যুক্তরাষ্ট্রে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তা চেষ্টার ঘটনার পর গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার দ্রুত সম্পন্ন করার দাবি দেশজুড়ে আরও জোরদার হয়েছে। তবে দল ও ব্যক্তির বিরুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলমান থাকলেও বিচার প্রক্রিয়া নিয়ে নানা সংশয় তৈরি হয়েছে। তদন্তের মন্থর গতি, আলামত নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা এবং জামিনে মুক্ত হওয়া নেতাদের হুমকির ঘটনা উদ্বেগ বাড়াচ্ছে।
গত সোমবার কাতার এয়ারওয়েজের ফ্লাইটে দোহা থেকে যুক্তরাষ্ট্রে পৌঁছানোর পর জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরের ৮ নম্বর টার্মিনাল দিয়ে হুইলচেয়ারে বের হওয়ার সময় আওয়ামী লীগের প্রবাসী কয়েকজন নেতা ড. ইউনূসের সামনে অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি সৃষ্টি করেন। নিরাপত্তারক্ষী ও সহযোগীদের হস্তক্ষেপে তিনি দ্রুত বিমানবন্দরের ভেতরের দিকে সরে যেতে সক্ষম হন।
এই ঘটনায় রাজনীতিবিদরা ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও সংসদ সদস্য নাহিদ ইসলাম তার ফেসবুকে লিখেছেন, ‘মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে ড. মুহাম্মদ ইউনূসকে হেনস্তার চেষ্টা আবারও আওয়ামী লীগের সন্ত্রাসনির্ভর রাজনীতির নির্মম, সহিংস ও অমানবিক চরিত্রকে উন্মোচিত করেছে।’ তিনি এই সন্ত্রাসী নেটওয়ার্ককে প্রতিহত করার আহ্বান জানিয়ে অবিলম্বে গণহত্যাকারী দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরুর দাবি জানান। জাতীয় নাগরিক পার্টিও (এনসিপি) এক বিবৃতিতে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন আওয়ামী লীগের সঙ্গে কোনো রিকনসিলিয়েশন নয়’ বলে অবস্থান ব্যক্ত করেছে। প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সম্প্রচার উপদেষ্টা ডা. জাহেদ-উর রহমানও ব্যক্তিগতভাবে আওয়ামী লীগের সঙ্গে সমঝোতার কোনো সম্ভাবনা দেখেন না বলে জানিয়েছেন।
রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক সেলিম রেজা নিউটন মনে করেন, আওয়ামী লীগকে ফ্যাসিস্ট পার্টি হিসেবে বিচার করতে হবে এবং তাদের পাওনা চুকিয়ে দিতে হবে। তিনি বলেন, বিচারের পর এই নামে বাংলাদেশে দলটি আর থাকতে পারবে না, অপরাধী না হলে নতুন নামে দল গঠন করতে পারে।
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের সাবেক সদস্য সচিব ও গণবিপ্লবী উদ্যোগের আহ্বায়ক আরিফ সোহেল বলেন, আওয়ামী লীগের বিচার দুটি দিক থেকে দেখতে হবে। প্রথমত, ব্যক্তি হিসেবে নেতাকর্মীদের বিচার, যারা ছাত্রজনতাকে হত্যার উদ্দেশ্যে আক্রমণসহ বিভিন্ন অপরাধ করেছেন। দ্বিতীয়ত, দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার, যারা সুপরিকল্পিতভাবে গণহত্যার মতো অপরাধ করেছে। তিনি উল্লেখ করেন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে ব্যক্তি পর্যায়ে কিছু বিচার হলেও অনেক নেতাকর্মী জামিন পেয়ে ছাত্রজনতাকে হুমকি দিচ্ছেন। অন্যদিকে, দল হিসেবে আওয়ামী লীগকে কেবল নির্বাহী আদেশে নিষিদ্ধ করা হয়েছে, যার আইনগত ভিত্তি বা বিচারিক জাস্টিফিকেশন নেই, ফলে এটি যেকোনো সময় পরিবর্তন হতে পারে। তিনি অবিলম্বে অপরাধী নেতাকর্মীদের বিচার জোরদার, আমলাতন্ত্রের সঙ্গে তাদের যোগাযোগ কঠোরভাবে পরিচালনা এবং আদালতের রায়ের মাধ্যমে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিচার শুরুর দাবি জানান।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের প্রসিকিউটর গাজী এমএইচ তামিম জানিয়েছেন, আগস্টের গণহত্যায় অভিযুক্ত ও কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের মানবতাবিরোধী অপরাধের তদন্ত চলছে এবং দেশব্যাপী বিভিন্ন জেলা-উপজেলায় এসব কর্মকাণ্ড সংঘটিত হওয়ায় তদন্তে সময় লাগছে। তবে ট্রাইব্যুনালের কয়েকটি সূত্র নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানিয়েছে, আওয়ামী লীগের দ্বারা সংঘটিত মানবতাবিরোধী অপরাধগুলোর তদন্ত তেমন এগোচ্ছে না এবং অনেক আলামত নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল (আইসিটি) এবং সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে গণহত্যার দায় ও অপরাধ সংগঠনের অভিযোগের আইনি প্রক্রিয়া সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের সময়ই শুরু হয়। ট্রাইব্যুনালের তদন্ত সংস্থা ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণহত্যা এবং আন্দোলন দমনে মানবতাবিরোধী অপরাধ সংঘটনের সুনির্দিষ্ট অভিযোগে দল হিসেবে আওয়ামী লীগের বিরুদ্ধে তদন্ত করছে। প্রসিকিউশন জানিয়েছে, দলগতভাবে অপরাধ ও সহিংসতায় জড়িত থাকার প্রমাণ চূড়ান্ত হলে ট্রাইব্যুনালের পাশাপাশি সন্ত্রাসবিরোধী আইন, ২০০৯-এর আওতায় সংগঠনটিকে শাস্তি দেওয়ার আইনি পথও খোলা রাখা হয়েছে।
২০২৫ সালের ১০ মে অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা পরিষদের বিশেষ সভায় আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল আইন সংশোধন এবং আওয়ামী লীগের রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধের যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছিল। তৎকালীন আইন উপদেষ্টা আসিফ নজরুল জানান, ১৯৭৩ সালের আন্তর্জাতিক অপরাধ (ট্রাইব্যুনাল) আইনে সংশোধনের মাধ্যমে ট্রাইব্যুনালকে যেকোনো রাজনৈতিক দল, তার অঙ্গসংগঠন বা সমর্থক গোষ্ঠীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে অভিযুক্ত করা, তাদের কার্যকলাপ স্থগিত করা, নিবন্ধন বাতিল করা বা সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করার এখতিয়ার দেওয়া হয়েছে।
ট্রাইব্যুনালে আওয়ামী লীগ ও এর নেতাদের বিচার শেষ না হওয়া পর্যন্ত দেশের নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্ব রক্ষা, জুলাই আন্দোলনের নেতাকর্মীদের নিরাপত্তা এবং সাক্ষীদের সুরক্ষার স্বার্থে সন্ত্রাসবিরোধী আইনের অধীনে আওয়ামী লীগ ও এর সকল অঙ্গ, সহযোগী ও ভ্রাতৃপ্রতিম সংগঠনের যাবতীয় রাজনৈতিক কার্যক্রম নিষিদ্ধ করে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়। এর আগে ২০২৪ সালের অক্টোবরে দলটির ছাত্র সংগঠন বাংলাদেশ ছাত্রলীগকে ‘সন্ত্রাসী সংগঠন’ আখ্যা দিয়ে নিষিদ্ধ করা হয়েছিল এবং নির্বাচন কমিশনও রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগের নিবন্ধন স্থগিত করেছিল।
















