বা ‘মোদারাবা সুকুক’ নাম দেওয়া অধিক সমীচীন। সংশোধিত প্রজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ইসলামি ব্যাংকগুলো নিজেদের মধ্যে অথবা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সঙ্গে রেপো বা রি-পারচেজিং করতে পারবে। রেপোর জন্য শরিয়তে সুনির্দিষ্ট নীতিমালা রয়েছে এবং অ্যাসেট না থাকলে কমবেশিতে তা করা যায় না। ইস্যুকারীর সঙ্গে করা হলে তা বাই-ব্যাক হয়ে যেতে পারে। তাই এ বিষয়গুলোর ব্যাপারে শরিয়া নির্দেশনা স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা উচিত।
মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার প্রবাহ : ধরুন, এবিসি ব্যাংকের মেয়াদি দায় এবং তলবি দায়ের পরিমাণ ২০০ টাকা। এর ওপর ৫% সিআরআর জমা রাখতে হলে, ১০ টাকা বাংলাদেশ ব্যাংকে জমা রাখতে হবে। এখন যদি সিআরআর ৩% করা হয়, তাহলে ব্যাংকটিকে ৬ টাকা জমা রাখতে হবে। সিআরআর রেট কমার কারণে ব্যাংকটির কাছে (১০-৬) বা ৪ টাকা বেশি থাকবে। এই ৪ টাকা ব্যাংকটি বাজারে বেশি বিনিয়োগ করতে পারবে। অর্থাৎ মুদ্রা বাজারে নগদ টাকা বেশি থাকবে। আবার সিআরআর যদি বাড়িয়ে দেওয়া হয়, তাহলে মুদ্রা বাজারে নগদ টাকা কমে যাবে। এভাবেই মূলত সিআরআর মুদ্রাবাজারে নগদ টাকার প্রবাহ ঠিক রাখতে কাজ করে থাকে। করোনার সময় যেহেতু বাজারে নগদ টাকার প্রবাহের চাহিদা বেড়ে যায়, তাই সিআরআর রেট হ্রাস করা হয়। উল্লেখ্য, সিআরআর-এর বিপরীতে কেন্দ্রীয় ব্যাংক কোনো সুদ প্রদান করে না। এটি সুদমুক্ত সঞ্চয়।
বাংলাদেশ ব্যাংকে অর্থ জমা : এডিআর অনুযায়ী, ব্যাংক যে অংশটি বিনিয়োগ করতে পারে না, এর এক অংশ সিআরআর হিসেবে কেন্দ্রীয় ব্যাংককে জমা করতে হয়; পাশাপাশি আরেকটি অংশ সম্পদ দিয়ে সংরক্ষণ করতে হয়। ব্যাংকিং পরিভাষায় একে 'স্ট্যাটিউটরি লিকুইডিটি রেশিও' (Statutory liquidity ratio) বলে। যা সংক্ষেপে 'এসএলআর' (SLR)। বাংলায় 'বিধিবদ্ধ তারল্য সংরক্ষণ হার' বলে। বর্তমানে এর হার ১৩%।

















