চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি স্থাপনের মাধ্যমে সেখানে স্থায়ী ঘাঁটি নির্মাণ ও খনিজ উত্তোলনের এক নতুন যুগে প্রবেশের চেষ্টা চালাচ্ছে বিশ্বশক্তিগুলো। তবে এই উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনার তেজস্ক্রিয়তা ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিজ্ঞানীরা। বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র, রাশিয়া ও চীন এই প্রতিযোগিতায় একে অপরকে টেক্কা দেওয়ার চেষ্টা করছে। মার্কিন মহাকাশ গবেষণা সংস্থা নাসা ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি বসানোর ঘোষণা দিয়েছে। অন্যদিকে, রাশিয়া ও চীন যৌথভাবে ২০৩৬ সালের মধ্যে একই লক্ষ্য অর্জনে কাজ করে যাচ্ছে।
বিজ্ঞানীদের মতে, চাঁদের গর্তে জমে থাকা বরফ উত্তোলনের জন্য প্রচুর বিদ্যুতের প্রয়োজন, যা সৌরশক্তি দিয়ে মেটানো সম্ভব নয়। এই বরফ থেকে পানীয় জল, বাতাস ও রকেটের জ্বালানি তৈরি করা সম্ভব। যুক্তরাজ্যের ব্যাঙ্গোর ইউনিভার্সিটির নিউক্লিয়ার ফিউচারস ইনস্টিটিউটের পরিচালক সাইমন মিডলবার্গ জানান, চাঁদ বা অন্য গ্রহে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য পারমাণবিক শক্তিই সবচেয়ে যৌক্তিক সমাধান। তবে তিনি সতর্ক করে বলেছেন, চাঁদের ঘাঁটি পরিচালনার জন্য তিন থেকে চারটি চুল্লি একসঙ্গে চালানোর প্রয়োজন হতে পারে।
নাসার প্রস্তাবিত ‘লুনার রিঅ্যাক্টর ১’ চুল্লিটি ২০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং পাঁচ বছর কোনো রক্ষণাবেক্ষণ ছাড়াই চলতে সক্ষম হবে। ৬ হাজার কেজির কম ওজনের এই চুল্লিটি ছোট রকেটে বহন করা সম্ভব। রাশিয়ার তৈরি ‘সেলেনা’ চুল্লিটি ১০ কিলোওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করবে এবং এটি ১০ বছর স্থায়ী হবে। সেলেনার ওজন ১ হাজার ১০০ থেকে ১ হাজার ৩০০ কেজির মধ্যে হওয়ায় এটি চাঁদের পৃষ্ঠে অবতরণ করানো তুলনামূলক সহজ।
মহাকাশে পারমাণবিক শক্তির ব্যবহার অবশ্য নতুন নয়। সোভিয়েত ইউনিয়ন ষাটের দশক থেকে আশির দশক পর্যন্ত গোয়েন্দা উপগ্রহে বিদ্যুৎ সরবরাহের জন্য ৩০টিরও বেশি পারমাণবিক চুল্লি ব্যবহার করেছিল। যুক্তরাষ্ট্রের ক্ষেত্রে, গত ৭০ বছরে মহাকাশ পারমাণবিক শক্তিতে ২ হাজার কোটি ডলার ব্যয় করলেও ১৯৬৫ সালের একটি পরীক্ষামূলক প্রকল্প ছাড়া তারা বড় কোনো সাফল্য পায়নি।
বিশেষজ্ঞরা তেজস্ক্রিয় দুর্ঘটনার ঝুঁকি নিয়ে বারবার সতর্ক করছেন। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এক নির্বাহী আদেশে ২০৩০ সালের মধ্যে চাঁদে পারমাণবিক চুল্লি পাঠানোর নির্দেশ দেন। চালু অবস্থায় কোনো চুল্লি পৃথিবীতে ফিরে এলে বা উৎক্ষেপণের সময় দুর্ঘটনা ঘটলে বড় বিপর্যয় হতে পারে। ১৯৭৮ সালে সোভিয়েত ইউনিয়নের ‘কসমস ৯৫৪’ উপগ্রহ ভেঙে পড়লে কানাডার বিশাল এলাকায় তেজস্ক্রিয় দূষণ ছড়িয়ে পড়েছিল। মিডলবার্গের মতে, যদিও উৎক্ষেপণের সময় ঝুঁকি কম থাকে, কিন্তু চুল্লি চালু হওয়ার পর ঝুঁকি বহুগুণ বেড়ে যায়।
ভূরাজনৈতিক প্রতিদ্বন্দ্বিতার অংশ হিসেবেই এই মহাকাশ দৌড় তীব্র হচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র কক্ষপথে অস্ত্র মোতায়েনের বিষয়টি নিশ্চিত করেছে। লুনার পলিসি প্ল্যাটফর্মের পরিচালক আন্তোনিনো সালমেরির মতে, ১৯৬৭ সালের মহাকাশ চুক্তিতে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারে নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে চাঁদে এই চুল্লি স্থাপন করলে অন্যান্য দেশের প্রবেশ বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা নতুন আইনি ও নিরাপত্তা সংকটের জন্ম দিতে পারে।

















