ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগার ও এর অধীন বিজ্ঞান পাঠাগারে বই ফেরত দিতে দেরি হলে শিক্ষার্থীদের গুনতে হয় মাত্র এক টাকা জরিমানা। বাংলাদেশ ব্যাংক ২০২৫ সালের ২৯ মে নতুন নকশার যেসব নোট ছাপানোর ঘোষণা দেয়, সেই তালিকায় এক টাকার নোট ছিল না। কিন্তু এই সামান্য অর্থ জমা দেওয়ার প্রক্রিয়াটি ডিজিটাল যুগের সাথে একেবারেই মানানসই নয়। জরিমানার এই টাকা পরিশোধ করতে শিক্ষার্থীদের সরাসরি ব্যাংকে গিয়ে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। প্রযুক্তিনির্ভর আধুনিক সেবার যুগে এই নিয়মটি অনেক শিক্ষার্থীর কাছেই বিস্ময়কর ও বিরক্তিকর মনে হচ্ছে।
বিষয়টি সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নতুন করে আলোচনার জন্ম দিয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের পদার্থবিজ্ঞান বিভাগের ২০২৩-২৪ শিক্ষাবর্ষের শিক্ষার্থী নাবিলা হক ফেসবুকে একটি পোস্ট দিয়ে এই ভোগান্তির চিত্র তুলে ধরেন। সায়েন্স লাইব্রেরি থেকে বই ফেরত দিতে আট-নয় দিন দেরি হওয়ায় তাঁকে এক টাকা জরিমানা করা হয়। এই টাকা জমা দেওয়ার জন্য তাঁকে টিএসসি এলাকার জনতা ব্যাংকে যেতে হয়। গত ৩ নভেম্বর গ্রন্থাগারের এক কর্মকর্তার স্বাক্ষর করা একটি ফরমও তিনি প্রকাশ করেছেন, যেখানে জরিমানার পরিমাণ লেখা রয়েছে এক টাকা। নাবিলা জানান, পূজার ছুটির কারণে নির্ধারিত সময়ে বইটি জমা দেওয়া সম্ভব হয়নি, আর এক টাকার জন্য ব্যাংকে যাওয়াটা তাঁর কাছে অত্যন্ত বিরক্তিকর ঠেকেছে।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ওয়েবসাইট ঘেঁটে জরিমানা সংক্রান্ত নিয়মের অসামঞ্জস্যতাও পাওয়া গেছে। ওয়েবসাইটের এক অংশে বিলম্বের প্রথম ও দ্বিতীয় সপ্তাহে ৫০ পয়সা এবং তৃতীয় ও চতুর্থ সপ্তাহে এক টাকা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। তবে এই হার প্রতি সপ্তাহের জন্য, নাকি উল্লিখিত সময়ের জন্য মোট জরিমানা, তা স্পষ্ট নয়। অন্যদিকে একই ওয়েবসাইটে প্রকাশিত গ্রন্থাগারের অধ্যাদেশভিত্তিক নীতিমালার ১৪ নম্বর বিধানে শিক্ষার্থীদের জন্য প্রতি বইয়ে প্রতি সপ্তাহ বা সপ্তাহের অংশবিশেষের বিলম্বে ২৫ পয়সা জরিমানার কথা বলা হয়েছে। এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী টাকা হিসাব দপ্তরে নগদে জমা দেওয়ার কথা থাকলেও বাস্তবে শিক্ষার্থীরা ব্যাংকে যেতে বাধ্য হচ্ছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের কেন্দ্রীয় গ্রন্থাগারের ভারপ্রাপ্ত গ্রন্থাগারিক অধ্যাপক কাজী মোস্তাক গাউসুল হক এই নিয়মকে অযৌক্তিক বলে স্বীকার করেছেন। তিনি জানান, এ নিয়ম দীর্ঘদিন ধরে, প্রায় ৪০ থেকে ৫০ বছর বা তারও আগে থেকে প্রচলিত। গ্রন্থাগারিক জানান, বর্তমানে জরিমানার টাকা জমা দেওয়ার একমাত্র পদ্ধতি ব্যাংকের মাধ্যমে পরিশোধ। তবে শিক্ষার্থীদের কষ্ট লাঘবে তিনি বিকল্প কোনো ব্যবস্থা চালুর বিষয়ে কর্তৃপক্ষের সাথে আলোচনার আশ্বাস দিয়েছেন।
বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) অধ্যাপক মোহাম্মদ আলমোজাদ্দেদী আলফেছানী জানান, সব লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হওয়ার বাধ্যবাধকতার কারণে বই ফেরতের জরিমানাও সেখানে জমা দিতে হয়। তিনি মনে করেন, এটি শিক্ষার্থীদের সতর্ক করার একটি উপায় হিসেবে কাজ করে। তবে ভবিষ্যতে কিউআর কোড বা অনলাইন পেমেন্ট পদ্ধতি চালুর মাধ্যমে এই ভোগান্তি নিরসনের উদ্যোগ নেওয়া হবে বলে তিনি জানিয়েছেন। অথচ ২০২৫ সালের ১৩ মে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জনসংযোগ দপ্তরের এক বিজ্ঞপ্তিতে জানানো হয়েছিল, ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষ থেকে প্রথম বর্ষের শিক্ষার্থীরা বিভাগ, ইনস্টিটিউট ও হলের জামানতসহ বিভিন্ন ফি অনলাইনে অথবা সংশ্লিষ্ট কার্যালয়ে জমা দিতে পারবেন। ওই বিজ্ঞপ্তিতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ জানিয়েছিল, শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি নিরসনেই এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু গ্রন্থাগারের ক্ষেত্রে সেই আধুনিকায়ন এখনো পৌঁছায়নি।

















