গতকাল বুধবার প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান রাজধানীর শেরেবাংলা নগরে পুরাতন গণভবনে অবস্থিত ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’-এর ফলক উন্মোচন করে এর দ্বার উন্মোচন করেছেন। হাজারো প্রাণের বিনিময়ে দুনিয়া কাঁপানো ‘বাংলা বসন্ত’ বা ‘বর্ষা বিপ্লব’ নামে পরিচিত ২০২৪ সালের জুলাইয়ের গণঅভ্যুত্থানকে স্মৃতিময় করে রাখতে এই জাদুঘরটি গড়ে তোলা হয়েছে। ফলক উন্মোচনের পর সুরা ফাতিহা পাঠ, দোয়া ও মোনাজাত অনুষ্ঠিত হয় এবং প্রধানমন্ত্রী জাদুঘরের বিভিন্ন গ্যালারি ও প্রদর্শনী ঘুরে দেখেন। আজ বৃহস্পতিবার থেকে জাদুঘরটি সর্বসাধারণের জন্য উন্মুক্ত থাকবে।
উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস, প্রধানমন্ত্রীর মেয়ে জাইমা রহমানসহ মন্ত্রিপরিষদের সদস্যরা উপস্থিত ছিলেন। অনুষ্ঠানে জুলাই বিপ্লবের ঘটনাপ্রবাহ, গণমানুষের অংশগ্রহণ ও বিজয়ের ইতিহাসভিত্তিক একটি প্রামাণ্যচিত্রও প্রদর্শন করা হয়।
প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান বলেন, ফ্যাসিবাদমুক্ত বাংলাদেশে কেউ কেউ অহেতুক ইস্যু তৈরি করে অস্থিরতা সৃষ্টির অপচেষ্টা করছেন, যা পতিত পলাতক স্বৈরাচারের পুনরুত্থানের পথ সুগম করতে পারে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, এই জাদুঘর কোনো দল, গোষ্ঠী বা ব্যক্তির একক রাজনৈতিক ভাষ্য প্রতিষ্ঠার স্থান হবে না, কারণ ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান কোনো একক ব্যক্তি, গোষ্ঠী কিংবা দলের নয়, বরং বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের বিজয়। তিনি গণঅভ্যুত্থানে জনগণের পাশে দাঁড়ানোর জন্য সেনাবাহিনীর প্রতি কৃতজ্ঞতা এবং শহীদ পরিবারের প্রতি গভীর সমবেদনা জানান। তিনি দৃঢ়ভাবে বলেন, বাংলাদেশ আর কখনো তাঁবেদার রাষ্ট্রে পরিণত হবে না।
নোবেল বিজয়ী অধ্যাপক ড. মুহাম্মদ ইউনূস বলেন, এই জাদুঘরটি নতুন বাংলাদেশ গঠনের প্রেরণার কেন্দ্র। তিনি প্রতিটি স্কুল-কলেজের শিক্ষার্থী, তরুণ-তরুণী ও সাধারণ নাগরিককে অন্তত একবার জাদুঘরটি পরিদর্শনের আহ্বান জানান এবং সেখানে বসে নিজেদের স্বপ্ন ও প্রত্যাশা লিখে রাখার পরামর্শ দেন।
গতকাল ছিল প্রবল গণঅভ্যুত্থানের মুখে পদত্যাগ করে হাসিনার ভারতে পালিয়ে যাওয়ার দ্বিতীয় বার্ষিকী। দুবছর আগে ২০২৪ সালের ৫ আগস্ট বালির বাঁধের মতো ধসে পড়ে তার সাড়ে ১৫ বছরের স্বৈরাচারী শাসনের মসনদ। বিপ্লবীরা এই ঘটনাকে ‘৩৬ জুলাই’ বা ‘বর্ষা বিপ্লব’ বা ‘বাংলা বসন্ত’ নামে অভিহিত করেছেন। সেই বিপ্লবে তরুণ প্রাণে মাতৃভূমিকে স্বৈরশাসনমুক্ত করার অদম্য নেশা জেগেছিল, যা এত কম সময়ে এত প্রাণের ক্ষয় ঘটিয়েছে, যা ইতিহাসে বিরল। নির্বিচারে বিশ্ববিদ্যালয়, কলেজ ও স্কুল শিক্ষার্থীদের গুলি করে মারা হয়েছিল, এমনকি হেলিকপ্টার থেকেও গুলি ছুড়ে ঘরে থাকা শিশুর প্রাণ কেড়ে নেওয়া হয়েছিল। এই অমানবিক ঘটনা দেশজুড়ে কষ্ট, ক্ষোভ ও বেদনার জন্ম দেয়। পরবর্তীতে শ্রমিক, শিক্ষক, অভিভাবক, আইনজীবী, শিল্পী, সাংবাদিক, সাহিত্যিক, সংস্কৃতিকর্মী, অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তাসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ শিক্ষার্থী ও তরুণদের বৈষম্যহীন সমাজ ও রাষ্ট্র গড়ার আন্দোলনে যোগ দেন। এই গণঅভ্যুত্থানের ঘটনাগুলোকে স্মৃতিময় করে রাখতেই অন্তর্বর্তী সরকার গণভবনটিকে জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘরে রূপান্তর করে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের পঞ্চম বৈঠকে (২) গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এরপর বিভিন্ন উপদেষ্টা ও কমিটি গণভবন পরিদর্শন এবং জাদুঘর বাস্তবায়নে কাজ করে। অন্তর্বর্তী সরকারের সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা মোস্তফা সরয়ার ফারুকী এটি তৈরিতে বিশেষ ভূমিকা পালন করেন। তিনি জানান, প্রধানমন্ত্রী তার কমিটমেন্ট রক্ষা করে জাদুঘরটি উদ্বোধন করেছেন, তবে অনুষ্ঠানে জুলাই আন্দোলনের অন্য অংশীজনদের দেখতে পেলে ভালো লাগত কারণ এটি দল-মত নির্বিশেষে সবার আন্দোলন ছিল।
চব্বিশের গণঅভ্যুত্থানের স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বাসভবন গণভবনকে রূপান্তর করে গড়ে তোলা এই জাদুঘর এতদিন নানা জটিলতায় চালু করা যায়নি। অবশেষে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের দ্বিতীয় বার্ষিকীতে তা উদ্বোধন করলেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধ ছিল স্বাধীনতা অর্জনের, আর ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থান ছিল দেশ ও জনগণের স্বাধীনতা রক্ষার। একাত্তরের মুক্তিযোদ্ধাদের মানুষ যেমন ভোলেনি, তেমনি ২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের শহীদদেরও জনগণ ভুলবে না। তিনি বলেন, দীর্ঘ দেড় দশকের বেশি সময় ধরে ফ্যাসিবাদবিরোধী আন্দোলনে হাজার হাজার মানুষ গুম ও অপহরণের শিকার হয়েছিল এবং লাখ লাখ মানুষ নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা ও মিথ্যা মামলায় ঘরবাড়িছাড়া ছিল। শুধু জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানেই শহীদ হয়েছেন হাজারো ছাত্র-জনতা, নারী ও শিশু। তিনি আরও বলেন, ফ্যাসিস্ট চক্র হেলিকপ্টার থেকে গুলি করেও গণতন্ত্রকামী জনগণকে হত্যা করেছিল, যা সভ্য জগতে বিরল। এই নৃশংসতাকে শুধু স্বাধীনতা-পরবর্তী আওয়ামী লীগ সরকারের সাড়ে তিন বছরের দুঃশাসনের সঙ্গেই তুলনা চলে।
প্রধানমন্ত্রী আশা প্রকাশ করেন, এই জাদুঘর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের সামনে তাদের পূর্বসূরিদের সাহসী ইতিহাস তুলে ধরবে এবং বিতাড়িত ফ্যাসিস্টদের মুখোশ উন্মোচিত করবে। এটি বাংলাদেশের মানুষের গণতান্ত্রিক অভিযাত্রার সঙ্গে জুলাই গণঅভ্যুত্থানের সম্পর্ক এবং দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলন-সংগ্রামের ইতিহাসও সংরক্ষিত রাখবে। তিনি উল্লেখ করেন, তাদের পূর্বসূরিরা ১৯৭৫ সালে সংবিধান পরিবর্তন করে গণতন্ত্রের কবর রচনা করেছিল, পরে শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান দেশে বহুদলীয় গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করেন। এসব ইতিহাস জাদুঘরে সংরক্ষণ করা হলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম উপকৃত হবে।
অনুষ্ঠানের শুরুতে জাতীয় সংগীত পরিবেশন করা হয় এবং পবিত্র ধর্মগ্রন্থসমূহ থেকে পাঠ করা হয়। স্বাগত বক্তব্য দেন সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের সচিব কানিজ মওলা। জুলাই গণঅভ্যুত্থানে শহীদ আবদুল্লাহ বিন জাহিদের মা ফাতেমাতুজ জোহরা, শহীদ শাহরিয়ার খান আনাসের মা সানজিদা খান দীপ্তি এবং জুলাইযোদ্ধা নিশাত তাবাসসুম প্রাপ্তি আবেগঘন স্মৃতিচারণ করেন।
সংস্কৃতিমন্ত্রী নিতাই রায় চৌধুরীর সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আহমেদ আযম খান, সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী আলী নেওয়াজ মাহমুদ খৈয়ম, প্রধানমন্ত্রীর তথ্য ও সংস্কৃতিবিষয়ক উপদেষ্টা ডা. জাহেদ উর রহমান বক্তব্য দেন। এছাড়াও বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন প্রতিমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর উপদেষ্টা ও তার কার্যালয়ের মুখপাত্র মাহদী আমিন, প্রেস সচিব সালেহ শিবলী ও অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমনসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়, বিভাগ, সংসদ সদস্য, উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, কূটনীতিক, বুদ্ধিজীবী, শিক্ষাবিদ, সংস্কৃতিজন, জুলাইযোদ্ধা, শহীদ পরিবারের সদস্য, রাজনীতিক, গণমাধ্যমকর্মী ও বিশিষ্ট ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।
অতিথিরা বলেন, বাংলাদেশের ফ্যাসিবাদবিরোধী গণতান্ত্রিক সংগ্রামের ইতিহাসে এক অবিস্মরণীয় মাইলফলক জুলাই গণঅভ্যুত্থান। এই গৌরবময় স্মৃতি সংরক্ষণ, সংগ্রামের প্রকৃত ইতিহাস নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরা এবং জুলাই শহীদ ও যোদ্ধাদের আত্মত্যাগের স্মারক হিসেবে এই জাদুঘর প্রতিষ্ঠিত হয়েছে।
সংস্কৃতিবিষয়ক মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০২৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. ইউনূসের সভাপতিত্বে উপদেষ্টা পরিষদের পঞ্চম বৈঠকে গণভবনকে ‘জুলাই গণঅভ্যুত্থান স্মৃতি জাদুঘর’ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। ৭ সেপ্টেম্বর গণভবন পরিদর্শন করেন সে সরকারের তিন উপদেষ্টা নাহিদ ইসলাম, আসিফ মাহমুদ সজীব ভূঁইয়া ও আদিলুর রহমান খান।

















