পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন মসজিদে আজানের জন্য ব্যবহৃত লাউডস্পিকার অপসারণের নির্দেশ ও পুলিশের চাপের ঘটনা ঘিরে রাজ্যজুড়ে তীব্র রাজনৈতিক ও সামাজিক বিতর্ক তৈরি হয়েছে। স্থানীয় মসজিদ পরিচালনা কমিটি ও মুসলিম নেতাদের অভিযোগ, রাজ্যের পুলিশ প্রশাসন মৌখিকভাবে লাউডস্পিকার খুলে ফেলার জন্য চাপ প্রয়োগ করছে। এই বিতর্কিত পরিস্থিতির প্রেক্ষিতে তৃণমূল কংগ্রেসের এক বিদ্রোহী অংশ মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারীর কাছে বিষয়টি উত্থাপনের ঘোষণা দিয়েছে। এর আগে বৃহস্পতিবার ইউসুফ পাঠান, খলিলুর রহমান ও আবু তাহের খান—তৃণমূলের এই তিন বিদ্রোহী সাংসদ কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহর সঙ্গে সাক্ষাৎ করে একটি স্মারকলিপি জমা দিয়েছেন। স্মারকলিপিতে তারা ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাত না দিয়ে শব্দদূষণ বিধিমালা কার্যকর করার আহ্বান জানানোর পাশাপাশি ধর্মীয় স্বাধীনতা রক্ষার বিষয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেন।
রাজ্যের বিজেপি সরকার মন্ত্রিসভার প্রথম বৈঠকেই আদালতের নির্দেশনা অনুযায়ী সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে শব্দদূষণ সংক্রান্ত বিধি কঠোরভাবে কার্যকর করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই বিধি অনুযায়ী দিনের বেলায় শব্দের সর্বোচ্চ মাত্রা ৫৫ ডেসিবেল এবং রাতে ৪৫ ডেসিবেল নির্ধারণ করা হয়েছে। দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, রাজ্য পুলিশকে এই সীমা নিশ্চিত করার নির্দেশ দেওয়া হয়। এ সময় ইমামরা জানিয়েছেন যে, পুলিশ মসজিদ কমিটিকে প্রচলিত লাউডস্পিকারের পরিবর্তে সাউন্ড বক্স ব্যবহারের পরামর্শ দিচ্ছে। মুখ্যমন্ত্রী শুভেন্দু অধিকারী সরকারের পদক্ষেপের পক্ষে অবস্থান নিয়ে দাবি করেছেন যে, প্রশাসন কেবল আদালতের নির্দেশ পালন করছে। তার দাবি, এ পর্যন্ত ৫ হাজার ২৯৯টি লাউডস্পিকার সরানো হয়েছে, যার মধ্যে ৪ হাজার ২০৩টি মসজিদ থেকে এবং ১ হাজার ৯৬টি মন্দির থেকে অপসারণ করা হয়েছে। তিনি আরও দাবি করেন, পুলিশকে কোনো বলপ্রয়োগ না করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছিল এবং কমিটিগুলো সহযোগিতা করেছে।
তৃণমূলের বিদ্রোহী বিধায়ক আখরুজ্জামান বলেন, ‘এটি একটি ধর্মনিরপেক্ষ দেশ। আমরা এই বিষয়টি মুখ্যমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরব।’ তিনি আরও যোগ করেন, হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়েরই সংবিধান অনুযায়ী নিজ নিজ ধর্ম পালনের অধিকার রয়েছে। এদিকে, পশ্চিমবঙ্গ জমিয়তে উলামায়ে হিন্দের সভাপতি ও সাবেক মন্ত্রী সিদ্দিকুল্লাহ চৌধুরী পুলিশের এই আচরণের কঠোর সমালোচনা করে বৃহত্তর আন্দোলনের হুমকি দিয়েছেন। অন্যদিকে, আইএসএফ বিধায়ক নওশাদ সিদ্দিকী পুলিশের মহাপরিদর্শকের কাছে চিঠি দিয়ে জানতে চেয়েছেন যে, এ বিষয়ে কোনো আনুষ্ঠানিক সরকারি নির্দেশ রয়েছে কি না। তিনি শব্দদূষণ বিধিমালা বাস্তবায়নের জন্য একটি মানসম্মত কার্যপদ্ধতি (এসওপি) প্রণয়ন এবং ক্ষমতার অপব্যবহারকারী পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন।
রাজ্য বিজেপির সভাপতি শমীক ভট্টাচার্য এই বিতর্কের জবাবে বলেন, গণতান্ত্রিক দেশে প্রতিবাদ করার অধিকার সবার আছে, তবে রাজনৈতিক দলগুলোর দ্বিমুখী নীতি পরিহার করা উচিত। তিনি আরও বলেন, ‘এটি বাবরের শাসন নয়, কিংবা তুঘলকি প্রশাসনও নয়। এখানে শুধু একজনের মতই চলবে, অন্য কারও মত গ্রহণযোগ্য নয়—এ ধরনের রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গের মানুষ মেনে নেবে না।’

















