দেশের নদীগুলো এখন বালু দস্যুদের কবলে। যাদুকাটা নদীসহ দেশের বিভিন্ন নদ-নদী বুক চিরে চলছে অবৈধ ড্রেজারের তাণ্ডব আর রাতে ভারী ট্রাকের বিকট শব্দ। এই বালুমহালগুলো এখন এক একটি ত্রাসের রাজত্বে পরিণত হয়েছে। ক্ষমতার পালাবদলে কেবল রাজনৈতিক সাইনবোর্ড আর মুখের ভাষা বদলায়, কিন্তু অপরাধ ও অপরাধীদের দাপট একই রয়ে গেছে। অনুসন্ধানে বেরিয়ে এসেছে, এই অপরাধের নেপথ্যে রয়েছে বিএনপি ও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী চক্রের সমন্বয়ে গঠিত এক ভয়ংকর ত্রিভুজ সিন্ডিকেট। এই চক্রের রক্ষাকবচ হিসেবে কাজ করছে প্রশাসনের একশ্রেণির অসাধু কর্মকর্তা ও সুবিধাভোগী সাংবাদিকরা।
আইনকানুনের তোয়াক্কা না করে ইজারাদারদের বেপরোয়া দৌরাত্ম্যে নদীভাঙনের শিকার হচ্ছে শত শত একর ফসলি জমি ও বসতভিটা। ইজারার শর্ত ভঙ্গ করলে জামানত বাজেয়াপ্ত ও ইজারা বাতিলের আইনি বিধান থাকলেও বাস্তবে তার প্রয়োগ নেই। বরং অপরাধীদের আড়াল করতে অনেক সময় জেলা প্রশাসক বা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা প্রত্যাহারের মতো লোক দেখানো ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে যারা বালু লুটে জড়িত ছিল, তারা এখন নতুন রাজনৈতিক শক্তির সাথে গোপন আঁতাতে সক্রিয় হয়েছে। মানিকগঞ্জের শিবালয় কিংবা ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নবীনগরে বালুমহালকে কেন্দ্র করে প্রকাশ্য দিবালোকে গুলি ও সহিংসতার ঘটনা পরিস্থিতি কতটা ভয়াবহ তার প্রমাণ দেয়।
যাদুকাটা-২ (৩৯৮.০৪ একর) বালুমহালের ইজারা পান সাবেক ছাত্রলীগ নেতা শাহ রুবেল আহমেদ। মেয়াদ শেষ হওয়ার পরও আইনের ফাঁক গলে সিন্ডিকেট সদস্যরা এখান থেকে প্রতিদিন কোটি টাকার বেশি চাঁদা আদায় করছে। এই চাঁদা আদায়ে রাণু মেম্বার, মোশাহিদ হোসেন, পাথর মুত্তালিবসহ শতাধিক ক্যাডারের একটি বাহিনী কাজ করছে। এছাড়া সুনামগঞ্জের স্থানীয় সাংবাদিক সোহেল তালুকদার জানান, অবৈধ বালু উত্তোলন নির্বিঘ্ন রাখতে প্রশাসন, পুলিশ, পরিবেশ অধিদপ্তর ও সাংবাদিকদের বিভিন্ন স্তরে কোটি কোটি টাকার মাসোহারা দেওয়া হয়। তিনি জানান, তাহিরপুরের স্থানীয় অসাধু সাংবাদিকরা প্রতিমাসে ২ থেকে ৫ হাজার, জেলা পর্যায়ের প্রতিনিধিরা ৫ থেকে ৩০ হাজার টাকা এবং সিলেটে ব্যুরো অফিসের দায়িত্ব পালনকারী কয়েকজন সাংবাদিক মাসে ৫০ হাজার থেকে ১ লাখ টাকা পর্যন্ত মাসোহারা পান। এদের মধ্যে তাহিরপুরের একজন প্রভাবশালী সাংবাদিকও রয়েছেন।
সুনামগঞ্জ-১ আসনের সংসদ সদস্য কামরুজ্জামান কামরুল বিষয়টি নিয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রীর কাছে ডিও লেটার দিয়ে হস্তক্ষেপ কামনা করেছেন। এতে তিনি উল্লেখ করেন, শিমুল বাগান ও বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ আশপাশের গ্রামগুলো আজ হুমকির মুখে। এদিকে সুনামগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) তাপস শীল জানিয়েছেন, মেয়াদ শেষ হওয়া ইজারাদারদের বিরুদ্ধে হাইকোর্টের আদেশের প্রেক্ষিতে আপিল দায়ের করা হয়েছে। অন্যদিকে ইজারাদার নাছির মিয়া জানান, সরকারি নথিতে এপ্রিলের ১৩ তারিখ মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা থাকলেও তারা ফেব্রুয়ারিতে সময় বাড়ানোর আবেদন করেছেন। এছাড়া শাহ রুবেল আহমেদ দাবি করেছেন, নির্ধারিত সময়ের প্রায় ৫ মাস পর দখল হস্তান্তর হওয়ায় নিয়মানুযায়ী আগামী সেপ্টেম্বরের ৩০ তারিখ পর্যন্ত তাদের ইজারার মেয়াদ বহাল রয়েছে।

















