চট্টগ্রাম নগরের ১ নম্বর দক্ষিণ পাহাড়তলী ওয়ার্ডের বরইতলী এলাকায় পাহাড় কেটে বসতি স্থাপন ও জমি হাতবদলের প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, যা সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের শুরুর দিকের পরিস্থিতির সঙ্গে তুলনীয়। সরু মেঠো পথ পাহাড়ের গা বেয়ে ওপরে উঠেছে, যেখানে টিন, বাঁশ ও বেড়ার ছোট ছোট ঘর তৈরি হয়েছে। কিছু ঘর পাহাড়ের ঢালে ঠেস দিয়ে এবং কিছু পাহাড় কেটে সমান করা জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। নতুন ঘরের কাঠামো উঠছে এবং সদ্য কাটা মাটির স্তূপও দেখা যাচ্ছে।
ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি। এর মধ্যে কিছু অংশ ‘টিলা’, ‘ছন খোলা’ এবং ‘নাল’ শ্রেণিভুক্ত। তবে সরেজমিনে দেখা গেছে, এসব এলাকার বড় অংশে পাহাড় রয়েছে এবং সেখানে বিভিন্ন স্থানে বসতি গড়ে উঠেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের হিসাবে, শুধু বরইতলীতেই তিন শতাধিক পরিবার বাস করে, এবং আশপাশের পাহাড়েও কয়েক শ ঘর রয়েছে। পূর্ণাঙ্গ সরকারি জরিপ না থাকায় পরিবার বা দখলে যাওয়া জমির সঠিক হিসাব পাওয়া যায়নি।
চট্টগ্রামের জেলা প্রশাসক মোহাম্মদ জাহিদুল ইসলাম মিঞা জানিয়েছেন, ‘আরেকটা জঙ্গল সলিমপুর হওয়ার কোনো সুযোগ দেওয়া হবে না। দ্রুত সেখানে অভিযান পরিচালনা করে অবৈধভাবে বসবাসকারীদের উচ্ছেদ করা হবে।’
সরেজমিনে অন্তত ৩০ জন বাসিন্দার সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তাঁরা ৭০ হাজার থেকে ৩ লাখ টাকা দিয়ে ছোট জায়গা কিনেছেন। তাঁদের কেউই মালিকানার বৈধ দলিল দেখাতে পারেননি। পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থান পরিদর্শন করে ১৮ হাজার ৯৯৪ ঘনফুট বা প্রায় ৫৩৮ ঘনমিটার পাহাড়ি মাটি কাটার প্রমাণ পেয়েছে, যা পুরো এলাকার হিসাব নয়।
বরইতলীসহ জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীর বর্তমান পরিস্থিতির সঙ্গে সীতাকুণ্ডের জঙ্গল সলিমপুরের শুরুর দিকের মিল পাওয়া যাচ্ছে। জঙ্গল সলিমপুরেও পাহাড় দখল করে প্লট তৈরি, টাকার বিনিময়ে হাতবদল এবং পরে স্থায়ী বসতি গড়ে উঠেছিল, যা কয়েক দশকে বিশাল জনপদে পরিণত হওয়ায় উচ্ছেদ জটিল হয়ে পড়ে। জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী এখনো সেই পর্যায়ে না গেলেও এখানেও সরকারি জমিতে বসতি, পাহাড় কেটে জায়গা তৈরি ও হাতবদলের একই প্রবণতা দেখা যাচ্ছে।
বরইতলীতে বসতির শুরু প্রায় চার দশক আগে। মোহাম্মদ মানিক ১৯৮৬ সালের দিকে ৩ নম্বর বাজার এলাকায় বসবাস শুরু করেন, তখন সেখানে মাত্র ১০ থেকে ১৫টি ঘর ছিল। ১৯৯১ সালের ঘূর্ণিঝড়ের পর উপকূলীয় এলাকা থেকে বাস্তুচ্যুত মানুষ এসে বসতি গড়তে শুরু করেন।
পোশাকশ্রমিক আবদুর রহিম জানান, তিনি তিন বছর আগে প্রায় ৭০ হাজার টাকা দিয়ে জায়গা নিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমরা নিজেরা পাহাড় কাটিনি। যারা জায়গা বিক্রি করেছে, তারাই পাহাড় কেটে ছোট ছোট প্লট তৈরি করে বুঝিয়ে দিয়েছে। কোনো কাগজ দেয়নি।’ এই প্রতিবেদক ৫০ টাকার স্ট্যাম্পে করা একটি ‘হস্তান্তর দলিল’ পেয়েছেন, যেখানে গত বছরের ১১ ডিসেম্বর মনোয়ারা বেগম পাঁচটি সেমিপাকা ঘরসহ একটি জায়গা সাত লাখ টাকায় মো. সাইফুল ইসলাম ও তাঁর স্ত্রী সুরমা আক্তারের কাছে হস্তান্তর করেছেন। জমির শ্রেণি ‘টিলা’ লেখা থাকলেও এটি নিবন্ধিত মালিকানা দলিল নয়। পরিবেশ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, সাইফুলকে পাহাড় কাটার ঘটনায় জরিমানা করা হয়েছে।
পরিবেশ অধিদপ্তরের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে ১৪ জনের সম্পৃক্ততার কথা এসেছে। তাঁদের মধ্যে নিম্ন আয়ের মানুষ—গাড়িচালক, পোশাকশ্রমিক, রংমিস্ত্রি, দিনমজুর—জায়গা বিক্রির সঙ্গে জড়িত। হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিসের প্রতিবেদনে পাহাড় কাটার সঙ্গে জড়িত হিসেবে মোহাম্মদ হোসাইনের নাম রয়েছে, যিনি নিজেকে বিএনপির কর্মী পরিচয় দেন এবং অভিযোগ অস্বীকার করেন। বর্তমানে পাহাড় কাটা ও জায়গা হাতবদলে মো. রুবেল প্রভাব বিস্তার করছেন বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় কয়েকজন। নিজেকে হাটহাজারী উপজেলা শ্রমিক দলের সাবেক সহদপ্তর সম্পাদক পরিচয় দেওয়া রুবেল অভিযোগ অস্বীকার করলেও একটি জমি কেনাবেচায় মধ্যস্থতার কথা স্বীকার করেছেন। রুবেলের বিরুদ্ধে আবুধাবিতে বসবাসকারী স্থানীয় বাসিন্দা মোহাম্মদ ফরহাদ ১০ লাখ টাকা চাঁদা দাবির অভিযোগ করেছেন এবং গত ২৭ জুলাই বাংলাদেশ দূতাবাসে লিখিত অভিযোগও করেছেন।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বনবিদ্যা ও পরিবেশবিজ্ঞান ইনস্টিটিউটের সুপারনিউমারারি অধ্যাপক মোহাম্মদ কামাল হোসাইন বলেন, নিম্নবিত্ত ও অসহায় মানুষকে সামনে রেখে প্রথমে বসতি তৈরি এবং পরে সেই বসতির আড়ালে ধাপে ধাপে পাহাড় কেটে সমতল করা পাহাড় দখলের একটি পরিচিত প্রবণতা। তাঁর মতে, জঙ্গল সলিমপুরের অভিজ্ঞতা মাথায় রেখে জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলীতে এখনই পাহাড় কাটা ও দখল বন্ধ করতে হবে।
গত ১০ বছরে বরইতলীতে কোনো উচ্ছেদ অভিযানের তথ্য পাওয়া যায়নি। চলতি বছরের জুনে পাহাড় কাটার অভিযোগের পর হাটহাজারী উপজেলা ভূমি অফিস এলাকা পরিদর্শন করে। তাদের চিঠির ভিত্তিতে ২৮ জুলাই পরিবেশ অধিদপ্তর ১৪টি স্থানে পাহাড় কাটার প্রমাণ পেয়ে ৪ আগস্ট ১৪ জনকে মোট ১ লাখ ৬৫ হাজার টাকা জরিমানা করে। তবে জরিমানার পরও কাটা পাহাড়ে ঘর রয়ে গেছে এবং খাসজমিও দখলমুক্ত হয়নি। পরিবেশ অধিদপ্তরের চট্টগ্রাম মহানগর কার্যালয়ের পরিচালক সোনিয়া সুলতানা বলেন, সরকারি খাসজমি কীভাবে একটি চক্র লিজ দিচ্ছে বা কেনাবেচা করছে, তা তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নিতে এবং জমি সরকারের দখলে নিতে পাহাড় ব্যবস্থাপনা কমিটিকে চিঠি লেখা হবে।
৩ নম্বর বাজার থেকে প্রায় এক কিলোমিটার ভেতরে ঢুকলেই পাহাড়ঘেরা বরইতলী।.জঙ্গল সলিমপুর প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে .ভূমি অফিসের তথ্য অনুযায়ী, জঙ্গল দক্ষিণ পাহাড়তলী মৌজার ৩৫৯২, ৩৬৯৬, ৩০৫৩ ও ৩৫৪০ নম্বর বিএস দাগের মধ্যে মোট ৯৪ দশমিক ৪৫ একর জমি ১ নম্বর খাস খতিয়ানভুক্ত সরকারি ভূমি।
এর মধ্যে ৩৫৯২ দাগের শ্রেণি ‘টিলা’, ৩০৫৩ দাগের ‘ছন খোলা’ এবং অন্য দুটি দাগের ‘নাল’।

















