২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় দিন, যা আন্দোলনকারীদের কাছে ‘৩৬ জুলাই’ নামে পরিচিত। এদিন দীর্ঘসময় ক্ষমতায় থাকা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার পতন ঘটে এবং তিনি তার ছোট বোন শেখ রেহানাকে নিয়ে দেশ ছেড়ে ভারতে পালিয়ে যান। এই ঘটনা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে এক নতুন ধারার সূচনা করে, যার পথ ধরে অন্তর্বর্তী সরকারের রূপরেখা তৈরি হয় এবং রাষ্ট্র সংস্কারের সম্ভাবনা দেখা দেয়। বর্তমানে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা দিল্লিতে অবস্থান করছেন, আর জুলাই আন্দোলনে নির্বিচারে মানুষ হত্যার দায়ে আওয়ামী লীগের শীর্ষ নেতাদের বিরুদ্ধে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে বিচারকার্য চলছে।
ওই দিন সকাল থেকেই ঢাকামুখী ‘মার্চ টু ঢাকা’ কর্মসূচি সফল করতে লাখো মানুষ রাজপথে নেমে আসে। কারফিউ ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর যুদ্ধংদেহী মনোভাব উপেক্ষা করে ছাত্র-জনতা যাত্রাবাড়ী, সায়েদাবাদ ও উত্তরাসহ বিভিন্ন প্রবেশপথ দিয়ে ঢাকায় প্রবেশ করে। বেলা ১১টার দিকে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে বিক্ষোভকারীরা জমায়েত হতে শুরু করলে পুলিশ নির্বিচারে গুলি চালায়। ইন্টারনেট বন্ধ থাকা সত্ত্বেও ছাত্র-জনতা ব্যারিকেড ভেঙে গণভবনের দিকে এগিয়ে যেতে থাকে। দুপুর ১২টার দিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নিষ্ক্রিয়তা এবং সেনাসদস্যদের সরে যাওয়ার খবর ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি দ্রুত বদলাতে থাকে। দুপুর ২টা ৩৫ মিনিটে কঠোর নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে বিমানবাহিনীর হেলিকপ্টারে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা ভারতের আগরতলার উদ্দেশে রওনা হন। একই সময় ধানমন্ডির রাজনৈতিক কার্যালয় ও সুধা সদন থেকে বিজিবি ও পুলিশ সদস্যরা সরে যান।
বিকাল ৪টায় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জাতির উদ্দেশে ভাষণে শেখ হাসিনার পদত্যাগের বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন এবং অন্তর্বর্তী সরকার গঠনের ঘোষণা দেন। এই খবরে সারা দেশে ছাত্র-জনতার মধ্যে বাঁধভাঙা উচ্ছ্বাস ছড়িয়ে পড়ে। হাসিনাপুত্র সজীব ওয়াজেদ জয় বিবিসিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে জানান, মা শেখ হাসিনা পরিবারের অনুরোধে এবং নিরাপত্তার খাতিরেই দেশত্যাগ করেছেন। এদিকে প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগের খবর ছড়িয়ে পড়ার পর উত্তেজিত জনতা প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, গণভবন ও জাতীয় সংসদ ভবনে প্রবেশ করে। সেখানে তারা সরকার পতনের উৎসবে মেতে ওঠে এবং বিভিন্ন স্থাপনায় ছবি তোলে।
কোটা সংস্কার আন্দোলন থেকে শুরু হওয়া এই গণ-অভ্যুত্থান তৎকালীন সরকারের দমন-পীড়নের বিরুদ্ধে সাধারণ মানুষের চূড়ান্ত বিজয় হিসেবে গণ্য হয়। শুরুতে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনকে তাচ্ছিল্য করা এবং তাদের ‘রাজাকার’ বা ‘সন্ত্রাসী’ হিসেবে আখ্যায়িত করার পরিণামই ছিল এই সরকার পতন। পরবর্তীতে ড. মুহাম্মদ ইউনূসের নেতৃত্বে গঠিত অন্তর্বর্তী সরকারের অধীনে ১২ ফেব্রুয়ারি ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও জুলাই সনদের ওপর গণভোট অনুষ্ঠিত হয়, যেখানে বিএনপি নিরঙ্কুশ জয় পায়।

















