রাজধানীর কারওয়ান বাজারে এক সবজি বিক্রেতার কাছে চাঁদা দাবির ঘটনাকে কেন্দ্র করে মারামারির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ছড়িয়ে পড়ে। গত ১৫ অক্টোবর ‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ নামের একটি ফেসবুক পেজে ভিডিওটি প্রকাশ করা হয়, যার ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘কারওয়ান বাজারে চাঁদাবাজি, ভোগান্তিতে সাধারণ ব্যবসায়ীরা।’ মুহূর্তেই এটি ১২ লাখের বেশিবার দেখা হয় এবং এক হাজারের বেশি মন্তব্য জমা পড়ে। ভিডিওতে হাফহাতা শার্ট পরা এক যুবকের প্রতিবাদী ভূমিকায় মুগ্ধ হয়ে অনেকেই তাঁর প্রশংসা করেন।
ভিডিওতে দেখা যায়, টিয়া রঙের কোটি পরা এক ব্যক্তি সবজি বিক্রেতাকে হুমকি দিয়ে বলছেন, ‘হয় টাকা দিবি, না হয় দোকান উঠাবি।’ বিক্রেতা একটু পর টাকা দেবেন বলে অনুরোধ করলে কোটি পরা যুবক তাঁর মুখে থাপ্পড় দেন। এ দৃশ্য দেখে হাফহাতা শার্ট পরা আরেক যুবক এগিয়ে এসে থাপ্পড় মারার কারণ জানতে চান। কোটি পরা যুবক তাঁকে ‘আপনি কে, আপনাকে কেন বলব?’ বলে জবাব দিলে হাফহাতা শার্ট পরা ওই যুবক তাঁকে পরপর ১১টি থাপ্পড় দেন। এই ঘটনা দেখে আশপাশে লোক জড়ো হয়ে যায়।
মন্তব্যের ঘরে সাকিব হাসান নামের একজন লেখেন, ‘মাইর কম হয়েছে।’ জামালউদ্দিন কানু নামের এক ব্যক্তি লিখেছেন, ‘এভাবেই প্রতিবাদ করতে হবে।’ আর নাসরীন সুলতানা নামের এক নারী লিখেছেন, ‘প্রতিটি চাঁদাবাজকে এভাবেই বিচার করা উচিত।’ তবে এই ভিডিওটি বাস্তব কোনো চাঁদাবাজির ঘটনা নয়, বরং পুরো ঘটনাটিই সাজানো। সবজি বিক্রেতা, চাঁদাবাজ ও প্রতিবাদকারী—তিনজনই অভিনয় করেছেন।
কারওয়ান বাজারের যে সবজির দোকানে ভিডিওটি ধারণ করা হয়েছে, সেটির মালিক শাহাবুদ্দিন ১৭ অক্টোবর প্রথম আলোকে জানান, ‘কিছুদিন আগে কয়েকজন এসে আমার দোকানে কিছু সময় বসতে চান। সচেতনতামূলক একটি ভিডিও বানাবেন বলে জানান। পরে দেখি, তাঁরা চড়-থাপ্পড় মারামারি করেছেন। এরপরে কী হয়েছে, জানি না।’
‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ নামের এই পেজ ছাড়াও ‘ফাইব ব্রাদার ২.০’ এবং ‘চিটাগং জুয়েল ০০১’ নামের পেজগুলো থেকেও একই ধরনের ভিডিও প্রকাশ করা হচ্ছে। এসব ভিডিওতে কখনো রিকশাওয়ালাকে থাপড়ানো, কখনো দোকানদারকে থাপড়ানো, কখনো তৃতীয় লিঙ্গের মানুষকে মারধর, কখনো চাঁদাবাজকে ধরে মারধর, আবার কখনো লাঠি হাতে ভয় দেখানোর মতো দৃশ্য প্রচার করা হয়। ভিডিওগুলো সাজানো হলেও বাস্তবের আদলে প্রচার করা হয়, যা দেখে সাধারণ মানুষ বিভ্রান্ত হচ্ছেন এবং অপতথ্য ছড়ানোর অবাধ সুযোগ তৈরি হচ্ছে।
তথ্যব্যবস্থায় প্রযুক্তির প্রভাব নিয়ে গবেষণাকারী প্রতিষ্ঠান ডিজিটালি রাইটের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মিরাজ আহমেদ চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটা একধরনের প্রতারণা। মনিটাইজেশন থেকে টাকা আয়ের জন্য এসব করা হয়। এই মনিটাইজেশনের ইনটেন্ট থেকেই অনেক ডিজইনফরমেশন (অপতথ্য) তৈরি হয়। এটাকে বিভিন্নভাবে কনটেক্সট ছাড়া ব্যাখ্যা করার ক্ষেত্র তৈরি হয়, কারণ এ ধরনের কনটেন্টগুলোতে যে ধরনের স্বচ্ছতা থাকা দরকার, সেই স্বচ্ছতা থাকে না।
মিরাজ আহমেদ চৌধুরী আরও বলেন, ‘ক্লিক থেকে টাকা আয় করতে গিয়ে আমরা অনেক সময় ডিজইনফরমেশন অ্যাক্টর হয়ে যাচ্ছি, মিসইনফরমেশন অ্যাক্টর হয়ে যাচ্ছি। এই মনিটাইজেশন মডেলটা হলো অ্যাটেনশন ইকোনমি, মানুষের অ্যাটেনশন ধরে সেটাকে বিক্রি করার একটা অর্থনীতি। এই অর্থনীতিটাই আসলে প্ল্যাটফর্মগুলাকে চালায়। সেটাকে আইন দিয়ে ট্যাকেল করা কঠিন। কিন্তু এই ধরনের কনটেন্টকে এক্সপোজ করা ও প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে কথা বলা দরকার। তাদের প্ল্যাটফর্মের যে মনিটাইজেশন পদ্ধতি, সেই মনিটাইজেশন পদ্ধতি নিয়েও প্রশ্ন তোলা দরকার যে তাদের এই মনিটাইজেশন পদ্ধতি ডিজইনফরমেশন ইন্ডাস্ট্রিটা গড়ে তোলে।’
‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ পেজের প্রধান বা টিম লিডার রিপন মৃধা। তাঁর দলে জামাল হোসেন বনী, মো. সবুজ, মো. সম্রাট, শাওন এবং আজিজুল নামের আরও ছয়জন সদস্য রয়েছেন। তাঁরা সবাই বসুন্ধরা এলাকায় থাকেন এবং বিভিন্ন পেশায় নিয়োজিত বলে জানা গেছে। রিপন মৃধা দাবি করেন, ভিডিওগুলো মানুষের সচেতনতার উদ্দেশ্যে তৈরি করা হয়। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘রাস্তাঘাটে চলাচলের সময় নানা অসংগতি চোখে পড়ে। সেসব বাস্তব ঘটনা আমরা অভিনয়ের মাধ্যমে রিমেক করি। এই ভিডিওগুলোতে আমরা এমন মেসেজ দেওয়ার চেষ্টা করি যে যারা সমাজে চাঁদাবাজি, ছিনতাই, রাস্তাঘাটে ময়লা আবর্জনা ফেলাসহ নানা ধরনের অনিয়ম করে, তাদের এভাবে প্রতিবাদ জানাতে হবে।’
শনিবার বিকেল পর্যন্ত ফেসবুকে ‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ পেজের অনুসারী সংখ্যা ৭ লাখ ৮২ হাজার এবং ইউটিউবে একই নামের চ্যানেলের সাবস্ক্রাইবার ৬ লাখ ২০ হাজার। এসব অ্যাকাউন্টে অন্তত ৩০০ ভিডিও পাওয়া গেছে, যার প্রতিটিই থাপ্পড় দিয়ে শুরু হয়েছে। একটি ভিডিও ফেসবুকে ২ কোটি ৭০ লাখ বার দেখা হয়েছে এবং এতে ৫ হাজার ৪০০ মন্তব্য পড়েছে। ভিডিওগুলো কাঁচামালের বাজারে, রাস্তার পাশে, শপিংমলের সামনে, ফুটপাতে এবং দোকানের মধ্যে ধারণ করা হয়। প্রায় সব কটি ভিডিওতেই তাঁদের থাপ্পড় মারা, চিৎকার করা, ধস্তাধস্তি করা ও গন্ডগোল করতে দেখা গেছে। তাঁদের এমন কর্মকাণ্ড দেখে আশপাশে মানুষ জড়ো হতেও দেখা যায়।
এসব ভিডিওতে দেখা যায়, এক ভিডিওতে সালোয়ার কামিজ পরা হিজড়া বৈশিষ্ট্যের একজন মানুষ টাকা চাচ্ছেন। তখন এক ব্যক্তি এসে তাঁকে একের পর এক থাপ্পড় মারতে শুরু করেন এবং বলতে শোনা যায়, ‘তোদের (হিজড়া) জন্য দেশটা একবারে নষ্ট হয়ে গেছে। লোকজনগুলো পার্কে আইছে, তা–ও তোদের জন্য শান্তি নেই। মানে যেখানে যাইস, সেখানে তোরা নোংরামি করছ। কাজ করে খাইতে পারস না।’ ভিডিওর ক্যাপশনে লেখা ছিল, ‘হিজড়াদের নোংরামি দিন দিন বেড়েই যাচ্ছে।’ আরেকটি ভিডিওতে রাস্তায় পাগলের মতো বসে থাকা এক ব্যক্তির সামনে বালতি ভর্তি পানি ঢেলে দেন এক ব্যক্তি। তখন পাশ থেকে আরেক ব্যক্তি এসে পানি ঢেলে দেওয়া ব্যক্তিকে থাপড়াতে শুরু করেন এবং মাফ চাইতে বাধ্য করেন। এই ভিডিওতে মারধর করা ব্যক্তিরা কনটেন্ট দলের সদস্য হলেও, পাগলের মতো বসে থাকা ব্যক্তিটি তাঁদের দলের কি না, তা নিশ্চিত হওয়া যায়নি।
২০২৪ সালে ‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ পেজে কনটেন্ট তৈরি শুরু হয়। শুরুতে হাস্যরসাত্মক বা ফানি ভিডিও তৈরি করলেও, সেগুলো দর্শকের কাছে তেমন গ্রহণযোগ্যতা পায়নি। এরপর তারা কনটেন্টের ধরনে পরিবর্তন এনে থাপ্পড় মারা, মারামারি করা ও হট্টগোলের কনটেন্ট তৈরি শুরু করে, যা ভালো সাড়া পায়। এরপর একের পর এক এমন ভিডিও তৈরি শুরু হয়। এসব ভিডিও সাজানো হলেও ক্যাপশনে কিংবা ভিডিওর মধ্যে তা উল্লেখ করা হয় না। ভিডিওগুলো আসল বা বাস্তব ভিডিওর আদলে প্রচার করা হয়, ফলে অনেক দর্শক এগুলোকে আসল বলে বিশ্বাস করেন এবং বিভ্রান্তিতে পড়েন।
ভিডিওগুলো থাপ্পড় দিয়ে কেন শুরু হয় জানতে চাইলে ‘রিস্টার্ট ৪২০ শর্টস’ দলের প্রধান রিপন মৃধা প্রথম আলোকে বলেন, ‘সাধারণ ভিডিও করলে সেটা দর্শক দেখতে চায় না। কিন্তু যখন ইউনিক কিছু দিয়ে ভিডিও করা হয়, তখন দর্শক ভিডিওটি শেষ পর্যন্ত দেখে। মূলত মানুষকে আকৃষ্ট করার জন্য থাপ্পড় দিয়ে ভিডিও করা হয়।’
এসব ভিডিও দেখে সাধারণ মানুষের পাশাপাশি বিভিন্ন গণমাধ্যমও বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। কয়েক মাস আগে দেশের একটি বেসরকারি টেলিভিশন তাদের চাঁদাবাজির প্রতিবাদের ভিডিও আসল ভেবে প্রকাশ করে। পরে বিষয়টি সাজানো বুঝতে পেরে সেই গণমাধ্যমের পেজ থেকে ভিডিওটি সরিয়ে ফেলা হয় বলে জানান রিপন মৃধা। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, ‘এরপর আমরা লাইভে এসে আমাদের ভিডিওগুলো যে সাজানো, সেটি সবাইকে বলি যাতে কেউ বিভ্রান্ত না হয়।’
বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, প্রকাশ্যে এভাবে থাপ্পড় দেওয়া সহিংসতাকে উসকে দেওয়া এবং আইনত অপরাধ। তাঁরা বলছেন, ভিউ ব্যবসার জন্য এভাবে একের পর এক থাপ্পড় দেওয়া এবং অভিনয় করা ভিডিও আসল বলে দর্শকের সামনে উপস্থাপন করা একধরনের প্রতারণা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক সাইফুল আলম চৌধুরী প্রথম আলোকে বলেন, এটা ম্যাজিক বুলেট থিওরির মধ্যে পড়ে। অর্থাৎ গণমাধ্যমে বা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সহিংসতা প্রচার করলে সেটা প্রভাব ফেলবেই। তিনি বলেন, রেসলিং বা অন্যান্য খেলাতে কিন্তু সতর্কবাণী দেওয়া হয়। আবার অপরাধ প্রতিবেদনের ক্ষেত্রে বলা হয়, অপরাধের ঘটনা এমনভাবে বর্ণনা করা যাবে না, যেটি প্রভাব ফেলতে পারে। কারণ, সহিংসতার যেকোনো কিছু মানুষের মনে প্রভাব ফেলে, সেটা অবচেতন মনে হোক আর সচেতন মনে হোক।

















