বিশ্বকাপ ফুটবল কেবল একটি টুর্নামেন্ট নয়, বরং বিশ্বের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ ক্রীড়া আসর। চার বছর পরপর আয়োজিত এই প্রতিযোগিতায় শিরোপা জয়ের স্বপ্ন নিয়ে মাঠে নামে বিশ্বের সেরা দলগুলো। তবে ফুটবলপ্রেমীদের আগ্রহ শুধু মাঠের লড়াইয়ে সীমাবদ্ধ নয়, বরং বিশ্বকাপের ট্রফি ও ব্যক্তিগত পুরস্কারগুলোর পেছনের ইতিহাস ও নির্মাণপ্রক্রিয়া নিয়েও রয়েছে ব্যাপক কৌতূহল। অনেকের ধারণা, ট্রফি বা চ্যাম্পিয়নদের পদক খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি, তবে বাস্তবে বিষয়টি ভিন্ন।
১৯৩০ সালে উরুগুয়েতে প্রথম বিশ্বকাপের ট্রফি হিসেবে চালু হয় ‘জুলে রিমে ট্রফি’। ফিফার তৎকালীন সভাপতি জুলে রিমের নামানুসারে এর নামকরণ করা হয়। ফরাসি ভাস্কর আবেল লাফ্ল্যুরের নকশায় তৈরি এই ট্রফিতে গ্রিক দেবী নাইকির ভাস্কর্য ছিল। ৩৫ সেন্টিমিটার উঁচু ও ৩ দশমিক ৮ কেজি ওজনের এই ট্রফিটি ছিল স্বর্ণমণ্ডিত রূপার তৈরি। ফিফার নিয়ম ছিল, কোনো দেশ তিনবার বিশ্বকাপ জিতলে ট্রফিটি চিরস্থায়ীভাবে তাদের কাছে থাকবে। ১৯৭০ সালে ব্রাজিল তৃতীয়বার শিরোপা জিতে ট্রফিটি নিজেদের করে নেয়। তবে দুর্ভাগ্যবশত ১৯৮৩ সালে রিও ডি জেনিরোতে ব্রাজিল ফুটবল ফেডারেশনের সদর দপ্তর থেকে এটি চুরি হয়ে যায়, যা আজও উদ্ধার করা সম্ভব হয়নি। তদন্তকারীদের ধারণা, ট্রফিটি গলিয়ে ফেলা হয়েছে।
জুলে রিমে ট্রফি ব্রাজিলের দখলে চলে যাওয়ার পর ফিফা নতুন ট্রফি তৈরির সিদ্ধান্ত নেয়। বিশ্বের বিভিন্ন দেশের শিল্পীদের জমা দেওয়া শতাধিক নকশা থেকে ইতালির ভাস্কর সিলভিও গাজ্জানিগার নকশাটি নির্বাচিত হয়। ১৯৭৪ সাল থেকে এই ট্রফিটি ব্যবহৃত হচ্ছে। বর্তমানে ট্রফিটির উচ্চতা ৩৬ দশমিক ৮ সেন্টিমিটার এবং ওজন ৬ দশমিক ১৭৫ কেজি। এটি ১৮ ক্যারেট সোনা দিয়ে তৈরি, যেখানে প্রায় ৫ কেজির মতো সোনা ব্যবহৃত হয়েছে। ট্রফিটি সম্পূর্ণ কঠিন নয়, বরং ভেতরটা ফাঁপা। কারণ পুরো ট্রফি খাঁটি সোনা দিয়ে তৈরি করলে এর ওজন ৭০ থেকে ৮০ কেজির বেশি হতো, যা বহন করা অসম্ভব। ট্রফির নিচের অংশে দুটি সবুজ ম্যালাকাইট পাথরের স্তর রয়েছে, যা এর সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে।
বিশ্বকাপ ট্রফি তৈরির প্রক্রিয়া অত্যন্ত গোপনীয় এবং সূক্ষ্ম। প্রথমে মোমের মডেলে ছাঁচ তৈরি করে ধাতু ঢালাই করা হয়, এরপর নিখুঁতভাবে পালিশ করা হয়। যদিও ট্রফির বাজারমূল্য কয়েক লাখ মার্কিন ডলারের মতো সোনার দামের ওপর ভিত্তি করে নির্ধারিত হতে পারে, তবে ঐতিহাসিক গুরুত্বের কারণে নিলামে এর দাম দুই থেকে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার ছাড়িয়ে যেতে পারে। তবে ফিফা কখনোই আসল ট্রফি নিলামে তোলে না। ফাইনাল শেষে বিজয়ী অধিনায়ক যে ট্রফিটি উঁচিয়ে ধরেন সেটিই আসল ট্রফি, কিন্তু আনুষ্ঠানিকতা শেষে সেটি ফিফার কাছেই ফিরে যায়। পরবর্তীতে চ্যাম্পিয়ন দলকে আসল ট্রফির একটি অনুমোদিত স্বর্ণমণ্ডিত প্রতিরূপ দেওয়া হয়।
বিশ্বকাপে দলগত সাফল্যের পাশাপাশি ব্যক্তিগত নৈপুণ্য স্বীকৃতির পাশাপাশি ব্যক্তিগত পুরস্কারের ব্যবস্থাও রয়েছে। এর মধ্যে গোল্ডেন বল, গোল্ডেন বুট, গোল্ডেন গ্লাভস, সেরা উদীয়মান খেলোয়াড় এবং ফেয়ার প্লে পুরস্কার অন্যতম। এই পুরস্কারগুলোর নামে ‘গোল্ডেন’ থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রেই এগুলো ব্রাস বা ব্রোঞ্জের ওপর সোনার প্রলেপ দিয়ে তৈরি। এছাড়া চ্যাম্পিয়ন দলের খেলোয়াড়দের দেওয়া স্বর্ণপদকগুলোও সাধারণত রূপার ওপর সোনার প্রলেপযুক্ত। অত্যন্ত কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থার মধ্যে রাখা এই ট্রফিটি ফিফার অনুমতি ছাড়া স্পর্শ করার সুযোগ নেই। এই ট্রফি কেবল ফুটবল শ্রেষ্ঠত্বের প্রতীকই নয়, এটি কোটি কোটি মানুষের আবেগ ও বিশ্ব ফুটবলের শতবর্ষী ঐতিহ্যের বহিঃপ্রকাশ।
তবে ক্রীড়া ইতিহাসবিদ ও নিলাম বিশেষজ্ঞদের মতে, যদি কখনো এটি বৈধভাবে নিলামে তোলা হতো, তাহলে এর মূল্য দুই থেকে আড়াই কোটি মার্কিন ডলার (বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ২৫০ থেকে ৩০০ কোটি টাকা বা তারও বেশি) ছাড়িয়ে যেতে পারে।

















