চট্টগ্রামের আনোয়ারায় শুরু হতে যাচ্ছে বহু প্রতীক্ষিত চীনা অর্থনৈতিক ও শিল্পাঞ্চলের নির্মাণকাজ। প্রায় এক দশক অপেক্ষার পর গত সোমবার এই প্রকল্পের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করা হয়েছে। বাংলাদেশ বিনিয়োগ উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (বিডা) হিসাব অনুযায়ী, ৭৮৩ একর জমিতে গড়ে উঠতে যাওয়া এই শিল্পাঞ্চলে প্রায় ১৩০ কোটি মার্কিন ডলার বা দেশীয় মুদ্রায় প্রায় ১৬ হাজার কোটি টাকার বিনিয়োগ আসতে পারে। এই প্রকল্পের মাধ্যমে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে এক লাখের বেশি মানুষের কর্মসংস্থানের বিশাল সুযোগ তৈরি হবে বলে আশা করা হচ্ছে।
এই বিশেষ অর্থনৈতিক অঞ্চলের অন্যতম বড় সুবিধা হলো এর ভৌগোলিক অবস্থান। এর উত্তরে রয়েছে চট্টগ্রাম বন্দর, সামনে কর্ণফুলী টানেল ও শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর এবং দক্ষিণে নির্মাণাধীন মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর। কর্ণফুলী টানেল হয়ে চট্টগ্রামের আনোয়ারার সঙ্গে চট্টগ্রাম বন্দরের সরাসরি যোগাযোগ ইতিমধ্যে তৈরি হয়েছে। এছাড়া, আনোয়ারা থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়া হয়ে মাতারবাড়ী পর্যন্ত নতুন সড়ক নির্মাণের প্রকল্প বাস্তবায়িত হলে এই শিল্পাঞ্চলটি সরাসরি সমন্বিত পণ্য পরিবহনব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত হবে। তবে ব্যবসায়ীরা মনে করছেন, কেবল মানচিত্রে কাছাকাছি থাকলেই শিল্পায়ন সম্ভব নয়; এর জন্য প্রয়োজন নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস, বিদ্যুৎ, পানি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ও দ্রুত বিনিয়োগ সেবা নিশ্চিত করা।
২০১৬ সালে চীনের প্রেসিডেন্ট সি চিন পিংয়ের ঢাকা সফরের সময় এই অর্থনৈতিক অঞ্চল প্রতিষ্ঠার সমঝোতা স্মারক সই হয়েছিল। তবে ডেভেলপার নির্বাচন ও অর্থায়ন জটিলতায় প্রকল্পটি দীর্ঘ সময় আটকে থাকে। প্রথমে চায়না হারবার ইঞ্জিনিয়ারিং কোম্পানিকে ডেভেলপার করার কথা থাকলেও পরে ২০২২ সালে চীন সরকার চায়না রোড অ্যান্ড ব্রিজ করপোরেশনকে (সিআরবিসি) মনোনীত করে। গত জুনে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমানের চীন সফরের সময় বেজা ও সিআরবিসির মধ্যে চূড়ান্ত চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এর আগে ১৬ জুন একনেক এই অঞ্চলের সহায়ক অবকাঠামো নির্মাণে ৪ হাজার ১৮৯ কোটি ৪৬ লাখ টাকার প্রকল্প অনুমোদন করে, যার মধ্যে সরকার দেবে ১ হাজার ৭২২ কোটি টাকা এবং বাকি ২ হাজার ৪৬৭ কোটি টাকা আসবে বিদেশি ঋণ থেকে। প্রকল্পের আনুষ্ঠানিক বাস্তবায়নকাল শুরু হবে আগামী বছরের জানুয়ারিতে এবং লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী ২০৩১ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে অবকাঠামো নির্মাণ শেষ হবে।
প্রকল্পটির আওতায় ব্যাপক অবকাঠামোগত উন্নয়ন করা হবে। এর মধ্যে রয়েছে ২০ হাজার ডেডওয়েট টন সক্ষমতার জাহাজ ভেড়ানোর জন্য একটি বহুমুখী জেটি, ১ হাজার ২৩৫ মিটার দীর্ঘ জেটি সংযোগ সড়ক, একটি সেতু এবং ১ হাজার ১৮১ মিটার দীর্ঘ চার লেনের সড়ক। এছাড়া শিল্পবর্জ্য ব্যবস্থাপনার জন্য প্রতিদিন আড়াই কোটি লিটার তরল বর্জ্য শোধনক্ষম কেন্দ্রীয় শোধনাগার (সিইটিপি), গ্যাস সঞ্চালন লাইন, দুটি বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র, পানি সংরক্ষণাগার, কঠিন বর্জ্য সংগ্রহ কেন্দ্র এবং প্রায় ১২ কিলোমিটার দীর্ঘ সীমানাপ্রাচীর নির্মাণ করা হবে। বাংলাদেশ অর্থনৈতিক অঞ্চল কর্তৃপক্ষ (বেজা) প্রথম তিন বছরের মধ্যে অন্তত ৬০ শতাংশ প্লট কারখানা নির্মাণের উপযোগী করার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে, যাতে ২০৩০ সালের মধ্যে এখানে উৎপাদন শুরু করা যায়।
ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন অনুষ্ঠানে অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী জানান, এই শিল্পাঞ্চলে শেষ পর্যন্ত ১০০ কোটি ডলারের বেশি বিনিয়োগ আসবে, যা পুরো দক্ষিণ চট্টগ্রামের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব ফেলবে। অন্যদিকে, কর্ণফুলী টানেল চালুর পর মিরসরাই থেকে আনোয়ারা হয়ে কক্সবাজার পর্যন্ত একটি নতুন শিল্প করিডর গড়ে ওঠার সম্ভাবনা তৈরি হয়েছে। এই করিডরের অংশ হিসেবে আনোয়ারা থেকে চন্দনাইশ পর্যন্ত সড়ক চার লেনে উন্নীত করা এবং আনোয়ারার কালাবিবির দিঘি থেকে বাঁশখালী ও পেকুয়ার টইটং হয়ে কক্সবাজারের মাতামুহুরী পর্যন্ত ৫৮ কিলোমিটার মহাসড়ক প্রশস্ত করার কাজ চলছে। মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দর ২০৩০ সালের মধ্যে চালু হলে এবং ২০৩১ সালে এই অর্থনৈতিক অঞ্চলের কাজ শেষ হলে এই দুটি গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো পরস্পরের সঙ্গে যুক্ত হবে। নিজস্ব বহুমুখী জেটি থাকায় কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য নদীপথে আনা-নেওয়া যাবে, ফলে সড়কের ওপর পুরোপুরি নির্ভর করতে হবে না।
ব্যবসায়ীদের মতে, এই শিল্পাঞ্চলের কারখানাগুলো চালু হলে কাঁচামাল ও প্রস্তুত পণ্য পরিবহনে কর্ণফুলী টানেলের ব্যবহারও উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে, যা বর্তমানে প্রত্যাশিত মাত্রায় হচ্ছে না। এ বিষয়ে চট্টগ্রাম চেম্বারের সভাপতি আমিরুল হক বলেন, বন্দরের কাছাকাছি অবস্থান এই শিল্পাঞ্চলের সবচেয়ে বড় সুবিধা। তবে শুরুতে এমন শিল্প স্থাপনে জোর দেওয়া উচিত যেগুলোতে গ্যাসের প্রয়োজন হয় না। অবকাঠামো ও সেবা সময়মতো নিশ্চিত করা গেলে এটি চট্টগ্রাম বন্দর, টানেল ও মাতারবাড়ী গভীর সমুদ্রবন্দরকে ঘিরে গড়ে ওঠা সম্ভাব্য শিল্প করিডরের একটি গুরুত্বপূর্ণ কেন্দ্র হয়ে উঠতে পারে।

















