রাষ্ট্রপতির পদটি রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ সাংবিধানিক পদ হলেও বিদ্যমান সংবিধানে এর স্বাধীন ক্ষমতা অত্যন্ত সীমিত। বর্তমান নিয়ম অনুযায়ী, প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতির অন্য প্রায় সব কাজ প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ অনুযায়ী সম্পন্ন করতে হয়। রাষ্ট্রের বিভিন্ন অঙ্গের মধ্যে ক্ষমতার ভারসাম্য প্রতিষ্ঠা এবং প্রধানমন্ত্রীর একচ্ছত্র ক্ষমতা কমিয়ে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর লক্ষ্য নিয়ে ‘জুলাই জাতীয় সনদ’ প্রণয়ন করা হয়েছিল। তবে নির্বাচিত সরকার দায়িত্ব গ্রহণের ছয় মাস পেরিয়ে গেলেও সেই সনদ পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি।
২০২৪ সালের ৫ আগস্ট গণ-অভ্যুত্থানে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার রাষ্ট্র সংস্কারের উদ্যোগ নেয়। এই প্রক্রিয়ায় ছয়টি সংস্কার কমিশন গঠন করা হয় এবং রাজনৈতিক ঐকমত্যের ভিত্তিতে ৮৪টি প্রস্তাব নিয়ে জুলাই জাতীয় সনদ তৈরি হয়, যার মধ্যে ৪৮টিই সংবিধান সম্পর্কিত। সংবিধান সংস্কার কমিশনের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ক্ষমতার ব্যাপক কেন্দ্রীকরণ প্রধানমন্ত্রীকে স্বৈরশাসকে পরিণত করেছে। তাই গণতন্ত্রকে সুসংহত করতে নির্বাহী বিভাগের প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ সম্পর্ক ও কার্যকরী ক্ষমতায়ন জরুরি।
রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে জাতীয় ঐকমত্য কমিশন বিভিন্ন নিয়োগে রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর সুপারিশ করেছিল। এর মধ্যে সেনা, নৌ ও বিমানবাহিনীর প্রধান, ডিজিএফআই ও এনএসআই মহাপরিচালকসহ ১২টি গুরুত্বপূর্ণ পদে সরাসরি নিয়োগের ক্ষমতা রাষ্ট্রপতির হাতে ন্যস্ত করার প্রস্তাব ছিল। তবে শেষ পর্যন্ত মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন, প্রেস কাউন্সিল এবং আইন কমিশনের মতো প্রতিষ্ঠানগুলোতে রাষ্ট্রপতিকে স্বাধীনভাবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে ঐকমত্য হয়। বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ও এনার্জি রেগুলেটরি কমিশনের নিয়োগ নিয়েও আলোচনা থাকলেও এ বিষয়ে বিএনপির ভিন্নমত রয়েছে।
বিএনপি জানিয়েছে, তারা তাদের ভিন্নমতসহ জুলাই সনদ বাস্তবায়ন করবে এবং সেই অনুযায়ী সংবিধান সংশোধন করবে। এর অংশ হিসেবে জাতীয় সংসদে একটি বিশেষ কমিটিও গঠন করা হয়েছে, যদিও বিরোধী দল তা প্রত্যাখ্যান করেছে। এছাড়া বিএনপি তাদের নির্বাচনী ইশতেহারে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে এবং উপরাষ্ট্রপতি পদ সৃষ্টির কথাও বলেছে।
রাষ্ট্রপতি নির্বাচন পদ্ধতি নিয়েও জুলাই সনদে পরিবর্তনের প্রস্তাব রয়েছে। বর্তমানে সংসদ সদস্যরা প্রকাশ্যে ভোট দেন এবং সংবিধানের ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে ভোট দেওয়ার সুযোগ নেই। জুলাই সনদে ৭০ অনুচ্ছেদ সংশোধন এবং গোপন ভোটে রাষ্ট্রপতি নির্বাচনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সালাহউদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, ভবিষ্যতে সংবিধান সংশোধনের সময় ৭০ অনুচ্ছেদে পরিবর্তন আসবে এবং পরবর্তী রাষ্ট্রপতি নির্বাচন সেই সংশোধিত নিয়মেই হবে। বিরোধীদলীয় চিফ হুইপ ও এনসিপির আহ্বায়ক নাহিদ ইসলাম মনে করেন, ৭০ অনুচ্ছেদ না থাকলে এবং স্বাধীনভাবে ভোট দেওয়ার সুযোগ থাকলে রাষ্ট্রপতির পদটি আরও বেশি সম্মানিত হতো।

















