চালের দানার মতো অতি ক্ষুদ্র একটি সামুদ্রিক প্রাণী সম্প্রতি বিশ্বজুড়ে আলোচনার কেন্দ্রে চলে এসেছে। ‘কস্টাসিয়েলা কুরোশিমাই’ নামের এই প্রাণীটি ‘লিফ শিপ’ হিসেবেই বেশি পরিচিত। মূলত এক ধরনের সামুদ্রিক স্লাগ এই প্রাণীটি যুক্তরাজ্যভিত্তিক সংবাদমাধ্যম দ্য গার্ডিয়ান আয়োজিত ‘বছরের সেরা অমেরুদণ্ডী প্রাণী’ প্রতিযোগিতায় পাঠকদের ভোটে বিজয়ী হয়েছে। গত ২০ আগস্ট এই প্রতিযোগিতার ফলাফল ঘোষণা করা হয়। হাজার হাজার মনোনয়ন থেকে চূড়ান্ত বাছাই করা ১০টি প্রাণীর মধ্যে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে এই ক্ষুদ্র জলজ প্রাণীটি শীর্ষস্থান দখল করেছে।
লিফ শিপের সবচেয়ে বিস্ময়কর বৈশিষ্ট্য হলো এর শরীরে ‘সোলার প্যানেল’-এর মতো কার্যকর ক্লোরোপ্লাস্ট জমা রাখার ক্ষমতা। ১৯৯৩ সালে প্রজাতিটি প্রথম বৈজ্ঞানিকভাবে শনাক্ত করা হয়। কয়েক মিলিমিটার দৈর্ঘ্যের এই প্রাণীটি খালি চোখে দেখা বেশ কঠিন হলেও ম্যাক্রো ফটোগ্রাফির কল্যাণে এটি সামুদ্রিক প্রাণীপ্রেমীদের কাছে জনপ্রিয়তা পেয়েছে। জাপান, ইন্দোনেশিয়া ও ফিলিপাইনের উষ্ণমণ্ডলীয় সমুদ্রের পানিতে এদের দেখা মেলে। প্রাণীটির মাথার ওপর দুটি সংবেদনশীল অঙ্গ রয়েছে যা দেখতে ভেড়ার কানের মতো এবং শরীরের ওপর সবুজ পাতার মতো গঠনের কারণে এর এমন নামকরণ হয়েছে।
উদ্ভিদের মতো সালোকসংশ্লেষণ করতে পারলেও লিফ শিপ নিজে কোনো উদ্ভিদীয় অঙ্গ তৈরি করে না। শৈবাল খাওয়ার সময় এটি সেখান থেকে ক্লোরোপ্লাস্ট সংগ্রহ করে নিজের শরীরে জমা রাখে, যাকে বৈজ্ঞানিক ভাষায় ‘ক্লেপ্টোপ্লাস্টি’ বলা হয়। এই ক্লোরোপ্লাস্টগুলো সূর্যের আলো ব্যবহার করে শক্তি উৎপাদনে সহায়তা করে, যা প্রাণীটির শরীরের সবুজ অংশকে প্রাকৃতিকভাবে সোলার প্যানেলের মতো কার্যকর করে তোলে। তবে এটি কেবল সূর্যের আলোর ওপর নির্ভরশীল নয়; বেঁচে থাকার জন্য শৈবাল খাওয়া এর খাদ্যাভ্যাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। ক্লোরোপ্লাস্ট মূলত তাকে অতিরিক্ত শক্তির উৎস হিসেবে কাজ করে।
প্রতিযোগিতায় লিফ শিপের নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছিল প্যাটাগোনিয়ার বিশাল আকৃতির বাম্বলবি বম্বাস ডালবোমি, যা দ্বিতীয় স্থান অধিকার করে। এছাড়া তৃতীয় হয়েছে প্রাচীন নীল রক্তের ঘোড়ার খুর কাঁকড়া। বিশ্বে প্রায় ১৭ লাখ প্রজাতির অমেরুদণ্ডী প্রাণী রয়েছে যা পৃথিবীর বাস্তুতন্ত্রের জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু অনেক সময় মানুষের আগ্রহের বাইরে থাকা এসব প্রাণীর গুরুত্ব ও বৈচিত্র্য তুলে ধরাই ছিল এই প্রতিযোগিতার মূল লক্ষ্য। চালের দানার মতো ক্ষুদ্র এই প্রাণীটি প্রমাণ করেছে যে, প্রকৃতিতে শক্তি সংগ্রহ ও টিকে থাকার কৌশল কতটা বৈচিত্র্যময় হতে পারে।

















