দেশজুড়ে চলমান ভয়াবহ গ্যাস সংকটের নেতিবাচক প্রভাবে নারায়ণগঞ্জের ফতুল্লা শিল্পাঞ্চলের রপ্তানিমুখী পোশাকশিল্প চরম বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। গ্যাসের তীব্র ঘাটতির কারণে অনেক কারখানার উৎপাদন ক্ষমতা প্রায় অর্ধেকে নেমে এসেছে। শিল্পসংশ্লিষ্টদের আশঙ্কা, এই সংকট দ্রুত নিরসন করা সম্ভব না হলে বিদেশি ক্রেতারা মুখ ফিরিয়ে নিতে পারেন, যা দেশের প্রধান রপ্তানি খাত তৈরি পোশাকশিল্পে গভীর অস্থিরতা তৈরি করবে।
বাংলাদেশ নিটওয়্যার ম্যানুফ্যাকচারার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশন (বিকেএমইএ) থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী, ফতুল্লার বিসিক শিল্পনগরীতে থাকা ২৫৬টি কারখানার মধ্যে গত দুই বছরে ১২২টি বন্ধ হয়ে গেছে। বর্তমানে চালু থাকা ১৩৪টি কারখানার অধিকাংশেরই ডাইং প্রক্রিয়ার জন্য প্রয়োজনীয় কাপড় সময়মতো সংগ্রহ করা সম্ভব হচ্ছে না। উৎপাদন ব্যাহত হওয়ায় অনেক প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য হয়েই মাঝেমধ্যে কার্যক্রম বন্ধ রাখতে হচ্ছে।
শিল্প মালিকরা জানিয়েছেন, জুলাই থেকে ডিসেম্বর মাস পর্যন্ত বিদেশি ক্রেতারা সবচেয়ে বেশি ক্রয়াদেশ দিয়ে থাকেন। পরবর্তী কয়েক মাসের উৎপাদন কার্যক্রম এই অর্ডারের ওপরই নির্ভর করে। কিন্তু বিদ্যমান গ্যাস সংকটের কারণে অনেক বিদেশি ক্রেতা নতুন করে অর্ডার দিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করছেন।
বিকেএমইএ’র প্রেসিডেন্ট মোহাম্মদ হাতেম বলেন, গার্মেন্টস, নিটিং, ডাইং ও টেক্সটাইল শিল্প একটি সম্মিলিত উৎপাদন শৃঙ্খল। নিটিং কারখানায় সুতা থেকে কাপড় তৈরির পর ডাইং কারখানায় তা রঙ ও ফিনিশিং হয়ে গার্মেন্টসে পোশাকে রূপ নেয়। ফলে গ্যাস সরবরাহ বিঘ্নিত হলে পুরো উৎপাদন চক্রেই স্থবিরতা দেখা দেয়। তিনি আরও জানান, আগে অনেক প্রতিষ্ঠান সিএনজি স্টেশন থেকে ক্যাসকেড বা খোলা সিলিন্ডারে গ্যাস এনে বয়লার চালিয়ে উৎপাদন সচল রেখেছিল। কিন্তু ২৬ জুলাই তিতাস গ্যাসের নতুন নির্দেশনায় যানবাহন ছাড়া ক্যাসকেড সরবরাহ বন্ধ হওয়ায় সেই বিকল্প ব্যবস্থাও অকার্যকর হয়ে পড়েছে, যা সংকটকে আরও গভীর করেছে।
উৎপাদন স্থবিরতার কারণে শ্রমিকদের বেতন পরিশোধ নিয়ে মালিকরা দুশ্চিন্তায় পড়েছেন বলে উল্লেখ করেন বিকেএমইএ সভাপতি। তিনি আশঙ্কা প্রকাশ করে বলেন, এই সংকট দীর্ঘস্থায়ী হলে বাংলাদেশ প্রায় দেড় বিলিয়ন ডলারের রপ্তানি হারাবে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে সব খাতে।
ফতুল্লার কাঠেরপুল এলাকার আজাদ রিফাত ফাইবার্স-এর পরিচালক তাইজুল ইসলাম রাজীব জানান, ডাইং কার্যক্রম সচল রাখতে ন্যূনতম পাঁচ পিএসআই গ্যাসের চাপ প্রয়োজন, অথচ বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে মাত্র এক থেকে দুই পিএসআই। এই চাপে কাপড় রঙ করা বা শুকানো অসম্ভব হয়ে পড়েছে। শিল্প মালিকদের মতে, নিরবচ্ছিন্ন গ্যাস সরবরাহ নিশ্চিত করা না গেলে উৎপাদন ব্যয় বৃদ্ধি, রপ্তানি হ্রাস এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রতিযোগিতায় টিকে থাকা কঠিন হয়ে পড়বে। একই সঙ্গে লাখো শ্রমিকের কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়বে।

















