বছর ঘুরে আবারও এসেছে আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস, যা আড়াই শতাধিক পরিবারের কান্না আর হাহাকারের মধ্যে পালিত হচ্ছে। গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের হিসাব অনুযায়ী, এখনো ২৫১ জন নাগরিক নিখোঁজ রয়েছেন। কমিশন মনে করছে, এদের অনেকেরই ফিরে আসার সম্ভাবনা ক্ষীণ, তবে এই সংখ্যা আরও বেশি হতে পারে।
যাদের প্রিয়জনেরা কেবল নিখোঁজ সংখ্যায় পরিণত হয়েছেন, তাদের জীবন যে কেমন কাটছে, তা কেবল ভুক্তভোগীরাই জানেন। এই পরিবারগুলোর অপেক্ষার যেন শেষ নেই; তারা না পারছে শোক পালন করতে, না পারছে আশায় বুক বেঁধে সান্ত্বনা পেতে।
গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত শেখ হাসিনার সাড়ে ১৫ বছরের শাসনামলে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ, সমালোচক এবং ভিন্নমতাবলম্বীদের রাষ্ট্রীয় বাহিনীকে ব্যবহার করে তুলে নেওয়ার ঘটনা ঘটে, যা গুম ও আতঙ্কের জন্ম দেয়। তাদের কারো কারো লাশ পাওয়া গেলেও অনেকেরই সন্ধান মেলেনি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টে শেখ হাসিনার সরকারের পতনের পর দেশে এটি তৃতীয়বারের মতো দিবসটি পালিত হচ্ছে। ২০১০ সালের ডিসেম্বরে ‘ইন্টারন্যাশনাল কনভেনশন ফর প্রোটেকশন অব অল পারসনস অ্যাগেইনস্ট এনফোর্সড ডিসঅ্যাপিয়ারেন্স’ সম্মেলনে ৩০ আগস্টকে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে আন্তর্জাতিক দিবস হিসেবে ঘোষণা করা হয়।
বাংলাদেশে দীর্ঘ সময় ধরে গুম এবং এর ভয়াবহ অমানবিক পরিণতির মুখোমুখি হতে হয়েছে। ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বাধীন অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ে ২০২৪ সালের ২৯ আগস্ট বাংলাদেশ আন্তর্জাতিক গুমবিরোধী কনভেনশনে যোগ দেয়, যা গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকারে রাষ্ট্রের একটি গুরুত্বপূর্ণ আন্তর্জাতিক অঙ্গীকার। এর দুদিন আগে, ২৭ আগস্ট, অন্তর্বর্তী সরকার আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে গুমের ঘটনা তদন্তে কমিশন গঠন করে।
আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে দেওয়া বাণীতে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান গুমকে বিশ্বের নিকৃষ্টতম অপরাধগুলোর মধ্যে সবচেয়ে ভয়ংকর এবং মানবাধিকারের চরমতম লঙ্ঘন হিসেবে বর্ণনা করেছেন। সরকার বাংলাদেশে গুমের প্রতিটি ঘটনা তদন্ত করে বিচার কার্যক্রম শুরু করেছে। দিবসটি উপলক্ষে বিভিন্ন রাজনৈতিক দল, মানবাধিকার ও সামাজিক সংগঠন পৃথক পৃথক কর্মসূচি গ্রহণ করেছে।
হাসিনার ফ্যাসিবাদী শাসনামলে ২০১০ সাল থেকে রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ এবং বিরোধী মতের মানুষকে লক্ষ্যবস্তু করে গুম করার প্রবণতা শুরু হয়। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচনের আগে ব্যাপকভাবে গুমের ঘটনা ঘটে। তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার এই ঘটনাগুলো অস্বীকার করত এবং ভুক্তভোগীদের ‘পাওনাদারের ভয়ে পালিয়েছেন’ বা ‘আত্মগোপনে আছেন’ বলে তাচ্ছিল্য করত।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের মতে, আওয়ামী লীগের আমলে গুম হওয়া ব্যক্তিদের সম্ভাব্য চার ধরনের পরিণতি ভোগ করতে হয়েছিল। প্রথমত, ভুক্তভোগীকে তুলে নিয়ে হত্যা এবং লাশ গুম করে দেওয়া। দ্বিতীয়ত, অন্যদের সন্ত্রাসবিরোধী আইনের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো। তৃতীয়ত, সীমান্ত দিয়ে ভারতে পাঠিয়ে সে দেশের আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী দিয়ে গ্রেপ্তার করানো। চতুর্থত, অল্পসংখ্যক মামলা দিয়ে গ্রেপ্তার দেখানো। শেখ হাসিনার পতন ও পলায়নের পর গোপন বন্দিশালাগুলো থেকে অনেকেই মুক্তি পেয়েছেন এবং সেগুলো ড. ইউনূস ও ট্রাইব্যুনালের বিচারক-প্রসিকিউটররা পরিদর্শন করেছেন। তাই যারা এখনো ফেরেননি, তাদের বড় অংশই হত্যার শিকার হয়েছেন বলে নিশ্চিত হওয়া গেছে।
গুমকে ‘মৃত্যুর চেয়ে ভয়াবহ’ মানবতাবিরোধী ঘটনা হিসেবে বর্ণনা করেছেন গুমসংক্রান্ত অনুসন্ধান কমিশনের সাবেক চেয়ারম্যান ও হাইকোর্টের সাবেক বিচারপতি মঈনুল ইসলাম চৌধুরী। তিনি বলেন, মৃত্যুর ক্ষেত্রে পরিবার শোক প্রকাশ করতে পারলেও গুমের শিকার হলে পরিবার জানতেই পারে না সে কোথায় আছে। গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবার দীর্ঘ সময় অনিশ্চয়তার মধ্যে সামাজিক কলঙ্ক, আর্থিক সংকট ও একঘরে হয়ে পড়ার মতো পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়।
তিনি আরো বলেন, আগের সরকারের আমলে গুম ব্যাপক আকার ধারণ করেছিল এবং রাষ্ট্রীয় নিপীড়নের কেন্দ্রে ছিল গুম। শেষ পর্যন্ত চব্বিশের জুলাই আন্দোলনের মধ্য দিয়ে এর অবসান ঘটে। রাষ্ট্রযন্ত্র প্রায়ই ভুক্তভোগীদের অপরাধী হিসেবে উপস্থাপন করত, যাতে এসব কর্মকাণ্ডকে ন্যায্যতা দেওয়া যায়। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উচ্চপর্যায়ের নির্দেশে ‘মানবিকতা থেকে বিচ্ছিন্ন ও দানবায়িত’ করা হয়েছিল।
গুমের ঘটনায় হাসিনা ও তার সহযোগীদের বিচারের দাবিতে বিভিন্ন মহল থেকে জোরালো দাবি অব্যাহত রয়েছে। দিবসটি উপলক্ষে গুম হওয়া ব্যক্তিদের স্বজন ও বিভিন্ন মানবাধিকার সংগঠন নিখোঁজ ব্যক্তিদের পরিবারের কাছে ফিরিয়ে দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। গুমের সঙ্গে জড়িতদের বিচার সীমিত আকারে শুরু হলেও তার গতি খুবই ধীর। মানবতাবিরোধী অপরাধের বিচারে গঠিত ট্রাইব্যুনালে গুম সংক্রান্ত তিনটি মামলা রুজু হয়েছে, কিন্তু মামলার চাপ বেশি থাকায় শুনানির তারিখ দীর্ঘ বিরতিতে পড়ায় কাঙ্ক্ষিত অগ্রগতি হচ্ছে না। ফলে ভুক্তভোগী পরিবারগুলো ক্ষোভ প্রকাশ করে দ্রুত বিচার ও দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছে।
গুমের বিচারে স্থায়ী আইন নিয়েও বিতর্ক চলছে। অন্তর্বর্তী সরকার গুমের বিচারে আইন করে অধ্যাদেশ জারি করেছিল, যা বর্তমান সরকার সংসদে অনুমোদন করেনি। সরকার নিজেদের মতো করে একটি আইন গত বৃহস্পতিবার সংসদে উত্থাপন করেছে। মানবাধিকার ও গুমসংক্রান্ত দুই বিলে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ তদন্তের ক্ষমতা সংশ্লিষ্ট বাহিনীকে দেওয়ার বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছেন মানবাধিকারকর্মী, আইনজীবী ও সাবেক গুম কমিশনের সদস্যরা। তাদের দাবি, স্বাধীন তদন্তের সুযোগ নিশ্চিত না করে বিল দুটি পাস করা হলে গুমের ঘটনায় বিচার ও জবাবদিহির পথ আরো কঠিন হবে। গুম সংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের সদস্য নাবিলা ইদ্রিস বলেছেন, সংসদে উত্থাপিত আইনে গুমের ঘটনায় স্বাধীনভাবে তদন্তের ক্ষমতা খর্ব করা হয়েছে, যা মামলাগুলোকে সংকটময় অবস্থায় ফেলবে।
মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’ সংসদে উত্থাপিত গুমসংক্রান্ত আইনে অভিযোগ তদন্ত করার ক্ষমতা আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর হাতে না দিয়ে স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর দেওয়ার দাবি জানিয়েছে। সংগঠনটি গুমের শিকার যেসব ব্যক্তি এখনো ফিরে আসেনি, তাদের স্ত্রী-সন্তানরা যাতে গুম হওয়া ব্যক্তির ব্যাংক হিসাব পরিচালনাসহ স্থাবর ও অস্থাবর সম্পত্তি হস্তান্তর করতে পারেন, সে ব্যবস্থা করারও দাবি করেছে। একই সঙ্গে, গুমের পর ফেরত আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে দায়ের করা মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানিয়েছে।
সুপ্রিম কোর্ট বারের সভাপতি ও নোয়াখালী-১ আসনের বিএনপিদলীয় সংসদ সদস্য এএম মাহবুব উদ্দিন খোকন প্রস্তাবিত গুমসংক্রান্ত আইনে অভিযোগ প্রমাণ করতে না পারলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছরের জেলের বিধান রাখার সমালোচনা করে বলেন, ইলিয়াস আলীর স্ত্রী যদি কোনো পক্ষের বিরুদ্ধে অভিযোগ করে তা মিথ্যা প্রমাণিত হয়, তবে তাকে জেলে যেতে হবে? প্রমাণ করার সুযোগ কতটুকু আছে? পুলিশ যা প্রমাণ করতে পারে না, তা একজন সাধারণ নাগরিকের পক্ষে সম্ভব নয়। তিনি এ ধরনের বিধানকে অযৌক্তিক বলে মনে করেন।
২০১২ সালের ১৭ এপ্রিল ঢাকার বনানী থেকে গাড়িচালক আনসার আলীসহ বিএনপির তৎকালীন সাংগঠনিক সম্পাদক ইলিয়াস আলীকে গুম করা হয়। তদন্তে মেজর জেনারেল (বরখাস্ত) জিয়াউল আহসানকে এই গুমের হোতা হিসেবে উঠে এসেছে। ইলিয়াস আলীর স্ত্রী সংসদ সদস্য তাহসিনা রুশদীর (লুনা) এখনো তার স্বামীর ভাগ্যে কী ঘটেছে, তা জানতে পারেননি। তিনি বলেন, গুমসংক্রান্ত কমিশন অনুসন্ধান করেছে, ট্রাইব্যুনালেও তদন্ত হয়েছে। জানা যাচ্ছে, তার অপহরণে র্যাব জড়িত ছিল এবং র্যাবের তৎকালীন সদস্যরা প্রভাবশালী ছিলেন। তিনি এ ঘটনার সুষ্ঠু বিচার ও প্রকৃত ঘটনা জানতে চান।
এক যুগেরও বেশি সময় আগে ২০১৩ সালের ২৭ নভেম্বর গুম হন লাকসাম উপজেলা বিএনপির সভাপতি ও সাবেক সংসদ সদস্য সাইফুল ইসলাম (হিরু) এবং লাকসাম পৌর বিএনপির সভাপতি হুমায়ুন কবির (পারভেজ)। তাদের পরিবার জানে না তাদের ভাগ্যে কী ঘটেছে। তারা এখনো প্রতীক্ষায় রয়েছেন, যদি তাদের সন্ধান মেলে। অন্ততপক্ষে তারা বেঁচে নেই, এটা নিশ্চিত হতে পারলেও সেভাবে দোয়া করে মাগফিরাত কামনা করতে চান দুই নেতার পরিবারের সদস্যরা।
দীর্ঘ ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মোকাদ্দাস। পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়, যা পুলিশ অস্বীকার করে। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবার ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। চব্বিশের বিপ্লবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর কেটে গেছে আরো দুই বছর, কিন্তু আজও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। এখনো তাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।
মোকাদ্দাসের ছোটভাই মুকাররম জারির বলেন, চব্বিশের ৫ আগস্টের বিপ্লবের পর আব্দুল্লাহিল আমান আল-আযমী ও ব্যারিস্টার আরমান ফিরে আসার পর আমরাও আশা করেছিলাম, আমার ভাই ফিরে আসবেন। কিন্তু সে আশা আজও পূরণ হয়নি। তিনি জানান, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ও গুম কমিশনে অভিযোগ দেওয়ার পরও দুই বছর কেটে গেলেও তার কোনো সন্ধান পাওয়া যায়নি। তার ফেরার অপেক্ষায় এখনো তার বাবা-মা জায়নামাজে বসে চোখের পানি ফেলেন।
নিখোঁজ ইবি শিক্ষার্থী ওয়ালিউল্লাহ ও মোকাদ্দাসের পরিবারের আইনজীবী আসাদুল্লাহ জানান, গুম কমিশনে আবেদন করার পর তাদের ডেকে বক্তব্য নেওয়া হয় এবং আইজিপিকে থানায় মামলা নেওয়ার জন্য বলে দেওয়ার আশ্বাস দেওয়া হয়। সে অনুযায়ী আশুলিয়া থানায় এফআইআর নিয়ে তদন্তের জন্য উত্তরা থানায় পাঠানো হয়। তারা বক্তব্য শুনে স্পটে ভিজিট করে ট্রাইব্যুনালের ইনভেস্টিগেশন টিমকে জানানোর আশ্বাস দিলেও দেড়-দুই মাস আগে কথা হলেও পুলিশ আজ পর্যন্ত কোনো ভিজিট করেনি।
নিখোঁজ ব্যক্তিদের ফেরাতে গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশন চার ধরনের উদ্যোগের কথা জানিয়েছিল: ১. পুলিশকে নিখোঁজ ব্যক্তিদের তালিকা দিয়ে তাদের খুঁজে বের করতে বলা হয়েছে। ২. কমিশন সুনির্দিষ্ট তথ্যের ভিত্তিতে নিখোঁজ ব্যক্তিদের খুঁজতে বিভিন্ন জায়গায় গিয়েছে। ৩. ভারতের কারাগারে বাংলাদেশি বন্দিদের তালিকার সঙ্গে নিখোঁজ তালিকা মেলানোর চেষ্টা করেছে। ৪. সীমান্ত দিয়ে পার্শ্ববর্তী দেশ থেকে যাদের ‘পুশইন’ করা হচ্ছে, সেখানে নিখোঁজ কেউ আছে কি না, তা পর্যবেক্ষণ করেছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের সময় গুম হওয়া অনেকের পরিবার তখন কোনো মামলা করতে পারেনি। গণঅভ্যুত্থানের পর ১৬০টি ঘটনার তালিকা পুলিশের কাছে তদন্তের জন্য পাঠিয়েছে গুম কমিশন। পুলিশ সদর দপ্তর সেগুলোর বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট থানায় পাঠানোর কথা জানালেও এসব অভিযোগের তদন্তে অগ্রগতি নেই বললেই চলে।
ভারতের কারাগারে নিখোঁজ ব্যক্তিদের সম্পর্কে কমিশন সূত্র জানিয়েছে, ৯৯৬ জনের একটি তালিকা তারা পেয়েছে, যেখানে নিখোঁজ ব্যক্তিদের কারো নাম নেই। আরো তালিকার অপেক্ষায় ছিল তদন্ত কমিশন।
গুমসংক্রান্ত তদন্ত কমিশনের কাছে ১৮৫০টি অভিযোগ জমা হয়েছিল। দ্বৈত অভিযোগ বাদ দিয়ে ১৫৬৯টির বেশি অভিযোগ আমলে নেয় কমিশন। তদন্ত করতে গিয়ে নতুন অনেক ঘটনাও তাদের সামনে আসে। অভিযোগগুলো নিয়ে তদন্ত শেষ করে চলতি বছরের ১৩ জানুয়ারি চূড়ান্ত প্রতিবেদন দাখিল করে কমিশন।
প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশে গুম কোনো বিচ্ছিন্ন বা ব্যতিক্রমী ঘটনা নয়; বরং নির্দিষ্ট সময়পর্বে রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সম্পৃক্ততায় পরিচালিত একটি কাঠামোগত অপরাধ। চূড়ান্ত প্রতিবেদনের সারসংক্ষেপে বলা হয়, রাজনৈতিক দমন, ভিন্নমত দমন এবং তথাকথিত সন্ত্রাসবিরোধী অভিযানের আড়ালে গুমকে নিয়মিত পদ্ধতিতে ব্যবহার করা হয়। এসব ঘটনায় আটক বা গ্রেপ্তারের কোনো আইনগত রেকর্ড রাখা হয়নি এবং ভুক্তভোগীদের পরিবারের কাছে তথ্য গোপন করা হয়েছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গুমের ঘটনাগুলো নির্দিষ্ট রাজনৈতিক সময়পর্বে—বিশেষ করে নির্বাচন, সরকারবিরোধী আন্দোলন ও ছাত্র সক্রিয়তার সময় বেশি সংঘটিত হয়েছে। কমিশন এসব ঘটনাকে প্যাটার্ন বেজড এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স হিসেবে চিহ্নিত করেছে।
এতে বলা হয়, নিরাপত্তা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগ কার্যকরভাবে তদন্ত না হওয়ায় একটি দায়মুক্তির সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। ভুক্তভোগীদের পরিবারকে ভয়ভীতি দেখানো, মামলা গ্রহণে অনীহা এবং স্বাধীন তদন্ত ব্যবস্থার অভাব বিচারহীনতাকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিয়েছে।
কমিশনের পর্যবেক্ষণে উঠে এসেছে, গুমের ফলে শুধু ব্যক্তি নয়, পরিবার ও সমাজে দীর্ঘমেয়াদি মানসিক, সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি হয়েছে। বহু পরিবার বছরের পর বছর অনিশ্চয়তার মধ্যে বসবাস করছে এবং রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা হারিয়েছে।
গুম বন্ধ ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে কমিশন সুপারিশ করেছে। এর মধ্যে রয়েছে—গুমকে স্বতন্ত্র অপরাধ হিসেবে আইনে অন্তর্ভুক্ত করা; জাতিসংঘের এনফোর্সড ডিজঅ্যাপিয়ারেন্স কনভেনশন জাতিসংঘের অনুসমর্থন; স্বাধীন ও শক্তিশালী তদন্ত ব্যবস্থা গঠন; দায়ীদের বিচার নিশ্চিত করা; ভুক্তভোগী পরিবারকে ক্ষতিপূরণ ও পুনর্বাসন।
আওয়ামী লীগের দেড় দশকের দুঃশাসনের সময় জোরপূর্বক গুম, নির্যাতন ও হত্যা সংক্রান্ত তিনটি মামলার বিচার চলছে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে। এর মধ্যে র্যাবের গোপন বন্দিশালা আয়নাঘরে গুমের দুটি মামলায় ২৩ সেনা কর্মকর্তার বিচার শুরু হয়েছে চলতি বছরের জানুয়ারিতে।
এ মামলায় মোট ১৩ আসামির মধ্যে প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা মহাপরিদপ্তরের (ডিজিএফআই) সাবেক তিনজন পরিচালক গ্রেপ্তার রয়েছেন। এছাড়া ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) তারিক আহমেদ সিদ্দিক, ডিজিএফআইয়ের সাবেক পাঁচজন মহাপরিচালক এবং ডিজিএফআইয়ের সাবেক পরিচালকসহ কয়েকজন কর্মকর্তা পলাতক রয়েছেন।
অন্যদিকে র্যাবের টাস্কফোর্স ফর ইন্টারোগেশন সেলে (টিএফআই সেল) বা আয়নাঘরে গুম ও নির্যাতনের মামলায় সাবেক-বর্তমান ১২ সেনা কর্মকর্তাসহ ১৭ আসামির বিরুদ্ধে করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলার বিচার শুরু হয় এ বছরের ২১ জানুয়ারি। এই মামলায় ঢাকা-১৪ আসনের বর্তমান সংসদ সদস্য মীর আহমেদ বিন কাশেম আরমান প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দেন। এই মামলার আসামিদের মধ্যে রয়েছেন—ফ্যাসিস্ট হাসিনা ও তার নিরাপত্তা উপদেষ্টা তারিক সিদ্দিক ও পুলিশের সাবেক বিতর্কিত আইজিপি বেনজীর আহমেদ। ১০ জন সেনা কর্মকর্তা গ্রেপ্তার রয়েছেন এবং সাতজন পলাতক।
এদিকে শতাধিক মানুষকে গুম-খুন ও নির্যাতনের মামলায় বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানের বিরুদ্ধে বিচার শুরু হয়েছে এ বছরের ৮ ফেব্রুয়ারি। তার বিরুদ্ধে প্রথম সাক্ষী হিসেবে জবানবন্দি দিয়েছেন সাবেক সেনাপ্রধান জেনারেল ইকবাল করিম ভূঁইয়া। এই পর্যন্ত ৯ জন সাক্ষীর জবানবন্দি নেওয়া হয়েছে। পরে এই মামলায় বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা ইলিয়াস আলী গুমের ঘটনায় জড়িত থাকার প্রাথমিক সত্যতা পাওয়ায় উইং কমান্ডার সাইফুর রহমানকে গত ২৩ আগস্ট গ্রেপ্তার দেখায় ট্রাইব্যুনাল।
এছাড়া গুমসংক্রান্ত বেশ কয়েকটি মামলার তদন্ত চলমান। এর মধ্যে আওয়ামী শাসনামলে বর্তমান স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদকে গুমের ঘটনায় করা মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় ফ্যাসিস্ট হাসিনাসহ সাতজনকে আসামি করা হয়েছে। মামলাটি এখনো তদন্তের পর্যায়ে রয়েছে। বরখাস্ত মেজর জেনারেল জিয়াউল আহসানকে এই মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়েছে। অপর আসামিরা হলেন—সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল, পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) বেনজীর আহমেদ, সাবেক আইজিপি একেএম শহীদুল হক, ডিএমপির সাবেক কমিশনার আসাদুজ্জামান মিয়া ও কাউন্টার টেররিজম অ্যান্ড ট্রান্সন্যাশনাল ক্রাইম (সিটিটিসি) ইউনিটের সাবেক প্রধান মনিরুল ইসলাম।
গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের প্ল্যাটফর্ম ‘মায়ের ডাক’-এর পক্ষ থেকে আওয়ামী আমলে ২৫০ জনকে গুমের অভিযোগ দাখিল করা হয়েছে ট্রাইব্যুনালে। এই অভিযোগের তদন্তও চলমান।
প্রকাশ : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ২৬আপডেট : ৩০ আগস্ট ২০২৬, ০৮: ৩৮
দীর্ঘ ১৪ বছর আগে ২০১২ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকা থেকে কুষ্টিয়াগামী হানিফ এন্টারপ্রাইজের (৩৭৫০ নম্বর) গাড়িতে করে ক্যাম্পাসে ফিরছিলেন ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী ও ছাত্রশিবির নেতা ওয়ালিউল্লাহ ও আল-মোকাদ্দাস। পথে আশুলিয়ার নবীনগর থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী পরিচয়ে তাদের গ্রেপ্তার করা হয়। তবে তাদের গ্রেপ্তারের বিষয়টি অস্বীকার করে পুলিশ। ছাত্রশিবিরের রাজনীতির সঙ্গে জড়িত থাকায় তাদের গুম করা হয়েছে বলে দাবি পরিবার ও শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের। চব্বিশের বিপ্লবে আওয়ামী ফ্যাসিবাদের পতনের পর কেটে গেছে আরো দুই বছর। কিন্তু আজও তাদের কোনো সন্ধান মেলেনি। এখনো তাদের ফেরার অপেক্ষায় রয়েছে পরিবার।

















