চট্টগ্রাম নগরীতে বর্তমানে প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং সক্রিয় রয়েছে, যাদের সদস্যদের বয়স ১৬ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ‘ডেঞ্জার’, ‘ফোর জিরো সেভেন’, ‘পাইথন’, ‘বিগু’, ‘এমবিএস’, ‘কেবি’, ‘এনএস’ ও ‘ট্রিপল নাইন’ নামের এসব গ্যাংয়ের হাতে থাকে দেশীয় অস্ত্র এবং পকেটে মাদকের পোঁটলা। রাত নামলেই এরা ছিনতাই ও চাঁদাবাজিতে নেমে পড়ে। স্কুলপড়ুয়া শিক্ষার্থী থেকে শুরু করে প্রধান শিক্ষক—কেউই তাদের টার্গেট থেকে রেহাই পাচ্ছে না। স্থানীয় প্রভাবশালী অর্ধশতাধিক রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’ এসব গ্যাংকে প্রশ্রয় দিচ্ছে বলে তথ্য রয়েছে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর কাছে।
সম্প্রতি লোহাগাড়ার ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ হোসাইনকে অপহরণের চেষ্টা চালায় একই স্কুলের শিক্ষার্থী আরিয়ান মো. আয়ান ও তার সহযোগীরা। স্থানীয়দের সহায়তায় সেই অপচেষ্টা ব্যর্থ হয়। এই ঘটনার জেরে স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন ভূঁইয়াকে ‘ডেভিড জিহাদ’ পরিচয় দিয়ে গুম ও খুনের হুমকি দেওয়া হয়েছে। এ বিষয়ে লোহাগাড়া থানায় প্রধান শিক্ষক লিখিত অভিযোগ করেছেন।
চট্টগ্রামে কিশোর গ্যাংয়ের সহিংসতায় বেশ কয়েকজন প্রাণ হারিয়েছেন। গত ১২ই এপ্রিল চকবাজারের ডিসি রোড এলাকায় মোবাইল ফোন ছিনতাইয়ের বিরোধে কলেজছাত্র আশফাক কবির সাজিদকে মারধরের পর নির্মাণাধীন ভবনের লিফটে ফেলে হত্যা করা হয়। এ ঘটনায় ছয়জনকে গ্রেপ্তার করেছে পুলিশ। এছাড়া গত ২৬শে ফেব্রুয়ারি পাহাড়তলীতে পূর্ববিরোধের জেরে আকাশ দাশ নামে এক ব্যক্তিকে ছুরিকাঘাতে হত্যা করে ১০-১৫ জন কিশোর।
মুরাদপুর, চকবাজার, জামালখান, গণি বেকারি, হালিশহর, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গ্যাংগুলোর দৌরাত্ম্য বেশি। জামালখানে ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’ প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে মহড়া দিয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর জানান, গ্যাংগুলো এখন প্রকাশ্যে ভয় দেখিয়ে চাঁদা তুলছে। বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে গত ৪ঠা এপ্রিল মোরশেদ খান ও শওকত খান গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পাঁচলাইশের ‘মোহাম্মদপুর বয়েজ সিন্ডিকেট-এমবিএস’-এর গত বছরের সেপ্টেম্বরে ১৬-১৭ বছর বয়সী ৯ সদস্যকে গ্রেপ্তারের পর কিছুদিন চুপ থাকলেও তারা আবার সংগঠিত হচ্ছে। সিএমপি’র তথ্যমতে, স্টেশন রোড, বিআরটিসি মোড়, কদমতলী, সিআরবি, খুলশি, ফয়’স লেক, চান্দগাঁও, আগ্রাবাদ, বন্দর ও পতেঙ্গায় সন্ধ্যার পর কিশোর গ্যাংয়ের তৎপরতা বাড়ে। তারা মোটরসাইকেল, সাইকেল আর পথচারীদের সর্বস্ব লুটে নিচ্ছে। গত ১লা মার্চ ইয়াবাসহ ৪৫ জনকে গ্রেপ্তার করা হয়, যার মধ্যে ৯ জন কিশোর গ্যাং সদস্য। ২৮শে ফেব্রুয়ারি চট্টগ্রাম ও ফেনীতে র্যাব ৬টি গ্যাংয়ের ২৮ সদস্যকে গ্রেপ্তার করে। শীর্ষ সন্ত্রাসী বড় সাজ্জাদের অনুসারী গ্যাং লিডার ইমতিয়াজ সুলতান ইকরামকেও সম্প্রতি র্যাব গ্রেপ্তার করেছে।
জেলা পুলিশ ও সিএমপি কিশোর গ্যাং দমনে বিশেষ অভিযান পরিচালনা করছে। জেলা এসপি মাসুদ আলমের তত্ত্বাবধানে এবং অতিরিক্ত পুলিশ সুপার তারেক আজিজের নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে কিশোর গ্যাংয়ের পরিচালক ডেভিড ইমন ও ‘গলাকাটা’ মোবারক গ্রেপ্তার হয়েছেন। পুলিশ বলছে, এই গ্রেপ্তারগুলো গ্যাং নেটওয়ার্কে বড় ধাক্কা দিয়েছে।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্রিমিনোলজি ও পুলিশ সায়েন্স বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান মো. সাখাওয়াত হোসেন বলেন, পরিবার ও স্কুলের নজরদারির অভাব, মাদক এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নেতিবাচক প্রভাব কিশোরদের অপরাধে জড়াচ্ছে। সংশোধন কেন্দ্রগুলোও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না। সিএমপি কমিশনার হাসান মো. শওকত আলী জানিয়েছেন, ছিনতাই, মাদক ও চাঁদাবাজি দমনে পুলিশ কার্যকর পদক্ষেপ নিচ্ছে।
আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর তথ্য বলছে, চট্টগ্রাম নগরীতে এখন সক্রিয় প্রায় ২০০টি কিশোর গ্যাং। গ্যাংগুলোকে প্রশ্রয় দিচ্ছেন অর্ধশতাধিক প্রভাবশালী রাজনৈতিক ‘বড় ভাই’। তবে পুলিশের ধারাবাহিক অভিযানে আসছে সাফল্যও। সম্প্রতি গ্রেপ্তার হয়েছেন কিশোর গ্যাং পরিচালক ডেভিড ইমন, গলাকাটা মোবারকসহ কয়েকজন সন্ত্রাসী। কিশোর গ্যাংয়ের দৌরাত্ম্য এখন স্কুল-কলেজেও। লোহাগাড়ার ইকরা আবদুল জব্বার উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণির ছাত্র আবদুল্লাহ হোসাইনকে গত শনিবার দুপুর দেড়টায় স্কুল থেকে অপহরণের চেষ্টা করে একই স্কুলের শিক্ষার্থী আরিয়ান মো. আয়ান ও তার ৪-৫ সহযোগী। স্থানীয়দের সহযোগিতায় অপহরণ পণ্ড হয়। অপহরণকারীকে পুলিশে সোপর্দ করার জেরে প্রাণনাশের হুমকি পেলেন স্কুলের প্রধান শিক্ষক মো. জামাল উদ্দিন ভূঁইয়া। ‘ডেভিড জিহাদ’ পরিচয় দিয়ে ফোনে তাকে গুম ও খুনের হুমকি দেয়া হয়। এ ঘটনায় লোহাগাড়া থানায় লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন প্রধান শিক্ষক। ভুক্তভোগী আবদুল্লাহ পশ্চিম আমিরাবাদের খৈয়ারকুলের নাজিম উদ্দিনের ছেলে।
পুলিশ ও স্থানীয় সূত্র জানায়, মুরাদপুর, চকবাজার, জামালখান, গণি বেকারি, হালিশহর, পাঁচলাইশ ও বায়েজিদ বোস্তামী এলাকায় গ্যাংগুলোর মূল দৌরাত্ম্য। কোনো কোনো গ্যাংয়ের সদস্য ৩০ থেকে ১৫০ জন পর্যন্ত। সমপ্রতি জামালখানে ‘ডেঞ্জার গ্রুপ’ দেশীয় অস্ত্র নিয়ে প্রকাশ্যে মহড়া দিয়েছে। কোতোয়ালি থানার ওসি আবু জায়েদ মোহাম্মদ নাজমুন নূর বলেন, ‘আগে তারা আড়ালে ছিল। এখন প্রকাশ্যে এসে ভয় দেখিয়ে চাঁদা তুলছে।’ চকবাজারকেন্দ্রিক ‘ফোর জিরো সেভেন’ গ্যাংয়ের সদস্য সংখ্যাও ১০০ থেকে ১৫০ জন। গত ৪ঠা এপ্রিল বাকলিয়ার মিয়াখান নগরে আধিপত্য নিয়ে মোরশেদ খান ও শওকত খান গ্রুপের মধ্যে গোলাগুলির ঘটনা ঘটে। পুলিশ অভিযান চালিয়ে ১৯-২০ বছর বয়সী চারজনকে গ্রেপ্তার করে।

















