যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এবং চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের মধ্যে ওয়াশিংটনে অনুষ্ঠিত বৈঠকটি তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য অর্জন ছাড়াই শেষ হয়েছে। দুই নেতা একে অপরের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন, উপহার বিনিময় করেছেন এবং বাণিজ্য সমঝোতার মেয়াদ বাড়িয়েছেন। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) ঝুঁকি মোকাবিলায় একসঙ্গে কাজ করার সম্ভাবনার কথাও বলেছেন তাঁরা।
মাস চার আগে সর্বশেষ সাক্ষাৎ হয়েছিল এই দুই নেতার। সি চিন পিংয়ের এবারের সফর ছিল এক দশকের বেশি সময় পর কোনো চীনা প্রেসিডেন্টের ওয়াশিংটন সফর। বিশ্বের দুই বৃহৎ অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক শক্তির মধ্যে উত্তেজনা প্রশমনের উদ্দেশ্যে আয়োজিত এই বৈঠকে বড় ধরনের কোনো অগ্রগতি হয়নি। তবে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের উচ্চাকাঙ্ক্ষার নিরিখে, তাঁর জন্য এর চেয়ে বেশি কিছু প্রয়োজন ছিল না।
বৈঠকের পরদিন হোয়াইট হাউসে আয়োজিত এক নৈশভোজে সি চিন পিং ওয়াশিংটন-বেইজিং সহযোগিতার গুরুত্ব তুলে ধরেন। তিনি বলেন, চীনের উত্থান যুক্তরাষ্ট্রের জন্য কোনো হুমকি নয়, বরং তা উপকারী হতে পারে। সি বলেন, ‘দুই দেশের বন্ধুত্বের সামনে রয়েছে অপার সম্ভাবনা। আসুন আমরা হাতে হাত মিলিয়ে এগিয়ে যাই।’
দুই নেতার বক্তব্যের সুর ছিল প্রায় একই রকম। ট্রাম্পের ‘মেক আমেরিকা গ্রেট এগেইন’ স্লোগানের সঙ্গে সি তাঁর ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ পরিকল্পনার তুলনা করেন। এটি একটি দীর্ঘমেয়াদী পরিকল্পনা, যার লক্ষ্য হলো চীনকে একটি বিশ্বমানের সামরিক, শিল্প ও প্রযুক্তি সক্ষমতা সম্পন্ন বৈশ্বিক কেন্দ্রে পরিণত করা।
এই লক্ষ্য অর্জনে সি যেসব অগ্রগতি করেছেন, তার পরিপ্রেক্ষিতে মার্কিন কর্মকর্তারা চীন থেকে আমদানি, সে দেশে বিনিয়োগ এবং মার্কিন প্রযুক্তির ব্যবহারে বিধিনিষেধ আরোপের মতো সুরক্ষামূলক পদক্ষেপ নিতে বাধ্য হয়েছেন। তবে এগুলোর কার্যকারিতা সীমিত বলে মনে হচ্ছে, কারণ মার্কিন পদক্ষেপ সত্ত্বেও চীনের রপ্তানি রেকর্ড পর্যায়ে রয়েছে। এআই ও রোবট খাতে বেইজিং দ্রুত উন্নতি করছে। এছাড়া, যুক্তরাষ্ট্রের প্রয়োজনীয় বিরল খনিজসহ বিভিন্ন পণ্য ও কাঁচামালের ওপর চীনের শক্তিশালী নিয়ন্ত্রণ রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে, এবারের সফরে সি চিন পিং তুলনামূলকভাবে বেশি সুবিধাজনক অবস্থানে ছিলেন। তাই আপাতত বাস্তব অর্জনের চেয়ে বাহ্যিক আয়োজনই তাঁর জন্য যথেষ্ট বলে মনে করা হচ্ছে।
এর আগে গত মে মাসে ট্রাম্প যখন বেইজিং সফর করেছিলেন, তখন তাঁর সঙ্গে একটি বড় ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল ছিল। কিন্তু এবারের ওয়াশিংটন সফরে সি চিন পিং কোনো ব্যবসায়ী প্রতিনিধিদল আনেননি। বেইজিং ফরেন স্টাডিজ ইউনিভার্সিটির গবেষক কুই হংজিয়ান সিএনএনকে বলেছেন, ব্যবসায়িক প্রতিনিধিদের অনুপস্থিতি এটাই ইঙ্গিত দেয় যে, বাণিজ্যের ক্ষেত্রে দুই দেশ এখনো কোনো বড় ধরনের অর্জন করতে পারেনি।
যুক্তরাষ্ট্র-চীন দ্বন্দ্ব বৈশ্বিক ভূরাজনীতি ও সরবরাহ ব্যবস্থায় বড় পরিবর্তন এনেছে। চলতি বছরের শুরুতে দুই দেশের সম্পর্ক কিছুটা স্থিতিশীল হওয়াকে অনেকেই ইতিবাচকভাবে দেখেছিলেন। তবে সির এবারের সফরটি গত মে মাসে ট্রাম্পের বেইজিং সফরের মতোই ছিল, যেখানে বড় বড় প্রতীকী আয়োজন দেখা গেলেও সুনির্দিষ্ট পদক্ষেপের অভাব ছিল।
এদিকে, নভেম্বরে যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যবর্তী নির্বাচন সামনে রেখে ট্রাম্পের ওপর রাজনৈতিক চাপ বাড়ছে। মূল্যস্ফীতি এবং দীর্ঘস্থায়ী ইরান যুদ্ধও তাঁর জন্য চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। এছাড়া, সিএনএনসহ তিনটি সংবাদমাধ্যমকে হোয়াইট হাউসে প্রবেশে বাধা দেওয়ার পর বৃহস্পতিবারের বৈঠকটি যুক্তরাষ্ট্রের বড় টেলিভিশন নেটওয়ার্কগুলো সরাসরি সম্প্রচার করেনি।
তাইওয়ানের বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের সমর্থন কমানো সি চিন পিংয়ের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। বেইজিং তাইওয়ানকে নিজেদের অংশ মনে করে এবং একে নিজেদের ‘চীনা জাতির মহান পুনর্জাগরণ’ পরিকল্পনার একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখে। চীনা সংবাদ সংস্থা সিনহুয়া জানিয়েছে, বৈঠকে ট্রাম্পকে তাইওয়ানের স্বাধীনতার বিরোধিতা করার আহ্বান জানিয়েছেন সি। যদিও যুক্তরাষ্ট্রের ‘তাইওয়ান রিলেশনস অ্যাক্ট’ অনুযায়ী তাইওয়ানের আত্মরক্ষার জন্য দ্বীপটির কাছে অস্ত্র বিক্রি করতে ওয়াশিংটন বাধ্য।
সি চিন পিং যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সমন্বয় করে এআইয়ের উন্নয়নের ওপরও জোর দিয়েছেন। অত্যাধুনিক এআই মডেলগুলো মানুষের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যেতে পারে—এমন আশঙ্কার পরিপ্রেক্ষিতে এআইয়ের ওপর কঠোর নজরদারি ও নিয়ন্ত্রণের দাবি উঠছে। যুক্তরাষ্ট্র ও চীন এআই খাতে শীর্ষ দুই শক্তি হওয়ায় বিষয়টি তাদের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
উন্নত এআই মডেল তৈরির প্রতিযোগিতায় লাগাম টানার বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠান ওপেনএআই ও অ্যানথ্রোপিকের নেতারা একমত হয়েছেন। তবে ট্রাম্প এআই নিয়ে তৈরি হওয়া ভয়কে ‘ভাঁওতা’ বলে অভিহিত করেছেন, যা চীনকে লাভবান করছে। এআই খাতে চীনের দ্রুত অগ্রগতি মার্কিন কর্মকর্তাদের মধ্যে উদ্বেগ সৃষ্টি করেছে। মার্কিন কর্মকর্তারা চীনা কোম্পানিগুলোর বিরুদ্ধে তাদের এআই মডেল নকল করার অভিযোগ তুলেছেন এবং চীনের ওপর নিষেধাজ্ঞা আরোপের কথাও বলছেন। তবে সি চিন পিংয়ের বক্তব্যে পরিস্থিতি এই পর্যায়ে গড়াবে না বলেই মনে হচ্ছে। তিনি বলেছেন, ‘আমাদের শান্তিপূর্ণভাবে সহাবস্থান বজায় রাখা উচিত।’

















