আসন্ন শারদীয় দুর্গাপূজা শান্তিপূর্ণ, উৎসবমুখর ও নির্বিঘ্ন পরিবেশে উদযাপন নিশ্চিত করতে রাষ্ট্রীয়ভাবে পদক্ষেপ গ্রহণের পাশাপাশি ক্ষমতাসীন দল হিসেবে বিএনপিও সারাদেশে পূজামণ্ডপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দলীয় নেতাকর্মীদের বিশেষ সাংগঠনিক নির্দেশনা ও দায়িত্ব প্রদান করেছে। নির্দেশনায় বলা হয়েছে, দুর্গাপূজা ঘিরে কোনো মহল যাতে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে পরিস্থিতি ঘোলাটে করতে না পারে, সেদিকে বিশেষ নজর রাখবে বিএনপি। বিশেষ করে সামাজিক মাধ্যমে গুজব ছড়ানো এবং পুরনো ছবি বা ভিডিও ব্যবহার করে উত্তেজনা তৈরির চেষ্টা ঠেকাতে নেতাকর্মীদের সতর্কবার্তা দেওয়া হয়েছে। মূলত দেশের ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় মাঠে থেকে কাজ করবে বিএনপি।
এ লক্ষ্যে সারাদেশে বিএনপির কেন্দ্রীয় ও স্থানীয় নেতারা সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সঙ্গে নিরবচ্ছিন্ন যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের সার্বিক নিরাপত্তা ও আশ্বস্ত করতে মণ্ডপে মণ্ডপে মতবিনিময় সভা করছেন। সারাদেশে জেলা, উপজেলা এবং থানা পর্যায়ে বিশেষ নিরাপত্তা সেল গঠন করা হয়েছে। যুবদল, ছাত্রদল এবং স্বেচ্ছাসেবক দলের নেতাকর্মীদের সমন্বয়ে মণ্ডপভিত্তিক স্বেচ্ছাসেবী টিম গঠন করা হয়েছে, যারা স্থানীয় পূজা কমিটির সঙ্গে সমন্বয় করে ২৪ ঘণ্টা পাহারা দেবে।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের সভাপতিত্বে মন্ত্রিসভার বৈঠকে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বৃহত্তম উৎসব উপলক্ষে বহুমুখী নিরাপত্তা ও সহায়তা কর্মসূচি গ্রহণ করেছে সরকার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানানো হয়েছে, পুরো উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে এবং কোনো হুমকি দেখা দিলে তাৎক্ষণিকভাবে ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে। রাজনৈতিক অস্থিতিশীলতা বা কোনো কুচক্রী মহল যাতে মণ্ডপে হামলা বা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্ট করতে না পারে, সেজন্য বিএনপি চেয়ারম্যান ও প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের নির্দেশনায় দলটির পক্ষ থেকে কঠোর সাংগঠনিক বার্তা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে নেতাকর্মী-সমার্থকদের দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী স্বাক্ষরিত এক প্রেস বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়েছে, চলতি বছরের ১৭ অক্টোবর থেকে অনুষ্ঠেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজায় কোনো প্রকার অপ্রীতিকর কিংবা অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার চক্রান্ত যাতে কেউ করতে না পারে, সে বিষয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি, সংহতি ও সকল ধর্মের মানুষের নির্বিঘ্নে ধর্ম পালনের অধিকারে বিশ্বাসী বিএনপির নেতাকর্মীরা সার্বক্ষণিক সতর্ক ও সজাগ দৃষ্টি রাখবে। পূজাকে কেন্দ্র করে পতিত স্বৈরাচারের অনুচরেরা কিংবা দেশের ভাবমূর্তি বিনষ্ট ও চক্রান্তকারীরা যাতে কোনো অপতৎপরতা চালাতে না পারে, সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। নিজ নিজ এলাকায় হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ যাতে নির্বিঘ্নে, শান্তি ও স্বস্তি সহকারে উৎসব পালন করতে পারে সে জন্য দলের সকল পর্যায়ের নেতাকর্মীকে সর্বোচ্চ সহযোগিতা প্রদান করতে হবে।
বিজ্ঞপ্তিতে আরও বলা হয়, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে জেলার প্রতিটি উপজেলা, পৌরসভা, ইউনিয়ন ও ওয়ার্ড পর্যায়ে পূজামণ্ডপের জন্য পূজা উদযাপন কমিটির সদস্যবৃন্দ এবং বিএনপি ও এর অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের সমন্বয়ে একটি স্বেচ্ছাসেবক টিম গঠন করে দিনরাত পাহারার ব্যবস্থা করবেন। প্রতিটি ইউনিটের কার্যক্রম গণমাধ্যম এবং সামাজিক মাধ্যমে প্রচার বা প্রকাশ করে সাধারণ জনগণকে উৎসাহিত করতে উদাত্ত আহ্বান জানানো হয়েছে।
বিএনপির (চট্টগ্রাম বিভাগীয়) সাংগঠনিক সম্পাদক মাহবুবের রহমান শামীম আমাদের সময়কে বলেন, দুর্গোৎসব যাতে সার্বিকভাবে নির্বিঘ্নে, সুন্দর ও সর্বজনীনভাবে উদযাপিত হতে পারে সেজন্য আমাদের দলের পক্ষ থেকে মাঠপর্যায়ের নেতাকর্মীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। সামাজিক মাধ্যমেও গুজবের বিষয়ে সতর্কতা অবলম্বন করা হবে। তবে কোনো ধরনের উসকানি বা অপতৎপরতার সুযোগ দেওয়া যাবে না। প্রশাসনকে সহযোগিতা করা হবে, তবে দলীয় নেতাকর্মীদের কোনোভাবে আইন হাতে তুলে না নেওয়ার নির্দেশনা রয়েছে।
বিএনপির নীতি-নির্ধারকরা বলছেন, পূজামণ্ডপে হামলা, নাশকতা বা সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা সৃষ্টির কোনো সুযোগ দেবে না দলটি। এ কারণে দলীয় নেতাকর্মীদের সতর্ক অবস্থানে রাখার সিদ্ধান্ত বিএনপির। ফলে কেন্দ্র থেকে তৃণমূল পর্যায় পর্যন্ত নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। একই সঙ্গে পূজামণ্ডপের নিরাপত্তায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় নেতাদের সমন্বয়ের বার্তা দেওয়া হয়। কোথাও সন্দেহজনক তৎপরতা দেখা গেলে দ্রুত প্রশাসনকে জানানোর নির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী আমাদের সময়কে বলেন, সম্প্রীতির দেশ বাংলাদেশে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় অনুষ্ঠানে নিরাপত্তা দেওয়া প্রশাসনের পাশাপাশি বিএনপি নেতাদেরও রাজনৈতিক ও সামাজিক দায়িত্ব। কেননা বিশৃঙ্খলা চালিয়ে দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করার গভীর ষড়যন্ত্র চলছে। তাই পূজামণ্ডপে শান্তি বজায় রাখতে যেকোনো নাশকতা ও ষড়যন্ত্র প্রতিহত করা এবং প্রশাসনকে সতর্ক থাকতে হবে। তিনি বলেন, সুষ্ঠু ও সুন্দরভাবে পূজা সম্পন্ন করতে রাজনৈতিক দল হিসেবে বিএনপি সহযোগিতা করবে, হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশে থাকবে। যারা সুযোগসন্ধানী এবং দেশের ভাবমূর্তি নষ্ট করতে চায় তারা যাতে বিশৃঙ্খলা না করতে পারে এ ব্যাপারে সবাই সতর্ক ও সজাগ থাকবেন।
এদিকে, শারদীয় দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে দেশের সনাতন ধর্মাবলম্বীদের জন্য দুটি বড় উপহার দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের পক্ষ থেকে দুর্গাপূজা আয়োজনের জন্য সরকারের কাছে ৪ কোটি টাকা অনুদানের আবেদন করা হয়েছিল। তবে উৎসবের গুরুত্ব ও সামগ্রিক দিক বিবেচনা করে প্রধানমন্ত্রী বিশেষ বিবেচনায় বরাদ্দ বাড়িয়ে ৫ কোটি টাকা অনুমোদন করেছেন। এই বর্ধিত অর্থ জেলা প্রশাসনের সমন্বয়ে হিন্দু ধর্মীয় কল্যাণ ট্রাস্টের মাধ্যমে সরাসরি সুবিধাভোগীদের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে পৌঁছে যাবে। একই সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর উপহার হিসেবে প্রতিটি সংসদীয় আসনে ৫০০ শাড়ি দেয়া হবে। এ ছাড়া দুর্গাপূজার আনন্দ দেশবাসীর মাঝে ছড়িয়ে দিতে নির্বাহী আদেশে ছুটি এক দিন বৃদ্ধি করা হয়েছে।
পূজা উদযাপনে কোনো ধরনের বিঘ্ন যাতে না ঘটে, সেজন্য বর্তমান সরকারের বিভিন্ন বিভাগ থেকে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। সারাদেশের প্রান্তিক অঞ্চলের পূজামণ্ডপগুলোতে উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে দেশজুড়ে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন, পুলিশ, আনসার ও র্যাবের টহল বৃদ্ধি, সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানোর কঠোর নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। ছুটির দিনগুলোতেও মণ্ডপের নিরাপত্তার স্বার্থে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর (৯৯৯) এবং বিদ্যুৎ ও ফায়ার সার্ভিসের বিশেষ টিম সার্বক্ষণিক সক্রিয় থাকবে।
এবার দুর্গাপূজার সময় নজরদারি জোরদার করতে সরকারি সংস্থা এমন একটি মোবাইল অ্যাপ্লিকেশন ব্যবহার করবে, যা এর আগে নির্বাচনের সময় ন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন মনিটরিং সেন্টার (এনটিএমসি) ব্যবহার করেছিল। এই অ্যাপ কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনার তথ্য দ্রুত জানিয়ে দিতে সহায়তা করবে এবং শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ বজায় রাখতে কর্তৃপক্ষকে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে সাহায্য করবে। এই পদ্ধতি ব্যবহারের জন্য জেলা পর্যায়ের কর্মকর্তাদের প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় এবং একই সঙ্গে পুলিশ সদর দপ্তরসহ বিভাগীয় ও জেলা পুলিশ পর্যায়ে ২৪ ঘণ্টা মনিটরিং সেল চালু থাকবে। পূজামণ্ডপগুলোতে নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি মণ্ডপ আয়োজকদের সার্বক্ষণিক জেনারেটর প্রস্তুত রাখার এবং জেনারেটর বিকল হওয়ার মতো পরিস্থিতিতে অতিরিক্ত ব্যাকআপ হিসেবে রিচার্জেবল লাইট রাখার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ও স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ বলছেন, শারদীয় দুর্গাপূজা ঘিরে সারাদেশে নিরাপত্তা প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। উৎসব চলাকালে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সর্বোচ্চ সতর্কাবস্থায় থাকবে। কোনো অ্যালার্ট বা ঝুঁকির তথ্য নেই, উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে। তিনি জানান, এবার সারাদেশে প্রায় ৩৩ হাজার ৮৫১টি পূজামণ্ডপে পূজা উদযাপন করবে সনাতন ধর্মাবলম্বীরা। এবার পূজামণ্ডপের সংখ্যা গতবারের চেয়ে প্রায় দেড় হাজার বেশি। এর আগের বছর মণ্ডপের সংখ্যা ছিল ৩২ হাজার ৩৫১টি এবং তার আগের বছরগুলোতে ছিল প্রায় ২৮,০০০টি। জাতীয়, বিভাগীয়, জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে বিভিন্ন সরকারি সংস্থার ওপর নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এবং সুষ্ঠুভাবে পূজা উদযাপনের দায়িত্ব অর্পণ করা হয়েছে।
বিএনপি চেয়ারম্যানের উপদেষ্টা জয়নুল আবদীন ফারুক আমাদের সময়কে বলেন, বাংলাদেশ সব ধর্ম ও মতের মানুষের সহাবস্থানের দেশ। যারা রাজনৈতিক সুবিধা হাসিলের জন্য ষড়যন্ত্র-চক্রান্ত করবে তাদের প্রতিহত করতে বিভিন্ন স্থানে আমরা পাহারা দেওয়ার ব্যবস্থা করব।
বিএনপির (রাজশাহী বিভাগীয়) সহসাংগঠনিক সম্পাদক এএইচএম ওবায়দুর রহমান চন্দন আমাদের সময়কে বলেন, দুর্গাপূজায় বিএনপির সবস্তরের নেতাকর্মীরা সতর্ক থাকবেন। কাউকেই অস্থিরতা সৃষ্টির সুযোগ দেওয়া হবে না। ইতোমধ্যে এ বিষয়ে বিভিন্ন জায়গায় নেতাকর্মীদের নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে।
অন্যদিকে, গতকাল বুধবার দুপুরে ঝিনাইদহ শিশু একাডেমি মিলনায়তনে শারদীয় দুর্গোৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনের লক্ষ্যে আয়োজিত এক প্রস্তুতিমূলক সভা শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক সহকারী রাশেদ খাঁন বলেন, শারদীয় দুর্গোৎসবে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির জন্য আওয়ামী লীগ (কার্যক্রম নিষিদ্ধ রাজনৈতিক দল) ষড়যন্ত্র করছে। সরকারের কাছে তথ্য রয়েছে যে আওয়ামী লীগ বর্তমান নির্বাচিত বিএনপি সরকারের বিরুদ্ধে অপতৎপরতা চালাচ্ছে।

















