কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের শিক্ষার্থী সোহাগী জাহান তনু হত্যা মামলায় জামিনে মুক্ত সাবেক সেনাসদস্য হাফিজুর রহমান আপিল বিভাগের নির্দেশ সত্ত্বেও আত্মসমর্পণ করেননি। শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টা পর্যন্ত নির্ধারিত সময়ের মধ্যে তাকে কুমিল্লার আদালতে হাজির হতে দেখা যায়নি। এর আগে, হাইকোর্ট থেকে পাওয়া তার ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন স্থগিত করে বৃহস্পতিবার ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছিলেন আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত।
চেম্বার বিচারপতি মো. রেজাউল হক রাষ্ট্রপক্ষের আবেদনের শুনানি নিয়ে এই আদেশ দেন। একই সঙ্গে, নির্ধারিত সময়ের মধ্যে আত্মসমর্পণ না করলে তাকে গ্রেপ্তারের নির্দেশও দেওয়া হয়। অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল জানান, পরবর্তী আদেশের জন্য আগামী রোববার দিন ধার্য করা হয়েছে।
গত ২ আগস্ট হাইকোর্ট থেকে ছয় মাসের অন্তর্বর্তীকালীন জামিন পেয়েছিলেন হাফিজুর রহমান। এরপর ৪ আগস্ট সন্ধ্যা সাতটায় কুমিল্লা কেন্দ্রীয় কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। হাইকোর্টের দেওয়া এই জামিন স্থগিত চেয়ে বৃহস্পতিবার আপিল বিভাগের চেম্বার আদালতে রাষ্ট্রপক্ষ আবেদন করে। ওই দিন সন্ধ্যা ছয়টার দিকে চেম্বার আদালতের বিশেষ অনুমতি নিয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মো. রুহুল কুদ্দুস কাজল আবেদনটি উপস্থাপন করেন।
মামলার তদন্ত কর্মকর্তা পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশনের (পিবিআই) পরিদর্শক মো. তারিকুল ইসলাম বলেন, “আমি আদালতের মাধ্যমে জেনেছি, আপিল বিভাগের চেম্বার আদালত হাফিজুর রহমানের জামিন স্থগিত করে ২৪ ঘণ্টার মধ্যে আত্মসমর্পণের নির্দেশ দিয়েছেন। তবে এ-সংক্রান্ত আদেশের কোনো কপি এখনো হাতে পাইনি। তিনি আদালতে আত্মসমর্পণ করেছেন—এমন কোনো তথ্যও আমার কাছে নেই।” আদালত সূত্রও নিশ্চিত করেছে যে, শুক্রবার সন্ধ্যা ছয়টার মধ্যে হাফিজুর রহমান কুমিল্লার আদালতে হাজির হননি।
চলতি বছরের ২১ এপ্রিল ঢাকার কেরানীগঞ্জের বাসা থেকে পিবিআই হাফিজুর রহমানকে গ্রেপ্তার করেছিল। পরদিন তার ডিএনএ নমুনা সংগ্রহের পর আদালতে হাজির করা হলে তিন দিনের রিমান্ড মঞ্জুর হয়। জিজ্ঞাসাবাদ শেষে গত ২৫ এপ্রিল তাঁকে কারাগারে পাঠানো হয়। তনু হত্যাকাণ্ডের সময় তিনি কুমিল্লা সেনানিবাসে কর্মরত ছিলেন।
উল্লেখ্য, ২০১৬ সালের ২০ মার্চ রাতে কুমিল্লা সেনানিবাসের পাওয়ার হাউস এলাকার কালা ট্যাঙ্কি-সংলগ্ন কালভার্টের পাশের পশ্চিম দিকের ঝোঁপে কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজের ইতিহাস বিভাগের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী সোহাগী জাহান তনুর মরদেহ পাওয়া যায়। তনু ও তার পরিবার সেনানিবাসের স্টাফ কোয়ার্টার এলাকায় বসবাস করতেন। ঘটনার দিন তিনি টিউশনি করার জন্য ১২ ইঞ্জিনিয়ার স্টাফ কোয়ার্টারে সার্জেন্ট জাহিদুজ্জামানের বাসায় গিয়েছিলেন। রাত দশটার দিকেও তিনি ফিরে না আসায় খোঁজাখুঁজি শুরু হয়। রাত আনুমানিক সাড়ে এগারোটার দিকে সোহাগী জাহান তনুকে উদ্ধার করা হয় এবং কুমিল্লা সিএমএইচ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনার পর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়। একদিন পর তনুর বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতোয়ালি মডেল থানায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে হত্যা মামলা দায়ের করেন। সে সময় ঘটনাস্থল থেকে এগারো ধরনের আলামত জব্দ করা হয়, যা ফরেনসিক পরীক্ষার জন্য অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)-এর ফরেনসিক ডিএনএ ল্যাবরেটরি অব বাংলাদেশ পুলিশে পাঠানো হয়েছিল। প্রায় দশ বছর পর এসব পরীক্ষার ছয় পৃষ্ঠার পূর্ণাঙ্গ প্রতিবেদন কুমিল্লার জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম ১ নম্বর আমলি আদালতের বিজ্ঞ বিচারক মুমিনুল হকের আদালতে দাখিল করেন মামলার বর্তমান তদন্ত কর্মকর্তা পিবিআইয়ের পরিদর্শক (তদন্ত) মো. তরীকুল ইসলাম। এরপর থেকে মামলাটিতে নতুন গতি আসে।

















