বিশ্বের বৃহত্তম ম্যানগ্রোভ বন সুন্দরবন তার সুন্দরী গাছের জন্য বিশ্বজুড়ে সমাদৃত। বর্তমানে বনের সামগ্রিক প্রতিবেশব্যবস্থা নিয়ে ২০২৪-২৫ সালে পরিচালিত এক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। ‘ইকোলজিক্যাল মনিটরিং অব সুন্দরবন’ শীর্ষক এই গবেষণাটি যৌথভাবে পরিচালনা করেছে সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) ও আরণ্যক ফাউন্ডেশন। গত ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার বন ভবনে আয়োজিত এক কর্মশালায় এর ফলাফল প্রকাশ করা হয়, যা ১০ অক্টোবর প্রকাশিত প্রতিবেদনেও স্থান পেয়েছে।
গবেষণার তথ্য অনুযায়ী, সুন্দরবনে বর্তমানে প্রায় ৩৩ কোটি সুন্দরী গাছ রয়েছে। এর মধ্যে প্রায় ৩৯ শতাংশ বা প্রায় ১২ কোটি ৯৫ লাখ গাছ আগামরা বা ‘টপ-ডাইং’ রোগে আক্রান্ত। আক্রান্ত গাছগুলোর মধ্যে ২ কোটি ২ লাখ ৪০ হাজার গাছ গুরুতরভাবে ক্ষতিগ্রস্ত অবস্থায় রয়েছে। আগামরা রোগে আক্রান্ত গাছের প্রথমে পাতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়, এরপর ডালপালা ও শাখা-প্রশাখা শুকিয়ে যায় এবং শেষপর্যায়ে গাছের মূল কাণ্ড আক্রান্ত হয়ে গাছটি মারা যেতে পারে।
বিশেষজ্ঞদের মতে, এই সংকটের পেছনে বেশ কিছু পরিবেশগত কারণ দায়ী। এর মধ্যে মাটির লবণাক্ততা বৃদ্ধি, মিঠাপানির প্রবাহ কমে যাওয়া, পলি জমার পরিবর্তন, জোয়ার-ভাটার ধরনে পরিবর্তন এবং জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব উল্লেখযোগ্য। গবেষণায় দেখা গেছে, উচ্চ ও মাঝারি লবণাক্ততাপ্রবণ এলাকায় সুন্দরী গাছ আক্রান্ত হওয়ার হার বেশি। গবেষক অধ্যাপক স্বপন সরকার জানান, ১৯৮৬ সাল থেকে সুন্দরবনের ১২০টি স্থায়ী জরিপ প্লটের গাছের পরিবর্তন পর্যবেক্ষণ করে এই সংখ্যা নিরূপণ করা হয়েছে। যদিও আগামরা রোগের সামগ্রিক প্রকোপ আগের তুলনায় কিছুটা কমেছে, তবে গুরুতরভাবে আক্রান্ত গাছের সংখ্যা বৃদ্ধি পাওয়ায় উদ্বেগ বাড়ছে।
সুন্দরী গাছের এই সংকট কেবল পুরোনো গাছের ক্ষতির মধ্যেই সীমাবদ্ধ নেই, বরং প্রাকৃতিকভাবে নতুন চারা জন্মানোর হারও কমে যাচ্ছে। গবেষণায় সুন্দরবনের কার্বন শোষণের সক্ষমতা ১৫ শতাংশ হ্রাস পাওয়ার তথ্যও পাওয়া গেছে, যা জলবায়ু পরিবর্তন মোকাবিলায় বনের ভূমিকাকে প্রশ্নবিদ্ধ করছে। সুন্দরী গাছের সংখ্যা ও বিস্তারে পরিবর্তন ঘটলে বনের সামগ্রিক বৃক্ষবিন্যাস, বন্য প্রাণীর আবাসস্থল এবং প্রতিবেশব্যবস্থায় দীর্ঘমেয়াদি বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। অনেক এলাকায় সুন্দরীর পরিবর্তে অন্য প্রজাতির গাছের প্রাকৃতিক পুনর্জন্মের প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে। বন রক্ষায় নিয়মিত দীর্ঘমেয়াদি গবেষণা, রোগাক্রান্ত গাছের অবস্থা পর্যবেক্ষণ এবং লবণাক্ততা ও মিঠাপানির প্রবাহের পরিবর্তন বিশ্লেষণ জরুরি বলে মনে করছেন বিশেষজ্ঞরা।

















