খুলনা নগরবাসীর দীর্ঘদিনের সুপেয় পানির সংকট নিরসনের লক্ষ্য নিয়ে ২ হাজার ৫৫৮ কোটি টাকা ব্যয়ে বাস্তবায়ন করা হয়েছিল খুলনা পানি সরবরাহ প্রকল্প (ফেজ-১)। ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হওয়া এই মেগা প্রকল্পে অর্থায়ন করেছে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি চালুর পর থেকেই নানা বিতর্কে জড়িয়েছে। পরিশোধনের পরও পানিতে লবণ থাকা, শুষ্ক মৌসুমে পানি সরবরাহ কমে যাওয়া এবং বছরের বেশির ভাগ সময় পর্যাপ্ত পানি না পাওয়ার অভিযোগ দীর্ঘদিনের।
প্রকল্পের লক্ষ্য ছিল ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে শোধনের মাধ্যমে সরবরাহ বাড়ানো। এজন্য রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি লিটার ধারণক্ষমতার ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট, ৩৪ কিলোমিটারের বেশি ট্রান্সমিশন পাইপলাইন এবং নতুন নেটওয়ার্ক স্থাপন করা হয়। তবে বর্তমানে এই প্রকল্প থেকে দৈনিক মাত্র ৬ কোটি লিটার পানি উৎপাদিত হচ্ছে, যা লক্ষ্যমাত্রার অর্ধেক।
অনুসন্ধানে দেখা গেছে, প্রকল্পের গুরুত্বপূর্ণ ট্রান্সমিশন পাইপলাইনের একাংশ কাটাখালী খালে ভেসে উঠেছে। নিয়ম অনুযায়ী পাইপ ৫০ ফুট গভীরে বসানোর কথা থাকলেও তা মাত্র ২০ ফুট গভীরতায় স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্টের ছয়টি সাবমার্সিবেল পাম্পের তিনটিই নষ্ট থাকায় উৎপাদন ক্ষমতা অর্ধেকে নেমে এসেছে। সিস্টেম লসের কারণে উৎপাদিত পানির প্রায় ২০ শতাংশ বা প্রায় ১ কোটি ২০ লাখ লিটার পানি গ্রাহকের কাছে পৌঁছানোর আগেই হারিয়ে যাচ্ছে।
লবণচরা এলাকার বাসিন্দা মনোর হোসেন জানান, ঋতু নির্বিশেষে তারা ওয়াসার পানি পান না এবং টিউবওয়েলের ওপরই তাদের ভরসা করতে হয়। ওয়াসার বর্তমান নির্বাহী প্রকৌশলী কামাল হোসেন যন্ত্রপাতি রক্ষণাবেক্ষণে দক্ষ জনবলের অভাবকে দায়ী করেছেন। অন্যদিকে, প্রকৌশলী আরমান হোসেন জানান, বর্তমানে ৪৪-৪৫ হাজার গ্রাহককে পানি দেওয়া হচ্ছে এবং গ্রাহক বাড়লে পানি বিক্রির পরিমাণ ও আয় বাড়বে। তার দাবি, সিস্টেম লস আন্তর্জাতিক মানদণ্ড অনুযায়ীই রয়েছে।
প্রকল্পের আর্থিক চিত্রও হতাশাজনক। জাইকা ও এডিবি থেকে নেওয়া ঋণ পরিশোধের চুক্তি থাকলেও এখন পর্যন্ত এক টাকাও শোধ করা সম্ভব হয়নি। অথচ বছরে ৩০ কোটি টাকা পরিশোধের বাধ্যবাধকতা রয়েছে। বর্তমানে প্রকল্প থেকে আয় হয় মাত্র ১ কোটি ৮০ লাখ টাকা, যার বেশিরভাগই রক্ষণাবেক্ষণ ও বিদ্যুৎ বিলের পেছনে ব্যয় হয়ে যায়। সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন) খুলনার সম্পাদক কুদরত-ই-খুদা এই প্রকল্পকে ব্যর্থ আখ্যা দিয়ে তৎকালীন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদারদের যোগসাজশে লুটপাটের অভিযোগ তুলেছেন। খুলনা ওয়াসার ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. ফিরোজ শাহ জানিয়েছেন, অনিয়ম ও দুর্নীতির প্রমাণ পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
খুলনা ওয়াসা সূত্র জানিয়েছে, খুলনায় ওয়াসা একটি প্রকল্প গ্রহণ করে ২০১১ সালে। প্রকল্পটির লক্ষ্য ছিল মূলত ভূগর্ভস্থ পানির ওপর নির্ভরতা কমিয়ে ভূ-উপরিস্থ পানির ব্যবহার বাড়ানো। বাগেরহাটের মোল্লাহাট এলাকার মধুমতি নদী থেকে পানি এনে তা শোধনের মাধ্যমে নগরবাসীকে সরবরাহ করার কথা।
প্রকল্পের প্রধান কাজগুলো ছিল, মধুমতি নদীর তীরে ইনটেক ফ্যাসিলিটি স্থাপন, পানি শোধনাগার, রূপসার সামন্তসেনায় ১১ কোটি (১১০ এমএলডি) লিটার ধারণক্ষমতার বিশাল ওয়াটার ট্রিটমেন্ট প্ল্যান্ট ও ইম্পাউন্ডিং জলাধার নির্মাণ, মধুমতি নদী থেকে শোধনাগার পর্যন্ত ৩৪ কিলোমিটারের বেশি কাঁচা পানি সঞ্চালন পাইপলাইন স্থাপন, নগরীতে বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের জন্য ওভারহেড ট্যাংক বা জলাধার নির্মাণ এবং নতুন পাইপলাইন নেটওয়ার্ক স্থাপন। এই মেগা প্রকল্পটিতে অর্থায়ন করে জাপান আন্তর্জাতিক সহযোগিতা সংস্থা (জাইকা), এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংক (এডিবি) এবং বাংলাদেশ সরকার। প্রকল্পটি ২০১৯ সালের জুলাই মাসে আনুষ্ঠানিকভাবে চালু হয়। প্রকল্পটি নেওয়ার সময় দাবি করা হয়েছিল, রূপসার সামন্তসেনা পানি শোধনাগার থেকে প্রতিদিন ১১ কোটি লিটার বিশুদ্ধ পানি সরবরাহের মাধ্যমে নগরবাসীর পানির সংকট অনেকটাই দূর হবে। লক্ষ্য পূরণ তো সম্ভব হয়নি, উলটো বিপুল পরিমাণ পানি অপচয়ের অভিযোগ সামনে এসেছে।

















