ছাত্র-জনতার গণ-অভ্যুত্থানের মুখে গত ২০২৪ সালের এই দিনে ক্ষমতাচ্যুত হয়ে ভারতে আশ্রয় নিয়েছিলেন তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। আওয়ামী লীগের দীর্ঘ সাড়ে পনেরো বছরের শাসনের অবসানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে প্রথমবারের মতো তিনি জনসমক্ষে আসার ঘোষণা দিয়েছেন। ভারতের একটি গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, নয়াদিল্লিতে আজ সন্ধ্যায় একটি ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানে তার বক্তব্য দেওয়ার কথা রয়েছে, যেখানে তিনি নিজের ভবিষ্যৎ রাজনৈতিক রোডম্যাপ ও দেশে ফেরার পরিকল্পনা নিয়ে কথা বলতে পারেন। তবে মানবতাবিরোধী অপরাধে দণ্ডিত আসামির এ ধরনের বক্তব্যের ঘোষণায় দেশজুড়ে তীব্র আলোচনা ও কৌতূহল সৃষ্টি হয়েছে।
শেখ হাসিনার এই বক্তব্যের বিষয়ে ঢাকা আগে থেকেই ভারতের কাছে নিজেদের অস্বস্তির কথা জানিয়ে দিয়েছে। গত সোমবার প্রধানমন্ত্রীর পররাষ্ট্রবিষয়ক উপদেষ্টা হুমায়ুন কবিরের সঙ্গে ভারতের হাইকমিশনার দীনেশ ত্রিবেদীর সৌজন্য সাক্ষাতে বিষয়টি স্পষ্টভাবে তুলে ধরা হয়। সেখানে বলা হয়, নিষিদ্ধ সংগঠনের কোনো ব্যক্তি যেন ভারতের ভূখণ্ড ব্যবহার করে রাজনৈতিক বক্তব্য দিতে না পারে বা বাংলাদেশের অভ্যন্তরে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টির কোনো কর্মকাণ্ড না চালায়। পররাষ্ট্র উপদেষ্টা এ বিষয়ে ভারতের সহযোগিতা চেয়ে সতর্ক করেন যে, এ ধরনের কার্যক্রম দুই দেশের দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ইতিবাচক অগ্রগতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
ভারতের গণমাধ্যম ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, নয়াদিল্লির ‘ফরেন করেসপন্ডেন্টস ক্লাব অব সাউথ এশিয়া’ (এফসিসি সাউথ এশিয়া) আজ বাংলাদেশ সময় সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত একটি মতবিনিময় সভার আয়োজন করেছে। এতে শেখ হাসিনা ভার্চুয়ালি যুক্ত হওয়ার কথা রয়েছে। আলোচকদের তালিকায় তার ছেলে সজীব ওয়াজেদ জয়, সাবেক শিক্ষামন্ত্রী মহিবুল হাসান চৌধুরী নওফেল এবং সাবেক সংসদ সদস্য সাকিব আল হাসানের নামও রয়েছে। আয়োজক সংগঠনের সভাপতি ওয়ায়েল আউয়াদের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সরাসরি সম্প্রচারের কথা জানানো হয়েছে।
এ বিষয়ে পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ এক প্রেস ব্রিফিংয়ে বলেন, পলাতক সাবেক প্রধানমন্ত্রী ভারতে বসে রাজনৈতিক বক্তব্য দেবেন কি না, সে বিষয়ে ভারত সরকারকেই তাদের অবস্থান স্পষ্ট করতে হবে। বাংলাদেশ সরকার ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্ককে ইতিবাচক পথে এগিয়ে নিতে চায় এবং কোনো কর্মকাণ্ডই যেন সেই সম্পর্কে নেতিবাচক প্রভাব না ফেলে, সেটিই প্রত্যাশা। সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবিরও একই সুর টেনে বলেন, প্রতিবেশী হিসেবে দুই দেশের স্বাভাবিক সম্পর্ক যাতে ক্ষতিগ্রস্ত না হয়, সেদিকে ভারতের লক্ষ্য রাখা উচিত।
জাতীয় অধ্যাপক ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ মাহবুব উল্লাহর মতে, ভারতকে আশ্রয় দেওয়া শেখ হাসিনাকে এ ধরনের সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের ওপর নির্লজ্জ হস্তক্ষেপের শামিল। তিনি বলেন, অভ্যুত্থানের সময় প্রায় ২৪০০ মানুষ নিহত ও হাজার হাজার মানুষ আহত হয়েছেন। এমন পরিস্থিতিতে একজন দণ্ডিত আসামিকে বক্তব্য দেওয়ার সুযোগ দেওয়া বাংলাদেশে রাজনৈতিক অস্থিরতা তৈরির অপচেষ্টা হিসেবে গণ্য হবে। অন্যদিকে, আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক ড. ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, এ ধরনের বক্তব্য দুই দেশের আনুষ্ঠানিক ও অনানুষ্ঠানিক বাণিজ্যে বড় কোনো প্রভাব ফেলবে না, কারণ দুই দেশের মানুষের রুটি-রুজির জায়গাটি এখনো স্থিতিশীল রয়েছে। এখন দেখার বিষয়, ঢাকার আপত্তির মুখে দিল্লি শেষ পর্যন্ত কোনো হস্তক্ষেপ করে কি না। এর আগে রয়টার্স ও কিয়োডো নিউজকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে হাসিনা ডিসেম্বরে দেশে ফেরার কথা জানিয়েছিলেন।

















