ইতালিতে পাঠানোর প্রলোভন দেখিয়ে লিবিয়ায় নিয়ে জিম্মি করার মাধ্যমে মুক্তিপণ আদায়কারী একটি শক্তিশালী মানব পাচারকারী চক্রের সন্ধান পেয়েছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। নড়াইল জেলার কালিয়া উপজেলার সাতবাড়িয়া গ্রামের আলাউদ্দিন শেখ ও আওয়াল ফরাজীসহ ৩৪ জনের বিরুদ্ধে গত ১৩ এপ্রিল সিআইডি একটি মামলা দায়ের করেছে। তদন্তে দেখা গেছে, এই চক্রটি গত পাঁচ বছরে বিভিন্ন ব্যাংক হিসাবের মাধ্যমে ৩৭৬ কোটি ৫০ লাখ টাকার বেশি লেনদেন করেছে। চক্রটি দেশের ১১ জেলায় সক্রিয় রয়েছে এবং মুক্তিপণের টাকায় সদস্যরা বিলাসবহুল বাড়ি, গাড়ি ও গরুর খামারসহ অঢেল সম্পদের মালিক হয়েছেন।
তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির তথ্য অনুযায়ী, আলাউদ্দিন শেখ ১২ বছর আগে লিবিয়ায় যান এবং পরে আওয়াল ফরাজীর সঙ্গে মিলে মানব পাচার নেটওয়ার্ক গড়ে তোলেন। তাঁরা লিবিয়ায় ভুক্তভোগীদের আটকে রেখে শারীরিক নির্যাতনের ভিডিও পরিবারের কাছে পাঠিয়ে লাখ লাখ টাকা মুক্তিপণ আদায় করতেন। এই মুক্তিপণের টাকা এবং হুন্ডি কারবারের অর্থ চক্রের অন্তত ১১৪টি ব্যাংক হিসাবে লেনদেন করা হয়েছে। অর্থের প্রকৃত উৎস গোপন রাখতে গৃহিণী, মুদি দোকানদার ও ওষুধের দোকানদারের মতো সাধারণ মানুষের ব্যাংক হিসাব ব্যবহার করা হয়েছে, যেখানে প্রতি লাখে ৫০০ থেকে ১০০০ টাকা কমিশন দেওয়া হতো। সিআইডি এ পর্যন্ত ১৮টি নামসর্বস্ব ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান শনাক্ত করেছে, যা ট্রেড লাইসেন্স ব্যবহার করে হুন্ডির কাজে ব্যবহৃত হতো।
ভুক্তভোগীদের অভিযোগ অনুযায়ী, গোপালগঞ্জের এক পরিবার ইতালি যাওয়ার জন্য ৯০ লাখ টাকার চুক্তি করেছিল, কিন্তু তাদের লিবিয়ায় আটকে রেখে নির্যাতনের মুখে আরও ৭৫ লাখ টাকা মুক্তিপণ দিতে বাধ্য করা হয়। ব্র্যাক মাইগ্রেশন প্রোগ্রামের তথ্যমতে, লিবিয়ায় শতাধিক ক্যাম্পে বাংলাদেশিদের জিম্মি করে ৫ থেকে ৭৬ লাখ টাকা পর্যন্ত মুক্তিপণ আদায় করা হয়। লিবিয়া থেকে ফেরত আসা ৫৫৭ জনের ওপর করা গবেষণায় দেখা গেছে, তাদের ৮৯ শতাংশই কোনো কাজ পাননি এবং ৬৩ শতাংশ পথেই বন্দী হয়েছিলেন।
সরেজমিনে আলাউদ্দিন শেখের বাড়িতে গিয়ে দেখা যায়, সেখানে সিসিটিভি ক্যামেরা ও উঁচু সীমানাপ্রাচীর রয়েছে এবং বাড়ির পাশে একাধিক গরুর খামার নির্মাণ করা হয়েছে। আলাউদ্দিনের বাবা আলী শেখ জানান, ছেলে বিদেশ যাওয়ার পর থেকেই তাদের অবস্থার পরিবর্তন হয়েছে। তবে তিনি দাবি করেন, আলাউদ্দিন লিবিয়ায় ঠিকাদারি করতেন এবং ওই টাকা তাঁর ব্যাংক হিসাবে আসত। অন্যদিকে, আওয়াল ফরাজীর মা হারিচা বেগম জানান, তাঁর ছেলে আওয়াল এখন আত্মগোপনে আছেন এবং তাঁর ভাই রাব্বানী ফরাজী গ্রেপ্তার হওয়ার পর থেকে বাকিরা খুলনায় অবস্থান করছেন। সিআইডির ফিন্যান্সিয়াল ক্রাইম বিভাগের অতিরিক্ত ডিআইজি মুহাম্মদ বাছির উদ্দিন জানিয়েছেন, চক্রের সদস্যদের অবৈধ সম্পদের বিষয়ে অনুসন্ধান চলমান রয়েছে এবং তদন্ত শেষে আরও ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের সম্পৃক্ততা বেরিয়ে আসতে পারে।

















