বিটিআরসি কর্তৃক চালু হওয়া নারীদের জন্য ‘পিংক বাস’ সেবার নারী চালকেরা সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ব্যাপক ট্রল ও আজেবাজে মন্তব্যের শিকার হচ্ছেন। তবে এই প্রতিকূলতার মুখেও তারা নিজেদের অবস্থানে অটল থাকার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন। খাদিজা আক্তার (২৮), যিনি একসময় গৃহিণী ছিলেন এবং পরে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়ে প্রশিক্ষক হয়েছেন, তিনি এই হয়রানির অন্যতম শিকার। তিনি জানান, তার ছবি ব্যবহার করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হেনস্তা করা হচ্ছে। ২০২১ সালে তিনি গাড়ি চালানোর ওপর প্রশিক্ষণ নেন।
গত মঙ্গলবার ঢাকা, বগুড়া ও চট্টগ্রামে নারী চালক ও কনডাক্টর পরিচালিত ১৩ রুটে ১৪টি বাস চালু করেছে বিটিআরসি। এর মধ্যে ঢাকায় ১০টি রুটে নয়টি দ্বিতল ও একটি একতলা বাস চলাচল করছে। গোলাপি রঙের এই বাসগুলোকে ‘পিংক বাস’ বলা হচ্ছে। যদিও এর আগেও নারীদের জন্য বাস সার্ভিস ছিল, তবে অপ্রতুলতা ও ব্যবস্থাপনার অভাবে সেগুলো সফল হয়নি। এবারই প্রথম সম্পূর্ণ নারীদের পরিচালনায় এই সেবা চালু হয়েছে।
নারী বাসযাত্রীরা এই সেবা পেয়ে স্বস্তি প্রকাশ করলেও, কেউ কেউ মনে করেন নারীদের জন্য আলাদা বাস চালুর পরিবর্তে পুরো গণপরিবহন ব্যবস্থাকে নারীদের জন্য নিরাপদ করা উচিত ছিল। তাদের আশঙ্কা, কম সংখ্যক বাস হওয়ায় যাত্রীদের দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হতে পারে, যা সেবার কার্যকারিতা কমিয়ে দিতে পারে। অন্যদিকে, এক পক্ষ নারীদের বাস চালানোর উপযুক্ততা নিয়ে প্রশ্ন তুলে তীব্র নারীবিদ্বেষী মনোভাব প্রকাশ করছে এবং ট্রল করছে। কিছু সংবাদমাধ্যমও ভিউয়ের প্রতিযোগিতায় নেমে নেতিবাচক প্রতিবেদন করছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
বিটিআরসির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খাচ্ছেন। মন্ত্রণালয় থেকে নারী বাস নিয়ে কর্মকর্তাদের কোনো মন্তব্য না করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে এবং সংবাদমাধ্যমে প্রচারের ব্যাপারেও মন্ত্রণালয় আগ্রহ দেখাচ্ছে না। বর্তমানে মাত্র ১৫ জন চালক ও ২৪ জন নারী কনডাক্টর রয়েছেন। নতুন ১০০টি ইলেকট্রিক বাস সংযোজন ও চালকের সংখ্যা না বাড়া পর্যন্ত তারা সংবাদমাধ্যমে প্রচার কম হোক, এমনটাই চাইছেন।
মতিঝিল বিআরটিসির বাস ডিপোতে গিয়ে নারী চালকদের সঙ্গে কথা বলার সময় তাদের মধ্যে প্রথম দিনের মতো উৎসাহ দেখা যায়নি। বেশিরভাগই কথা বলতে চাননি। যারা কথা বলেছেন, তারা হেনস্তা হওয়া নিয়ে আক্ষেপ প্রকাশ করেছেন। তবে তারা এও বলেছেন যে, এই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হবে এমন আশঙ্কা তাদের ছিল। খাদিজা আক্তার বলেন, ‘আমরা আগে থেকেই গাড়ি চালাতে পারি, তাই বাস চালানো শেখা ও বাসের নিয়ন্ত্রণ নিতে বেশি সময় লাগেনি।’ তিনি পিংক বাসের চালক হিসেবে গর্ববোধ করেন এবং একজন নারীকে নিরাপদে পৌঁছে দেওয়ার দায়িত্ব তাকে আনন্দ ও শক্তি দেয়। ২০১৪ থেকে ২০২০ সাল পর্যন্ত ব্র্যাকে চাকরি করেন।
খাদিজা আক্তার আরও বলেন, ‘কিছু কিছু ভিডিও দেখেছি। কিছু কিছু কনটেন্ট ক্রিয়েটর বিষয়টি ইতিবাচকভাবে না নিয়ে ঠাট্টাবিদ্রূপ করছেন। আমি তাঁদের উদ্দেশে বলতে চাই, আমাদের কোনো রকম প্রতিবন্ধকতা দিয়ে দমাতে পারবেন না আপনারা। আমরা নারীরা দেশের যত ধরনের খাত রয়েছে, সব জায়গায় সফলভাবে কাজ করে যাব।’ তিনি পরিবার থেকে পাওয়া সহায়তা এবং যাত্রীদের উচ্ছ্বাস তাকে অনুপ্রাণিত করে বলে জানান। ২০২৪ সালে তিনি ভারী যানবাহন চালানোর লাইসেন্স পান।
মোসাম্মৎ সাথী খাতুন (৩০), যিনি ছয় বছর আগে বিআরটিসিতে গাড়ি চালানোর প্রশিক্ষণ নিয়েছিলেন এবং বর্তমানে ডিগ্রি পাস ও এমএ পাস করার পর এলএলবি করছেন, তিনি সাভার ইপিজেড এলাকা থেকে মিরপুর ১০ থেকে মতিঝিল রুটে বাস চালান। তিনি বলেন, ‘নারী যাত্রীদের সেবা দিতে পেরে ভালো লাগছে। তাঁরা নেমে যাওয়ার সময় ধন্যবাদ দেন। অন্য বাসের চালকেরাও উৎসাহ দেন। কিছু আজেবাজে লোক নানা কথা বলবেই। সেসব কথায় কিছু মনে করছি না।’ তিনি দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন যে, তাদের কাজের মাধ্যমে মানুষের ধারণা পাল্টে দিতে হবে।
সাথী জানান, তার ভাবি তাসলিমা পারভীন বগুড়ায় এবং তার ভাইও ট্রাকচালক। স্বামীও ট্রাকচালক। গাড়ি চালানোকে পেশা হিসেবে নেওয়ার জন্য তাকে তার ভাই সবচেয়ে বেশি উৎসাহ দিয়েছেন। বাবা তাকে সাহস জুগিয়ে বলেছেন, ‘মেয়েরা বিমান চালায়, ট্রেন চালায়—তুমি কেন পারবে না।’ তিনি বাড়ির আশপাশের মানুষের নেতিবাচক মন্তব্য উপেক্ষা করে এগিয়ে গেছেন।
আরেক চালক মোসাম্মৎ রাবেয়া খাতুন, যিনি তিতুমীর কলেজ থেকে ইসলামের ইতিহাস ও সংস্কৃতি বিষয়ে স্নাতকোত্তর করেছেন, তিনি বলেন, ‘নেতিবাচক মন্তব্য শুনতে হবে, সেই চ্যালেঞ্জ নিয়েই এ পেশায় এসেছি। ভালো কিছু করলেও ট্রল করবে, খারাপ কিছু করলে তো ট্রল করবেই।’ তিনি ২০১২ সালে ব্র্যাকের একটি প্রকল্প থেকে গাড়ি চালানো শেখেন এবং পরে বিআরটিসিতে প্রশিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। তিনি মনে করেন, পুরুষশাসিত সমাজে নারীরা অনেক বৈষম্যের শিকার হলেও আয় করলে তাদের ক্ষমতায়ন হয়।
সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে নেতিবাচক মন্তব্যের জেরে আরও দুজন চালক উদ্বোধনী দিনে কথা বললেও আজ কথা বলতে চাননি। তারা মনে করেন, কথা বললেই আবার হেনস্তার শিকার হতে হবে। তারা নিজেদের কাজের মাধ্যমে দক্ষতা প্রমাণ করতে চান এবং আশা করেন যে নেতিবাচক মন্তব্যকারীরা তাদের পারিবারিক ও সামাজিক ক্ষতির দিকটিও বিবেচনা করবেন।

















