রাজধানীর আবদুল গনি রোডে অবস্থিত সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে সরিয়ে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সভাপতিত্বে গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে অনুষ্ঠিত এক সভায় এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। সভায় গণপূর্ত মন্ত্রণালয়, গণপূর্ত অধিদপ্তর ও স্থাপত্য অধিদপ্তরের শীর্ষ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।
পরদিনই সচিবালয় স্থানান্তরের একটি প্রকল্প বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) অন্তর্ভুক্ত করার জন্য পরিকল্পনা কমিশনকে চিঠি দিয়েছে গণপূর্ত মন্ত্রণালয়। আগামী সপ্তাহে পরিকল্পনা কমিশনে এই প্রকল্পের ওপর একটি আন্তমন্ত্রণালয় সভা অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সংশ্লিষ্ট সূত্রমতে, সরকার যত দ্রুত সম্ভব এই প্রকল্পের কাজ শুরু করে নিজেদের মেয়াদে দৃশ্যমান অগ্রগতি আনতে চায়।
বৈঠকে উপস্থিত স্থাপত্য অধিদপ্তরের প্রধান স্থপতি আসিফুর রহমান ভূঁইয়া জানান, সচিবালয়কে শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তরের বিষয়ে স্থাপত্য অধিদপ্তর থেকে তিনটি আলাদা নকশা উপস্থাপন করা হয় এবং একটি নকশার ওপর সবাই একমত হন। এই নকশার ভিত্তিতেই প্রকল্পটি তৈরি করা হবে এবং জাতীয় অর্থনৈতিক পরিষদের নির্বাহী কমিটি (একনেক) বৈঠকে উপস্থাপন করা হবে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, এর আগেও বেশ কয়েকবার শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। ২০১৫ সালে ২ হাজার ২০৯ কোটি টাকার একটি প্রকল্পের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যা ২০১৮ সালের জুনের মধ্যে শেষ হওয়ার কথা ছিল। তখন বাণিজ্য মেলার মাঠে ৩২ একর জমির ওপর সচিবালয় তৈরির পরিকল্পনা ছিল, যা জাতীয় সংসদ ভবনের স্থপতি লুই আই কানের মূল পরিকল্পনা অনুযায়ী হওয়ার কথা ছিল। তবে সে সময় সচিবালয় স্থানান্তর হয়নি।
নতুন বিএনপি সরকারের আমলে সচিবালয়ের ভেতরে ২১ তলা একটি ভবন নির্মাণের জন্য সাড়ে ৬০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হয়েছিল, যা গত ২৬ এপ্রিল একনেক সভায় অনুমোদন না দিয়ে ফেরত পাঠানো হয়। সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা যায় কিনা, তা পর্যালোচনা করার জন্য গণপূর্ত মন্ত্রণালয় ও স্থাপত্য অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেন।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় গত পাঁচ মাস ধরে অংশীজনদের সঙ্গে বৈঠক করে প্রকল্পটি বাস্তবায়নের সম্ভাব্য প্রাথমিক ব্যয় ৩ হাজার ৫০০ কোটি টাকা নির্ধারণ করেছে। গত বুধবার প্রধানমন্ত্রীর সামনে একটি প্রতিবেদন উপস্থাপন করা হয়, যেখানে স্থাপত্য অধিদপ্তরের তিনটি দলের তৈরি করা নকশা থেকে একটি চূড়ান্ত করা হয়। ওই নকশার ওপর ভিত্তি করে প্রকল্প তৈরি করতে গণপূর্ত অধিদপ্তরকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, সচিবালয়ের চারপাশে একটি চক্রাকার সড়ক নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ-চীন মৈত্রী সম্মেলন কেন্দ্রের পেছন দিয়ে একটি সড়ক মিরপুর সড়কে উঠবে, যা জুলাই স্মৃতি জাদুঘরের পাশ দিয়ে যাবে। এই সড়ক নির্মাণে জাদুঘরের পাশের স্কুল, হাসপাতাল ও প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের মতো স্থাপনা সরিয়ে ফেলার প্রয়োজন হতে পারে। এছাড়া, বিজয় সরণি থেকে আগারগাঁও হয়ে মিরপুর ১০ নম্বরের দিকে যাওয়া সড়কের নিচ দিয়ে একটি পাতাল সড়ক নির্মাণের আলোচনাও চলছে, যা প্রস্তাবিত সচিবালয়ে প্রবেশ এবং মিরপুর সড়কে যাওয়ার সুবিধা দেবে। এই জন্য একটি আলাদা প্রকল্প নেওয়া হতে পারে।
প্রস্তাবিত নকশা অনুযায়ী, জাতীয় সংসদের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে প্রতিটি সচিবালয় ভবন ১২ তলাবিশিষ্ট হবে। শেরেবাংলা নগরে সচিবালয় স্থানান্তরের পর যানজট একটি বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে, যদিও গণপূর্ত মন্ত্রণালয় যানজট নিরসনে বিভিন্ন পদক্ষেপ নেওয়ার কথা জানিয়েছে।
গণপূর্ত মন্ত্রণালয় সূত্র জানিয়েছে, সচিবালয় আবদুল গনি রোড থেকে শেরেবাংলা নগরে সরে গেলে বর্তমান সচিবালয়ে থাকা ঢাকা জেলা প্রশাসক (ডিসি) অফিস, পুলিশ সুপার (এসপি) অফিসসহ পুরান ঢাকার সরকারি কার্যালয়গুলোকেও অন্য কোথাও স্থানান্তর করা হতে পারে। বর্তমান সচিবালয়ে জায়গার অভাব কর্মকর্তাদের দাপ্তরিক কাজে সমস্যা সৃষ্টি করে এবং আশপাশের এলাকায় ব্যাপক যানজট তৈরি করে কর্মঘণ্টা নষ্ট করে। বর্তমান সচিবালয়ের আয়তন ১৭ লাখ বর্গফুট, যেখানে প্রস্তাবিত সচিবালয়ের আয়তন হবে ৩১ লাখ বর্গফুট।
বাণিজ্য মেলার মাঠটি গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের অধীনে রয়েছে এবং ২০২১ সালে বাণিজ্য মেলা পূর্বাচলে সরিয়ে নেওয়ার পর মাঠটি খালি পড়ে আছে। চার বছর আগে এই খালি মাঠে পার্ক তৈরির জন্য ১০০ কোটি টাকা ব্যয়ে একটি প্রকল্প নেওয়া হলেও তা আলোর মুখ দেখেনি। গণপূর্ত মন্ত্রণালয় মনে করছে, জায়গাটি এভাবে খালি রাখলে কেউ দখল করে নিতে পারে, তাই সচিবালয় স্থানান্তর করলে জায়গাটি সুরক্ষিত থাকবে।
স্থপতি ইকবাল হাবিব মনে করেন, ১৯৬৯ সালের লুই কানের নকশার আলোকে ২০২৬ সালে সচিবালয় শেরেবাংলা নগরে স্থানান্তর করা সঠিক হবে না। তিনি মালয়েশিয়ার পুত্রজায়ার মতো ভিন্ন কোনো স্থানে সচিবালয় স্থানান্তরের কথা বলেন। তিনি আরও উল্লেখ করেন যে, শেরেবাংলা নগর ও আগারগাঁওয়ে ইতিমধ্যে অনেক সরকারি স্থাপনা গড়ে ওঠায় যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে এবং নতুন করে সচিবালয় হলে সেখানে যানজটের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

















