আগামী ৩০ আগস্ট আন্তর্জাতিক গুম প্রতিরোধ দিবস উপলক্ষে রাজধানীর বাংলামোটরে বিশ্বসাহিত্য কেন্দ্রে মানবাধিকার সংগঠন ‘অধিকার’-এর আয়োজনে গুমের শিকার ব্যক্তিদের স্মরণে একটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হয়েছে। অনুষ্ঠানে গুমের শিকার অন্তত ২০টি পরিবার এবং গুম থেকে ফিরে আসা দুজন ব্যক্তি অংশ নেন। সভায় ভুক্তভোগীরা বর্তমান সরকারের আমলেও নতুন করে গুমের ঘটনা ঘটছে বলে অভিযোগ করে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেন। একই সঙ্গে তারা নতুন ‘গুম প্রতিরোধ আইন’ নিয়ে ক্ষোভ প্রকাশ করে এটিকে ‘বস্তা পচা আইন’ হিসেবে অভিহিত করেন এবং গুমের তদন্ত স্বাধীন জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করার দাবি জানান।
বাগেরহাটের নিখোঁজ মিরাজ শেখের স্ত্রী মুক্তা খাতুন অনুষ্ঠানে জানান, চলতি বছরের ১০ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটার দিকে জয়মনির ঠোটা এলাকার একটি চায়ের দোকানের সামনে থেকে সাদাপোশাকে থাকা দুজন কোস্টগার্ড সদস্য মিরাজকে স্পিডবোটে তুলে নিয়ে যায়। সে সময় তার মোটরসাইকেলটি দোকানি আল-আমিনের কাছে রাখা হয়েছিল, যা পরে ২১ এপ্রিল রবিন পরিচয় দেওয়া এক কোস্টগার্ড সদস্য নিয়ে যান। মুক্তা জানান, কোস্টগার্ড এখন মিরাজকে তাদের কাছে থাকার কথা অস্বীকার করছে। অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিল মিরাজের সাত বছর বয়সী ছেলে মাহির শেখ, যে তার বাবার ছবির দিকে তাকিয়ে বারবার স্বজনদের খুঁজছিল।
আনিশা ইসলাম ইনশা নামের আরেক ভুক্তভোগী জানান, ২০১৯ সালের ১৯ জুন মিরপুর-১ থেকে তার বাবা ইসমাইল হোসেন বাতেন গুম হন। সাত বছর পার হলেও তিনি বাবার কোনো খোঁজ পাননি। তিনি নতুন আইনের নিন্দা জানিয়ে বলেন, ৫ আগস্টের পরবর্তী সময়েও গুমের ঘটনা ঘটছে, যা অত্যন্ত দুঃখজনক। অনুষ্ঠানে আমেনা আক্তার জানান, ২০১২ সালের ২৪ আগস্ট তৎকালীন সরকারের আমলে র্যাব তার স্বামী বরিশাল ওয়ার্ড ছাত্রদলের সভাপতি ফিরোজ খানকে গুম করে, যার সন্ধান আজও মেলেনি।
অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনা করেন অধিকারের প্রোগ্রাম পরিচালক সাজ্জাদ হোসাইন। সংগঠনের ট্রেনিং অ্যান্ড অ্যাডভোকেসি পরিচালক তাসনিম ফারহানা বলেন, গত ২৭ আগস্ট সংসদে উত্থাপিত গুম প্রতিরোধ ও প্রতিকার আইনের খসড়ায় শৃঙ্খলা বাহিনীর বিরুদ্ধে অভিযোগের তদন্ত সংশ্লিষ্ট বাহিনীর হাতে রাখা হয়েছে, যা পক্ষপাতদুষ্ট হওয়ার সম্ভাবনা রাখে। এছাড়া আইনে অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হলে অভিযোগকারীর পাঁচ বছরের সশ্রম কারাদণ্ডের বিধান রাখা হয়েছে, যা বিচারহীনতাকে আরও উৎসাহিত করবে। তিনি তদন্তভার স্বাধীন মানবাধিকার কমিশনের ওপর ন্যস্ত করা, গুম হওয়া ব্যক্তির স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি পরিবারের ব্যবহারের ব্যবস্থা করা এবং ফেরত আসা ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মিথ্যা মামলা প্রত্যাহারের দাবি জানান।
সংসদ সদস্য মীর আহমাদ বিন কাসেম নতুন আইনটিকে ‘বস্তা পচা’ উল্লেখ করে বলেন, এটি গুম ও খুনের ছাড়পত্র দিচ্ছে। তিনি অভিযোগ করেন, এক বাহিনীর অপরাধ আরেক বাহিনী তদন্ত করবে—এটি নিরপেক্ষ হতে পারে না। সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতির সভাপতি ও সংসদ সদস্য মাহবুব উদ্দীন খোকন বলেন, আইনটি সর্বজনীন হওয়া প্রয়োজন। তিনি বিএনপি নেতা ইলিয়াস আলীর উদাহরণ টেনে বলেন, পুলিশ বা ডিবি যে অভিযোগ প্রমাণ করতে পারেনি, তা সাধারণ পরিবারের পক্ষে প্রমাণ করা অসম্ভব। অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে সংসদ সদস্য আবদুল্লাহ আল আমিন, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) হাসিনুর রহমান, সাবেক রাষ্ট্রদূত ও নিখোঁজ অবস্থা থেকে ফিরে আসা মারুফ জামান এবং জাতিসংঘের মানবাধিকারবিষয়ক হাইকমিশনের হিউম্যান রাইটস অফিসার জাহিদ হোসেন বক্তব্য রাখেন।

















