বাংলাদেশের শিক্ষাব্যবস্থায় দীর্ঘকাল ধরে বিরাজমান নৈরাজ্য ও অব্যবস্থাপনা শিক্ষার্থীদের জীবনে অপূরণীয় খেসারত বয়ে আনছে। সর্বশেষ এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষার ফলাফলে দেখা গেছে, প্রায় অর্ধেক শিক্ষার্থী ফেল করেছে, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বনিম্ন পাসের হার। এই পরিস্থিতি লাখ লাখ শিক্ষার্থী ও অভিভাবকের জীবনে নিদারুণ মর্মবেদনা ও সামাজিক অসম্মানের কারণ হয়েছে।
আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে পাবলিক পরীক্ষাগুলো প্রশ্নপত্র ফাঁস ও গণহারে জিপিএ ৫ প্রাপ্তির তামাশায় পরিণত হয়েছিল। ২০২১ সালে এইচএসসি পরীক্ষায় পাসের হার ছিল ৯৫ শতাংশ এবং ১ লাখ ৮৯ হাজার শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পেয়েছিল। ২০২২ সালে পাসের হার ছিল ৮৬ শতাংশ এবং ১ লাখ ৭৬ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়। এর বিপরীতে, ২০২৪ সালের জুলাই বিপ্লবের পর এসএসসি ও এইচএসসি উভয় পরীক্ষায় পাসের হার ও জিপিএ ব্যাপকভাবে কমতে শুরু করে।
এ বছর এইচএসসি ও সমমানের পরীক্ষায় ১২ লাখ ৪০ হাজার শিক্ষার্থী অংশ নিলেও ৫ লাখ ৯৪ হাজার শিক্ষার্থী ফেল করেছে। সারা দেশে গড় পাসের হার মাত্র ৫২ শতাংশ, এবং জিপিএ পেয়েছে মাত্র ৪০ হাজার ৮৪ জন শিক্ষার্থী। এই ফলাফলকে অনেকে শিক্ষার স্বাভাবিক চিত্র বললেও, এর পেছনে শিক্ষা খাতের নতুন অনেক নৈরাজ্যকর চিত্র সামনে এসেছে।
সর্বশেষ এসএসসি পরীক্ষার ফল প্রকাশের পর খাতা মূল্যায়নের আবেদনের কারণে তিন হাজার নতুন শিক্ষার্থী জিপিএ ৫ পায়, যা খাতা মূল্যায়নে ব্যাপক অনিয়ম ও অবহেলার প্রমাণ দেয়। এমনকি, চায়ের দোকানে বসে খাতা মূল্যায়নের মতো ঘটনাও হাতেনাতে ধরা পড়েছে।
এবারের এইচএসসি পরীক্ষা পূর্ণ সিলেবাসে এবং সমন্বিত প্রশ্নপত্রে অনুষ্ঠিত হয়, যা ছিল অত্যন্ত কঠিন। বিশেষ করে বিজ্ঞান বিভাগের প্রশ্নপত্র বুয়েটের ভর্তি পরীক্ষার সঙ্গে তুলনীয় ছিল। এছাড়া, বিভিন্ন প্রশ্নপত্রে ভুল ও অসংগতি থাকায় শিক্ষার্থীরা বিভ্রান্তি ও ক্ষতির শিকার হয়। পদার্থবিজ্ঞানে দুটি প্রশ্নে ভুলের কারণে পূর্ণ নম্বর দেওয়া হলেও, যারা ভুল বুঝতে পেরে উত্তর পরিবর্তন করেছিল, তারা কোনো সুবিধা পায়নি, বরং ক্ষতির শিকার হয়েছে।
বর্ষাকালে ভারী বৃষ্টি ও জলাবদ্ধতার কারণে পরীক্ষা স্থগিত রাখার শিক্ষার্থীদের আবেদন সত্ত্বেও শিক্ষা মন্ত্রণালয় অনমনীয় ছিল। তবে, এতসব সমস্যা ও অব্যবস্থাপনার পরও খাতা মূল্যায়নে নমনীয় নীতি অবলম্বন করা হয়নি।
পরীক্ষাব্যবস্থার সার্বিক অব্যবস্থাপনা ও অযোগ্যতার বলি হয়েছেন শিক্ষার্থীরা। দুই লাখ ৯৮ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী এক বিষয়ে এবং চার লাখ ২২ হাজারের বেশি শিক্ষার্থী দুই বিষয়ে ফেল করেছে। শিক্ষামন্ত্রী দুই বিষয় পর্যন্ত ফেল করা শিক্ষার্থীদের পুনরায় পরীক্ষার সুযোগ দেওয়ার কথা বললেও, এই ফেলের কলঙ্ক ও সামাজিক অসম্মানের দায়ভার কে নেবে, তা প্রশ্নবিদ্ধ।
পুনঃপরীক্ষার সুযোগ পেলেও, দুই বিষয় পর্যন্ত ফেল করা শিক্ষার্থীরা বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় অংশ নিতে পারবে না, কারণ অনেক বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তির আবেদন প্রক্রিয়া পুনঃপরীক্ষার ফল প্রকাশের আগেই শেষ হয়ে যাবে। ফেল করা শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি প্রস্তুতির জন্য কোচিংয়ে ভর্তি হলেও, এখন তাদের সবকিছু বাদ দিয়ে পুনঃপরীক্ষার প্রস্তুতি নিতে হচ্ছে, যা তাদের বঞ্চনা, ভোগান্তি ও আর্থিক ক্ষতির কারণ হচ্ছে।
এইচএসসি পরীক্ষা শিক্ষার্থীর জীবনের একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়। এই পরীক্ষার ওপর নির্ভর করে অনেক শিক্ষার্থীর ভবিষ্যৎ। বর্তমান উচ্চ বাজারদরের জীবনে অভিভাবকদের এই পর্যায় পর্যন্ত শিক্ষার্থীদের টেনে আনতে যে ত্যাগ স্বীকার করতে হয়, তা নীতিনির্ধারকদের ভাবা উচিত।
শিক্ষাব্যবস্থায় অবিলম্বে আমূল সংস্কার আনা অপরিহার্য। উপযুক্ত শিক্ষা ও পরীক্ষাব্যবস্থা প্রণয়ন করতে পারলে শিক্ষার্থীদের ফেল করার সংস্কৃতি থেকে বের করে আনা সম্ভব। একটি পরীক্ষা জীবনের সফলতা ও ব্যর্থতার মাপকাঠি হতে পারে না। বর্তমান শিক্ষা ও পরীক্ষা ব্যবস্থা তরুণ প্রজন্মের মেধা ও যোগ্যতা সঠিকভাবে মূল্যায়ন করতে চূড়ান্তরূপে ব্যর্থ।
এইচএসসি পরীক্ষায় ফেল করা অনেক শিক্ষার্থীর মেধা ও যোগ্যতা পাস করা অনেক শিক্ষার্থীর চেয়ে কম নয়। কিন্তু একটি পদ্ধতির মাধ্যমে সবার মেধা মাপার ব্যবস্থা ন্যায্য নয়। জরুরি ভিত্তিতে এমন একটি ব্যবস্থা উদ্ভাবন করা দরকার, যেখানে ফেল করার সংস্কৃতি থাকবে না। শিক্ষার অন্যতম লক্ষ্য হলো শিক্ষার্থীদের প্রতিভার বিকাশ ঘটানো এবং তাদের সক্ষমতা অনুযায়ী গড়ে তোলা। কিন্তু বর্তমান ব্যবস্থা কিছু শিক্ষার্থীকে সফল এবং অনেককে ব্যর্থ হিসেবে চিহ্নিত করে তরুণদের মেধার অকালমৃত্যু ঘটাচ্ছে।
একই সঙ্গে, শিক্ষাব্যবস্থাকে শিশুদের শারীরিক ও মানসিক নির্যাতন থেকে বের করে আনতে হবে। পাঠ্যপুস্তক থেকে শুরু করে পরীক্ষাব্যবস্থাসহ গোটা শিক্ষাব্যবস্থা ঢেলে সাজানো প্রয়োজন।

















