প্রকাশ : ২৫ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০: ৫৭
বর্তমান আধুনিক নাগরিক জীবনে গতি ও যাতায়াত অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কর্মক্ষেত্র, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা পারিবারিক প্রয়োজনে নারীদের ঘরের বাইরে যাওয়ার প্রয়োজনীয়তা প্রতিনিয়ত বাড়ছে। এই বাস্তবতার নিরিখে ‘নারী চালক’ বা নারীদের গাড়ি চালানোর বিষয়টি বর্তমান সমাজে অত্যন্ত আলোচিত। সাধারণ ধর্মপ্রাণ মানুষের মনে প্রায়ই প্রশ্ন জাগে, ইসলামের দৃষ্টিতে নারীদের গাড়ি চালানো কি আদৌ বৈধ, নাকি নিষিদ্ধ?
ইসলাম একটি স্বভাবজাত, প্রগতিশীল ও বাস্তবসম্মত জীবনব্যবস্থা। ইসলামি ফিকহ বা আইনশাস্ত্রের মৌলিক নীতি অনুযায়ী, ইবাদত ছাড়া পার্থিব সব বিষয়ের মূল বিধানই হলো বৈধতা, যতক্ষণ না তা নিষিদ্ধ হওয়ার ব্যাপারে কোরআন বা সুন্নাহর কোনো সুস্পষ্ট দলিল পাওয়া যায়। পবিত্র ধর্মগ্রন্থের কোথাও নারীদের বাহন চালাতে নিষেধ করা হয়নি। তাই আধুনিক যুগে গাড়ি চালানোকে যাতায়াতের একটি বৈধ মাধ্যম হিসেবেই বিবেচনা করে ইসলাম।
ইতিহাসে রাসুলুল্লাহ (সা.)-এর যুগেও নারীদের স্বাধীনভাবে বাহন ব্যবহারের দৃষ্টান্ত পাওয়া যায়। সে সময় উট, ঘোড়া বা গাধা ছিল যাতায়াতের প্রধান মাধ্যম। বুখারি ও মুসলিমের একটি হাদিসে রাসুল (সা.) কুরাইশ বংশীয় নারীদের প্রশংসা করে বলেছেন, ‘উটের পিঠে আরোহণকারী নারীদের মধ্যে কুরাইশ নারীরাই শ্রেষ্ঠ; কারণ তারা সন্তানদের প্রতি সর্বাধিক স্নেহশীলা এবং স্বামীর সম্পদের রক্ষাকারিণী।’ এই হাদিস প্রমাণ করে যে, তৎকালীন আরবে নারীদের বাহন চালানো সামাজিক ও ধর্মীয়ভাবে স্বীকৃত ছিল। আধুনিক যুগের পিচঢালা পথে গাড়ি চালানো আর চৌদ্দ শ বছর আগের উটের লাগাম ধরার মধ্যে মূল উদ্দেশ্যগত কোনো পার্থক্য নেই।
বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীদের গাড়ি চালানো শুধু শৌখিনতা নয়, বরং ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও জরুরি প্রয়োজনে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। শরিয়তের অন্যতম উদ্দেশ্য হলো মানুষের জীবন রক্ষা করা এবং কষ্ট লাঘব করা। পরিবারের কেউ অসুস্থ হলে একজন নারী নিজে গাড়ি চালিয়ে হাসপাতালে নিতে পারলে তা জীবন রক্ষায় ভূমিকা রাখে। এছাড়া গণপরিবহনে হয়রানি এড়াতে কিংবা গায়রে মাহরাম পুরুষের সঙ্গে দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়ার ঝুঁকি কমাতে একজন পর্দানশিন নারীর নিজের গাড়ি চালানো অনেক বেশি নিরাপদ ও সম্মানজনক।
অনেক সময় আঞ্চলিক সংস্কৃতি ও প্রথাকে ভুলবশত ধর্মীয় বিধান হিসেবে চালিয়ে দেওয়ার প্রবণতা দেখা যায়। যেমন, সৌদি আরবে নারীদের গাড়ি চালানোর ওপর দীর্ঘদিনের আইনি নিষেধাজ্ঞাকে অনেকে ইসলামের বিধান মনে করতেন, যা আসলে ছিল প্রশাসনিক সিদ্ধান্ত। ২০১৮ সালে সেই নিষেধাজ্ঞা তুলে নেওয়ার পর বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় স্কলাররা একে স্বাগত জানান। এটি প্রমাণ করে যে, ইসলাম নারীকে তার ন্যায্য ও যৌক্তিক অধিকার থেকে বঞ্চিত করে না।
অবশ্যই ইসলামে অধিকারের সঙ্গে দায়িত্ববোধ জড়িত। একজন মুসলিম নারী যখন গাড়ি চালাবেন, তখন তিনি পোশাক ও চলাফেরায় ইসলাম নির্দেশিত শালীনতা বা হিজাবের বিধান বজায় রাখবেন এবং দেশের প্রচলিত ট্রাফিক আইন মেনে চলবেন। কারণ, রাষ্ট্রের আইন মেনে চলাও একজন সুনাগরিকের নৈতিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব। নিজের গাড়ি চালিয়ে গন্তব্যে এগিয়ে যাওয়া একজন নারী নিজের জীবনকে সহজ করার পাশাপাশি একটি আধুনিক ও ভারসাম্যপূর্ণ ইসলামি সমাজের উজ্জ্বল প্রতিনিধিত্ব করছেন।

















