বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ (ইউপি) নির্বাচন দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করার পরিকল্পনা করছে নির্বাচন কমিশন। এরপর ধাপে ধাপে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। এসব নির্বাচনে দলীয় প্রতীক ছাড়াই ভোটগ্রহণ করা হবে। জামায়াত নেতৃত্বাধীন ১১ দলীয় ঐক্যের শরিকরা জোটগত সমঝোতার পথ খোলা রেখে আপাতত এককভাবে নির্বাচনী প্রস্তুতি নিচ্ছে।
জামায়াতে ইসলামী ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে প্রায় ৯৫ শতাংশ প্রার্থী বাছাই সম্পন্ন করেছে। অন্যদিকে, জাতীয় নাগরিক পার্টি (এনসিপি) ৬৪টি উপজেলা পরিষদ ও ৩৪টি পৌরসভায় প্রাথমিকভাবে ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। এনসিপি জানিয়েছে, জোটগতভাবে নির্বাচন হবে নাকি এককভাবে, সেই সিদ্ধান্ত পরে নেওয়া হলেও রাজনৈতিক দল হিসেবে নির্বাচনী পরিস্থিতি বিবেচনায় তারা একক প্রস্তুতি নিচ্ছে। জামায়াত প্রার্থী বাছাইয়ে তৃণমূলের মতামত, ব্যক্তিগত জনপ্রিয়তা, সততা ও এলাকায় গ্রহণযোগ্যতাকে গুরুত্ব দিচ্ছে, তবে নির্বাচনী সমীকরণ বিবেচনায় প্রার্থী পরিবর্তনের সুযোগও রাখা হয়েছে।
প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) এএমএম নাসির উদ্দিন জানিয়েছেন, বছরের শেষ দিকে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের মধ্য দিয়ে স্থানীয় সরকার নির্বাচন শুরু করতে চায় ইসি। প্রথম পর্যায়ে সাড়ে চার হাজার ইউনিয়ন পরিষদের মধ্যে নির্বাচন উপযোগী পরিষদগুলোতে ভোট অনুষ্ঠিত হবে। এ লক্ষ্যে আগামী সেপ্টেম্বরে তফসিল ঘোষণা হতে পারে।
জামায়াতের কেন্দ্রীয় সূত্রমতে, উপজেলা চেয়ারম্যান ও ভাইস চেয়ারম্যান পদের প্রার্থিতা নিশ্চিত করবেন সংশ্লিষ্ট অঞ্চলের দায়িত্বে থাকা ব্যক্তিরা, এবং এ বিষয়ে কেন্দ্র থেকেও নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। জেলার সংগঠনগুলো চেয়ারম্যান ও মেম্বার প্রার্থী নির্বাচন করবে। যেসব এলাকায় স্থানীয় রাজনীতি ও প্রার্থী নির্বাচন নিয়ে দ্বিধা রয়েছে, সেখানে আরও পর্যবেক্ষণ করা হচ্ছে। জামায়াতের অঞ্চল-ভিত্তিক নেতৃত্বগুলো প্রার্থী বাছাইয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করছে। সারা দেশকে ১৪টি সাংগঠনিক অঞ্চলে ভাগ করে ১৪ জন নেতাকে অঞ্চল পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে।
স্থানীয় সরকার নির্বাচন নিয়ে এখনো কোনো দল চূড়ান্ত অবস্থান নেয়নি। তবে কেন্দ্রীয়ভাবে সমন্বিত নির্বাচন হবে, নাকি দলগুলো স্থানীয় বাস্তবতায় ভিন্ন কৌশল নেবে – এই প্রশ্নে ১১-দলীয় ঐক্যের শরিকদের অবস্থান ইতিমধ্যে স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণার পর তাদের অবস্থানের বাস্তব চিত্র পরিষ্কার হবে।
এদিকে, উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের প্রথম ধাপে এনসিপি ১০০ প্রার্থীর নাম ঘোষণা করেছে। ৫০০ উপজেলা ও ৩৩০ পৌরসভা থেকে এক হাজারের বেশি আবেদন পাওয়ার পর যাচাই-বাছাই করে এসব প্রার্থী চূড়ান্ত করা হয়েছে। প্রার্থী বাছাইয়ে গ্রহণযোগ্যতা, পরিশ্রমী হওয়া এবং দুর্নীতি, নিপীড়ন বা ফ্যাসিবাদী সরকারের সঙ্গে সংশ্লিষ্টতার অতীত না থাকার বিষয়টিকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। এনসিপি অন্য রাজনৈতিক দলের পরিচ্ছন্ন ও গ্রহণযোগ্য ব্যক্তিদেরও তাদের হয়ে প্রার্থী হওয়ার সুযোগ রেখেছে।
এনসিপি’র উত্তরাঞ্চলের মুখ্য সংগঠক সারজিস আলম জানিয়েছিলেন, প্রথম ধাপে প্রার্থী ঘোষণার পর দ্বিতীয় ধাপে আরও ১০০ প্রার্থীর নাম প্রকাশ করা হবে। পরবর্তী সময়েও দ্বিতীয় ধাপে প্রার্থী ঘোষণার পরিকল্পনা রয়েছে দলটির। অর্থাৎ, তফসিল ঘোষণার আগেই ধাপে ধাপে প্রার্থী ঘোষণা করে সম্ভাব্য প্রার্থীদের এলাকায় কাজ করার সুযোগ দিতে চায় এনসিপি। দলটি সিটি করপোরেশন নির্বাচনের জন্যও আগে থেকে প্রস্তুতি শুরু করেছে।
জামায়াতে ইসলামী সূত্র জানিয়েছে, সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে না পারা প্রার্থীরা স্থানীয় নির্বাচনে অগ্রাধিকার পাবেন। গত সংসদ নির্বাচনে ১২টি সিটি করপোরেশন এলাকার মধ্যে তিনটিতে জামায়াত এগিয়ে ছিল এবং ছয়টিতে বিএনপির বিপক্ষে শক্ত লড়াই করেছে। তবে চট্টগ্রাম ও কুমিল্লায় বড় ব্যবধানে হেরেছে এবং বরিশালে তাদের কোনো প্রার্থী ছিল না। জোটের কারণে যেসব নেতা সংসদ নির্বাচনে অংশ নিতে পারেননি, তারা স্থানীয় নির্বাচনে অগ্রাধিকার পাবেন বলে জানা গেছে।
অতীত নজির অনুযায়ী, ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে জামায়াত ৩৬ উপজেলায় চেয়ারম্যান, ১২৬ উপজেলায় ভাইস চেয়ারম্যান এবং ২৬ উপজেলায় নারী ভাইস চেয়ারম্যান পদে জয়লাভ করেছিল। এরপর তারা আর নির্বাচনে অংশ নেয়নি। দলটি নিবন্ধন হারালেও ২০২১ সালের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে ৭৯টি চেয়ারম্যান পদে জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা জয়ী হন। ২০১৯ সালে তারা চারটি পৌরসভায় বিজয়ী হয়েছিল।
এ বিষয়ে ১৬ আগস্ট ১১ দলের লিয়াজোঁ সমন্বয়ক ও জামায়াতে ইসলামীর সহকারী সেক্রেটারি জেনারেল ড. এএইচএম হামিদুর রহমান আযাদ মানবজমিনকে বলেন, ‘আমাদের প্রস্তুতি চলছে। তবে এগুলো শুধু নির্বাচনী প্রস্তুতি নয়। আমরা নিয়মিত যেসব কাজ করি, সেগুলোও আমাদের নির্বাচনী কাজের অংশ। মানুষের জন্য কাজ করা মানেই শুধু নির্বাচন নয়। আমরা মানুষের জন্য রাজনীতি করি, মানুষের কল্যাণে ও জনগণের জন্য কাজ করি।’
তিনি আরও বলেন, ‘সামনে স্থানীয় সরকার নির্বাচন হবে বলা হচ্ছে। তাই প্রার্থী মনোনয়ন, কমিটি গঠনসহ বিভিন্ন প্রস্তুতিমূলক কাজ শুরু হয়ে গেছে। এগুলো চলমান রয়েছে। নির্বাচনের তফসিল ঘোষণা হলে এসব কার্যক্রম আরও জোরদার হবে।’
এনসিপি’র নীতিনির্ধারণী ফোরাম পলিটিক্যাল কাউন্সিলের সদস্য ও মিডিয়া উপ-কমিটির প্রধান সারোয়ার তুষার মানবজমিনকে বলেন, ‘বিভিন্ন জায়গায় আমরা সাংগঠনিক সফর করছি। প্রার্থী ঘোষণা করা হচ্ছে স্থানীয় নির্বাচনের। এককভাবে স্থানীয় নির্বাচন করার বিষয়েই এখনো পর্যন্ত সিদ্ধান্ত বহাল আছে। এখানে জোট হওয়ার সম্ভাবনা খুবই কম।’

















