রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে সচিবালয় স্থানান্তরের সরকারি উদ্যোগে শুরুতেই বাধার মুখে পড়েছে। এই সিদ্ধান্তের প্রতিবাদে আন্দোলনে নেমেছেন শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (শেকৃবি) শিক্ষার্থীরা। গত বুধবার তাঁরা মাঠটিতে নির্মাণাধীন দুটি মেলার স্থাপনা ভাঙচুরও করেন।
শিক্ষার্থীদের দাবি, বিশ্ববিদ্যালয়-সংলগ্ন এই মাঠের জায়গা তাঁদের নিজস্ব সম্পত্তি এবং কৃষিবিষয়ক গবেষণার জন্য অত্যন্ত মৌলিক ও অপরিহার্য। এখানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে একদিকে তাঁরা গবেষণার জায়গা হারাবেন, অন্যদিকে কৃষিবিষয়ক গবেষণাও ক্ষতিগ্রস্ত হবে। এছাড়া, বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশে সচিবালয় স্থাপন করা হলে ভবিষ্যতে নানা ধরনের সমস্যা তৈরি হতে পারে বলে তাঁরা মনে করেন। শিক্ষার্থীরা আরও জানান, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর থেকে তাঁরা এই গবেষণার মাঠের রক্ষণাবেক্ষণ, বৃক্ষরোপণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালনা করে আসছেন।
তবে গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. ওবায়দুর রহমান প্রথম আলোকে বলেন, ওই জায়গা শেরেবাংলা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের নয়, বরং গণপূর্তের নামে। তারপরও শিক্ষার্থীরা কেন এই দাবি করছেন, সেটি খতিয়ে দেখা হবে। মন্ত্রণালয়ের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা আরও জানান, মন্ত্রিসভায় যেহেতু এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, সুতরাং জায়গার বিষয়ে ভালোভাবে জেনেবুঝেই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে।
গত ১৮ অক্টোবর মন্ত্রিসভার বৈঠকে বর্তমানে আবদুল গনি রোডে অবস্থিত বাংলাদেশ সচিবালয় রাজধানীর শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত হয়। ২০২৯ সালে নতুন জায়গায় সচিবালয়ের কার্যক্রম শুরুর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। সচিবালয় স্থানান্তর করা হলে পুরান ঢাকায় অবস্থিত জেলা প্রশাসকের কার্যালয় ও অধস্তন আদালত সচিবালয়ের বর্তমান জায়গায় স্থানান্তরের বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে, যদিও এ বিষয়ে এখনো চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হয়নি।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সূত্রে জানা গেছে, বর্তমানে আবদুল গনি রোডে ১৭ দশমিক ৫৭ একর জায়গার ওপর বাংলাদেশ সচিবালয়ের ১৩টি ভবন রয়েছে। এর মধ্যে আটটি ভবন স্বাধীনতার আগে নির্মিত। সচিবালয়ের পুরোনো ১, ২, ৩ ও ৮ নম্বর ভবন ১৯৩৭ থেকে ১৯৩৯ সালের মধ্যে এবং ৫ নম্বর ভবনটি ১৯৪৭ সালে নির্মিত হয়। এসব ভবন ভূমিকম্প সহনশীল করে নির্মাণ করা হয়নি। ঢাকা শহর ভূমিকম্পপ্রবণ এলাকায় অবস্থিত হওয়ায় এসব স্থাপনায় সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রণালয় ও বিভাগের কার্যক্রম পরিচালনা ঝুঁকিপূর্ণ। এ ছাড়া ভবনগুলোতে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় স্বাভাবিক কর্মপরিবেশ ব্যাহত হচ্ছে।
মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ আরও জানিয়েছে, একনেক সভার সিদ্ধান্তের পরিপ্রেক্ষিতে শেরেবাংলা নগরের পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে বাংলাদেশ সচিবালয় স্থাপনের লক্ষ্যে স্থাপত্য অধিদপ্তর ধারণাগত স্থাপত্য নকশা প্রণয়ন করেছে। ওই নকশা অনুযায়ী, প্রায় ৩১ দশমিক ৫৮ একর জায়গায় মোট প্রায় ৩৩ দশমিক ১৬ লাখ বর্গফুট আয়তনের স্থাপনা নির্মাণ করা হবে। এতে তিনটি বেসমেন্টসহ ১৪টি ১২তলা ভবন থাকবে। ৩ হাজার ৮০০টি গাড়ি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা থাকবে, যার মধ্যে ২০০টি ভূ-উপরিস্থ পার্কিং। এ ছাড়া মসজিদ, ৩৫০ জন ধারণক্ষমতাসম্পন্ন দুটি বহুমুখী হল, একটি ক্যাফেটেরিয়া, একটি ডাকঘরসহ অন্যান্য স্থাপনা নির্মাণের পরিকল্পনা রয়েছে। প্রকল্প এলাকায় প্রায় ৩০ শতাংশ জায়গায় সবুজায়ন ও জলাধারের ব্যবস্থা রাখা হয়েছে। নতুন জায়গায় সচিবালয় নির্মাণের জন্য মাটি পরীক্ষার কাজও শুরু হয়েছে।
এদিকে, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠে পাশাপাশি দুটি মেলার আয়োজন চলছিল। সেখানে মাসব্যাপী ‘এশিয়া আন্তর্জাতিক বাণিজ্য মেলা’ এবং এক সপ্তাহব্যাপী ‘যুব মেলা’র প্রস্তুতি চলছিল। মেলা দুটির জন্য মাঠে ফটক ও বিভিন্ন স্টল নির্মাণ করা হচ্ছিল। গতকাল দুপুরের আগে শেকৃবির শতাধিক শিক্ষার্থী মাঠে গিয়ে মেলার স্থাপনা ভাঙচুর করেন। এর আগের দিনও তাঁরা প্রতিবাদ জানান।
শিক্ষার্থীরা জানান, আশির দশকে হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সামরিক শাসনামলে মেলার জন্য সাময়িকভাবে জায়গাটি নেওয়া হয়েছিল, কিন্তু পরে তা আর বিশ্ববিদ্যালয়কে ফেরত দেওয়া হয়নি। জায়গাটি ফেরত পেতে বিভিন্ন সময়ে সরকারের সংশ্লিষ্ট দপ্তরে চিঠি চালাচালি হয়েছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেন।
গত ২৭ অক্টোবর বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্যের কাছে একটি চিঠি দিয়ে শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়–সংলগ্ন পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠ পুনরুদ্ধারে জরুরি সিন্ডিকেট সভা ডাকা এবং এ বিষয়ে হাইকোর্টে রিট করার দাবি জানান। তাঁদের মতে, ঢাকার মতো জনবহুল ও অপরিকল্পিত নগরের প্রাণকেন্দ্রে সচিবালয় নির্মাণের সিদ্ধান্ত পরিবেশগত দিক থেকে চরম অপরিণামদর্শী। একই সঙ্গে এটি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষাদান ও কৃষি গবেষণার জন্য মারাত্মক হুমকি।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে শেকৃবির এক শিক্ষার্থী প্রথম আলোকে বলেন, পুরোনো বাণিজ্য মেলার মাঠের পাশে বিশ্ববিদ্যালয় ছাড়াও একাধিক সরকারি হাসপাতাল রয়েছে। সেখানে সচিবালয় স্থাপন করা হলে এসব হাসপাতালের কার্যক্রমেও প্রভাব পড়তে পারে। সচিবালয় স্থানান্তরের উদ্যোগ বন্ধ না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের প্রতিবাদ চলবে এবং তাঁরা কোনোভাবেই সেখানে সচিবালয় হতে দেবেন না।

















