রাজনৈতিক দলের কার্যালয়, নেতাদের বাসভবন ও রাজনৈতিক কর্মসূচি ঘিরে একের পর এক ‘মব’ বা জনসমাগম করে চাপ সৃষ্টির ঘটনাগুলো দেশের রাজনৈতিক সহনশীলতা এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করেছে। সম্প্রতি বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) কেন্দ্রীয় কার্যালয়ের সামনে হামলার ঘটনা এবং এর আগে জাসদ ও জাতীয় পার্টির কার্যালয় ঘিরে একই ধরনের পরিস্থিতির পর এই উদ্বেগ আরও বেড়েছে।
গতকাল সোমবার রাতে ঢাকার পল্টন মোড়ে সিপিবির নেতা-কর্মীরা একটি মিছিল বের করেন। মিছিলটি সেখানে সংক্ষিপ্ত সমাবেশে ‘জয় বাংলা, জয় সমাজতন্ত্র’ স্লোগান দিয়ে শেষ হয়। এর পরপরই যুবদল ও ছাত্রদলের নেতা-কর্মী পরিচয় দেওয়া ৪০ থেকে ৫০ জন ব্যক্তি ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দেওয়ার প্রতিবাদ করেন। দুই পক্ষের মধ্যে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিপিবির দুজন নেতা-কর্মীকে মারধর করা হয়। পরে হামলাকারীরা লাঠিসোঁটা নিয়ে সিপিবির কেন্দ্রীয় কার্যালয় মুক্তিভবনের সামনে অবস্থান নেন এবং নানা স্লোগান দেন। তাঁরা কার্যালয়ের প্রধান ফটক ভেঙে ভেতরে ঢোকার চেষ্টা করেন, দাবি করেন যে কার্যালয়ে কার্যক্রম নিষিদ্ধ দলের সদস্যরা অবস্থান করছেন। সিপিবির নেতা-কর্মীরা বাধা দিলে হামলা চালানো হয়, এতে কয়েকজন আহত হন।
ঘটনার পর সিপিবির সভাপতি কাজী সাজ্জাদ জহির চন্দন ও সাধারণ সম্পাদক আবদুল্লাহ ক্বাফী রতন এক বিবৃতিতে জানান, পুলিশ ঘটনাস্থলে এসে কার্যালয়ের নিরাপত্তার দায়িত্ব নেওয়ার পরও হামলাকারীরা দীর্ঘ সময় কার্যালয় অবরুদ্ধ করে রাখেন। তাঁরা কার্যালয়ে অবস্থানরত কথিত নিষিদ্ধ দলের সদস্যদের তাঁদের হাতে তুলে দেওয়ার দাবি জানাতে থাকেন। সিপিবির নেতারা এই ঘটনাকে অবাধ রাজনৈতিক চর্চা ও রাজনৈতিক সহাবস্থানের ওপর সরাসরি আঘাত হিসেবে উল্লেখ করে হামলাকারীদের চিহ্নিত করে বিচারের দাবি জানিয়েছেন। সিপিবি আরও অভিযোগ করেছে যে হামলার পর পুলিশ তাঁদের দলের দুই সদস্য ইরান মোল্লা ও সোহেল ফকিরকে আটক করে নিয়ে যায়, যদিও পরে গভীর রাতে তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হয়।
এই ঘটনার আগে গতকাল সোমবার বিকেলে সুনামগঞ্জে নারী বাউলশিল্পীদের গান গাইতে বাধা দেওয়ার প্রতিবাদে ঢাকার ধানমন্ডিতে মানববন্ধন কর্মসূচির ডাক দিয়েছিলেন সংস্কৃতিকর্মীরা। ধানমন্ডি ২৭ নম্বরে মীনাবাজারের সামনে জড়ো হলেও পুলিশের বাধায় তাঁরা প্রতিবাদ কর্মসূচি করতে পারেননি। সেখান থেকে ছাত্র ইউনিয়নের সাবেক সভাপতি দীপক শীলকে আটক করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং পরে রাত ৯টার দিকে তাঁকে ছেড়ে দেওয়া হয়। সেখানেও পুলিশের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীদের উপস্থিতির অভিযোগ উঠেছে, যা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। গত এক বছরে মানিকগঞ্জ, শেরপুর ও সিলেটেও বাউলশিল্পীদের ওপর হামলার ঘটনা এবং এসব প্রতিবাদ কর্মসূচিতেও বাধা দেওয়া হয়েছে।
এর আগে গত ২৬ সেপ্টেম্বর রাজধানীর গুলিস্তানে জাসদের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে দলের কেন্দ্রীয় প্রতিনিধি সভা চলাকালে পুলিশ ২৮৯ জনকে আটক করে, যার মধ্যে ২৭ জনকে গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তাঁদের বিরুদ্ধে কার্যালয়ের ভেতরে ‘জয় বাংলা’ স্লোগান দিয়ে ভয়ভীতি প্রদর্শন এবং অস্থিতিশীল পরিবেশ তৈরির অভিযোগ আনা হয়েছিল। জাসদের পক্ষ থেকে জানানো হয়, ঢাকা মহানগর পুলিশের অনুমতি নিয়ে সভার আয়োজন করা হয়েছিল এবং সভা চলাকালে বিএনপির নেতা-কর্মীরা কার্যালয়ে হামলা চালান বলে অভিযোগ করা হয়। পরে পুলিশ কার্যালয় ঘেরাও করে নেতা-কর্মীদের আটক করে নিয়ে যায় এবং কার্যালয়ে তালা ঝুলিয়ে দেয়, যদিও পরে তালা খোলার জন্য চাবি দেওয়া হয়। গ্রেপ্তার হওয়া ২৭ জনের প্রায় সবাই জামিনে মুক্তি পেয়েছেন। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অভিযানের সময় দাবি করেছিল যে কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের নেতা-কর্মীরা জাসদ কার্যালয়ে জড়ো হয়েছেন, যা শেষ পর্যন্ত প্রমাণ করতে পারেনি।
জাতীয় পার্টির কার্যালয়ে কয়েক দফা হামলা ও আগুন দেওয়ার ঘটনা ঘটেছে অন্তর্বর্তী সরকারের আমলে। সম্প্রতি উত্তরায় জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদেরের বাসায় মিছিল নিয়ে হামলার ঘটনাও ঘটেছে। জাতীয় পার্টির জনসমর্থন তলানিতে ঠেকলেও তাদের কার্যালয় ও নেতাদের লক্ষ্যবস্তু বানানো হচ্ছে, যা রাজনৈতিক পরিচয় বা অবস্থানের কারণে কোনো দলকে লক্ষ্যবস্তু করার প্রবণতা বন্ধ না হওয়ার ইঙ্গিত দেয়। এই প্রবণতার অংশ হিসেবে, ২০২৫ সালের ৫ ফেব্রুয়ারি রাতে শেখ হাসিনার অনলাইন ভাষণ দেওয়ার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে বিক্ষোভকারীরা বাড়িটিতে ঢুকে ব্যাপক ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগ করেন।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর কয়েক দিন দেশে কার্যত কোনো কার্যকর সরকার ছিল না। রাষ্ট্রীয় কর্তৃত্বের সেই শূন্যতায় দেশের বিভিন্ন স্থানে রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলা, ভাঙচুর ও অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে। কোথাও আওয়ামী লীগের কার্যালয়, কোথাও অন্য প্রতিষ্ঠানে হামলা হয়। এসব ঘটনার পেছনে রাজনৈতিক ক্ষোভ, প্রতিশোধ এবং দীর্ঘদিনের জমে থাকা অসন্তোষের ভূমিকা হয়তো ছিল। তখন অনেকেই এসব ঘটনাকে তাৎক্ষণিক ক্ষোভের বহিঃপ্রকাশ হিসেবে দেখলেও, দুই বছর পরও রাজনৈতিক দলের কার্যালয় ও নেতাদের বাসায় হামলার ঘটনা ঘটছে। এখন আর এসব ঘটনাকে শুধু গণ-অভ্যুত্থান-পরবর্তী পরিস্থিতির ফল বলে চালিয়ে দেওয়ার সুযোগ কম। বরং রাজনৈতিক সহনশীলতা, সরকারের দায়িত্ব এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সক্ষমতা নিয়ে প্রশ্ন তুলছে।
সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট ও ধরন এক না হলেও, প্রায় প্রতিটি ঘটনায় ক্ষমতাসীন দলের নেতা-কর্মীরা সামনে থেকেছেন এবং আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তাদের পক্ষ হয়ে ভুক্তভোগীদের বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে। গত ফেব্রুয়ারিতে দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে ক্ষমতায় আসা বিএনপি মধ্যপন্থী হিসেবে বিবেচিত এবং দলটির নেতারা সহনশীল রাজনীতির কথা বলছেন।
কোনো স্লোগান নিয়ে আপত্তি থাকলে তার প্রতিবাদ করার সুযোগ রয়েছে, কিন্তু সেই আপত্তি থেকে অন্য দলের নেতা-কর্মীদের মারধর করা কিংবা তাঁদের কার্যালয়ের সামনে গিয়ে হুমকি দেওয়া গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আইন ভঙ্গ করেছে কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্বও কোনো দলের কর্মীদের নয়। সিপিবি, জাসদ ও জাতীয় পার্টির সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো তাই শুধু কয়েকটি রাজনৈতিক দলের নিরাপত্তার প্রশ্ন নয়, বরং গণ-অভ্যুত্থানের পর গড়ে ওঠা রাজনৈতিক ব্যবস্থায় ভিন্নমতের অধিকার কতটা সুরক্ষিত থাকবে, তারও পরীক্ষা।
বিএনপি এখন সরকারে। ফলে রাজনৈতিক সহিংসতা বন্ধ করা এবং সব দলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করার দায়িত্ব বর্তমান সরকারের। ক্ষমতাসীন দলের পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অন্য দলের কার্যালয়ে হামলা করলে সরকার তার দায় এড়াতে পারে না। যদি দলটির ভেতর থেকে কেউ অতি উৎসাহী হয়ে এগুলো করে থাকে, তাহলে নীতিনির্ধারকদের উচিত এর লাগাম টানা। রাজনৈতিক দলের কার্যালয়ে হামলার ঘটনা শুধু আক্রান্ত দলের সমস্যা নয়, এর প্রভাব পড়ে পুরো রাজনৈতিক পরিবেশে। গণ-অভ্যুত্থানের পর বাংলাদেশে ভিন্নমত প্রকাশের যে স্বাধীনতার প্রত্যাশা তৈরি হয়েছিল, তা সব বৈধ রাজনৈতিক দলের জন্যই নিশ্চিত করতে হবে।
কোনো রাজনৈতিক স্লোগান আইন ভঙ্গ করেছে কি না, সেটি নির্ধারণের দায়িত্বও কোনো দলের কর্মীদের নয়।.ক্ষমতাচ্যুত আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে ২০১৪ ও ২০২৪ সালের দুটি নির্বাচনে বিরোধী দল ভোট বর্জন করেছিল।
২০১৪ সালে বিএনপিসহ বিরোধী দলগুলোর ভোট বর্জন করলে এক তরফা ওই নির্বাচনে অংশ নিয়ে এরশাদ, তাঁর দল জাতীয় পার্টি ও দলটির নেতারা ক্ষমতার ভাগ পুরোপুরি উপভোগ করে।

















