গণ-অভ্যুত্থানে ক্ষমতাচ্যুত হওয়ার পর দীর্ঘ সময় নিষ্ক্রিয় থাকা আওয়ামী লীগ এখন ডিসেম্বর মাসকে কেন্দ্র করে রাজনৈতিক ও সাংগঠনিক তৎপরতা বাড়ানোর কৌশল গ্রহণ করেছে। গোয়েন্দা সূত্রের দাবি, দলটি তাদের নেতা-কর্মীদের পুনরায় সংঘবদ্ধ করা, বিদেশে অবস্থানরত শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন এবং ঝটিকা মিছিলের মাধ্যমে নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়ার চেষ্টা করছে। গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর হাতে আসা তথ্যে জানা গেছে, ভারতে অবস্থানরত আওয়ামী লীগ সভাপতি শেখ হাসিনার দেশে ফেরার ঘোষণাকে কেন্দ্র করে নেতা-কর্মীদের সংগঠিত করে বিশৃঙ্খলা ও নাশকতা সৃষ্টির পরিকল্পনা করা হচ্ছে।
আধুনিক প্রযুক্তি ও বিভিন্ন এনক্রিপ্টেড অ্যাপের মাধ্যমে বিদেশে থাকা নেতাদের সঙ্গে মাঠপর্যায়ের কর্মীদের নিয়মিত যোগাযোগ রয়েছে। নারায়ণগঞ্জের পলাতক নেতা শামীম ওসমানের নেতা-কর্মীদের প্রস্তুত থাকার নির্দেশের একটি ভিডিও সম্প্রতি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। এসব গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে একটি প্রতিবেদন সরকারের উচ্চপর্যায়ে জমা দেওয়া হয়েছে। গত দুই সপ্তাহে ঢাকা, বনানী, ময়মনসিংহ, শরীয়তপুর, সাভার ও সুনামগঞ্জসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে ঝটিকা মিছিলের ঘটনা ঘটেছে। ময়মনসিংহের গাঙ্গিনাপাড় এলাকায় যুবলীগের মিছিল প্রতিরোধে ব্যর্থ হওয়ায় কোতোয়ালি মডেল থানার ১ নম্বর ফাঁড়ির ইনচার্জসহ ২৭ পুলিশ সদস্যকে প্রত্যাহার করা হয়েছে। ৫ আগস্টের পর নিরাপত্তা বাহিনীর মধ্যে যে অস্থিরতা ও নাজুক পরিস্থিতি তৈরি হয়েছিল, বর্তমানে তার অনেকটাই উন্নতি হয়েছে।
গোয়েন্দা তথ্য অনুযায়ী, গোপালগঞ্জ, শরীয়তপুর, মাদারীপুর, ফরিদপুর, গাজীপুর, নরসিংদী ও নারায়ণগঞ্জের নেতা-কর্মীরা বিদেশে থাকা ওবায়দুল কাদের, আসাদুজ্জামান খান কামাল, জাহাঙ্গীর কবির নানক, আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম, নসরুল হামিদ বিপু, এনামুল হক শামীম, জাহাঙ্গীর আলম, নিক্সন চৌধুরী, নুরুন্নবী চৌধুরী শাওন, নজরুল ইসলাম বাবু এবং মহিউদ্দিন মহারাজের সঙ্গে নিয়মিত যোগাযোগ রাখছেন। সরকারবিরোধী কর্মকাণ্ড চালানোর জন্য ব্যবসা-বাণিজ্যের আড়ালে তহবিল গঠনের চেষ্টাও চলছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এছাড়া ভাটারা, বনশ্রী, আফতাবনগর, মোহাম্মদপুর, বসিলা, কামরাঙ্গীরচর ও উত্তরার মতো আবাসিক এলাকাগুলোকে আত্মগোপনের জন্য নিরাপদ স্থান হিসেবে বেছে নিয়েছেন কিছু ক্যাডার।
আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নজর এড়াতে অনেকে রাইড শেয়ারিং, বিউটি পার্লার বা মোটরসাইকেল শোরুমের মতো পেশা বেছে নিয়েছেন। পুলিশের একজন অতিরিক্ত আইজি জানিয়েছেন, রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের পরও মাঠপর্যায়ে আওয়ামী লীগপন্থি অনেক কর্মকর্তা রয়ে গেছেন, যাদের সঙ্গে বিদেশে অবস্থানরত নেতাদের যোগাযোগ থাকতে পারে। এছাড়া সাম্প্রতিক সময়ে বিভিন্ন স্থানে পরিত্যক্ত ককটেল ও বোমা তৈরির সরঞ্জাম উদ্ধারের ঘটনাকে নাশকতার পূর্বাভাস হিসেবে দেখছেন গোয়েন্দারা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক মেজর জেনারেল (অব.) নাঈম আশফাক চৌধুরী মনে করেন, আগাম তথ্য সংগ্রহ করে ব্যবস্থা নিলে বিশৃঙ্খলা প্রতিহত করা সম্ভব। সাবেক আইজি আব্দুল কাইয়ুমের মতে, আওয়ামী লীগের কাছে থাকা বিপুল অর্থ ব্যবহার করে অরাজকতা তৈরির চেষ্টা হতে পারে, যদিও সাধারণ মানুষের সমর্থন না থাকায় তা সফল হওয়ার সম্ভাবনা কম। সমাজ ও অপরাধ বিশেষজ্ঞ ড. তৌহিদুল হক মনে করেন, ডিসেম্বরের ঘোষণা মূলত নেতা-কর্মীদের মনোবল ধরে রাখার একটি কৌশল মাত্র। তার ভাষ্য, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের ঘটনাগুলোর স্মৃতি এখনো মানুষের মনে তাজা। ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ জানিয়েছেন, অপরাধচক্রের বিরুদ্ধে অভিযান অব্যাহত রয়েছে এবং গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। টেলিগ্রাম ও ফেসবুকের মাধ্যমে শেখ হাসিনার বার্তা ছড়িয়ে নেতা-কর্মীদের সক্রিয় রাখার চেষ্টা চললেও বিষয়টি প্রশাসনের কঠোর নজরদারিতে রয়েছে।

















