আজ থেকে ৮৭ বছর আগে একনায়ক অ্যাডলফ হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদ, প্রতিশোধস্পৃহা এবং সাম্রাজ্য বিস্তারের আকাঙ্ক্ষা বিশ্বকে এক ভয়াবহ যুদ্ধের মুখে ঠেলে দিয়েছিল। ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে কোনো পূর্ব ঘোষণা ছাড়াই পোল্যান্ডে আকস্মিক আক্রমণ চালিয়ে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা করেন নাৎসি জার্মানির নেতা অ্যাডলফ হিটলার। মানব ইতিহাসের এই কলঙ্কজনক অধ্যায়টি শুরু হয়েছিল এক নাটকীয় ঘটনার মধ্য দিয়ে।
ঘটনার সূত্রপাত হয় রাতের অন্ধকারে গ্লাইভিৎস শহরের রেডিও স্টেশনে। সেখানে একদল সশস্ত্র লোক পোলিশ বিদ্রোহীদের ছদ্মবেশে ঢুকে রেডিও স্টেশনের কর্মীদের জিম্মি করে। এরপর পোলিশ ভাষায় একটি জার্মানবিরোধী বার্তা সম্প্রচার করা হয়, যাতে মনে হয় পোল্যান্ড জার্মান ভূখণ্ডে হামলা চালিয়েছে। আসলে এই হামলা ছিল নাৎসি জার্মানির আধা সামরিক বাহিনী শুৎসশতাফেলের (এসএস) সদস্যদের দ্বারা সাজানো একটি নাটক। পোল্যান্ডে সামরিক অভিযান শুরুর আগে আগ্রাসনের পক্ষে একটি অজুহাত তৈরি করাই ছিল হিটলারের মূল উদ্দেশ্য।
এই নাটকের কয়েক ঘণ্টা পরেই, ১৯৩৯ সালের ১ সেপ্টেম্বর ভোররাতে, জার্মান যুদ্ধজাহাজ শ্লেসভিগ-হলস্টাইন বাল্টিক সাগরের ডানজিগ বন্দরের কাছে পোলিশ সামরিক ঘাঁটি ভেস্টারপ্লাটে গোলাবর্ষণ শুরু করে। একই সঙ্গে জার্মান নৌ সেনারা পোলিশ উপকূলে আক্রমণ চালায়। এভাবেই এক ভোরে আকস্মিক আক্রমণের মধ্য দিয়ে সূচনা হয়েছিল মানব ইতিহাসের সবচেয়ে প্রাণঘাতী ও বিধ্বংসী অধ্যায়—দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মানির ওপর চাপানো ভার্সাই চুক্তি দেশটির জন্য এক জাতীয় অপমানের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। ১৯১৯ সালের এই চুক্তির কঠোর শর্তে জার্মানিকে ভূখণ্ড ছাড়তে হয়, সামরিক শক্তি সীমিত করা হয় এবং বিশাল অঙ্কের যুদ্ধ ক্ষতিপূরণ দিতে বাধ্য করা হয়। রাজনৈতিক, সামাজিক, অর্থনৈতিক ও সামরিকভাবে দুর্বল হয়ে পড়া জার্মানির জনগণের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ, ঘৃণা ও প্রতিশোধস্পৃহা জন্ম নেয়। এই প্রেক্ষাপটেই অ্যাডলফ হিটলারের উত্থান ঘটে, যিনি জার্মান জাতিকে অপমান মোচন, প্রতিশোধ গ্রহণ এবং এক নতুন মহান সাম্রাজ্য পুনর্গঠনের স্বপ্ন দেখান।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর জার্মান রাজনীতিতে আত্মপ্রকাশ করে অতি ডানপন্থী ‘জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’। ১৯১৯ সালে হিটলার এই দলে যোগ দেন এবং ১৯২১ সালে এর নেতা নির্বাচিত হন। ১৯২০ সালে দলটির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় ‘ন্যাশনাল সোশ্যালিস্ট জার্মান ওয়ার্কার্স পার্টি’, যা পরে সংক্ষেপে নাৎসি পার্টি নামে পরিচিতি পায়। হিটলারের উগ্র জাতীয়তাবাদী বক্তব্য ও প্রচারকৌশলের মাধ্যমে দলটি দ্রুত জনপ্রিয়তা অর্জন করে। ১৯৩২ সালের জুলাইয়ের নির্বাচনে নাৎসি পার্টি জার্মানির বৃহত্তম রাজনৈতিক দলে পরিণত হয়। ১৯৩৩ সালের ৩০ জানুয়ারি জার্মানির প্রেসিডেন্ট পল ফন হিন্ডেনবার্গ হিটলারকে জার্মান চ্যান্সেলর হিসেবে নিয়োগ দেন।
চ্যান্সেলর হওয়ার পর হিটলার দ্রুত নিজের ক্ষমতা কেন্দ্রীভূত করেন। ১৯৩৩ সালের মার্চে ‘এনাবলিং অ্যাক্ট’ পাসের মাধ্যমে তিনি পার্লামেন্ট ছাড়াই আইন প্রণয়নের পূর্ণ ক্ষমতা লাভ করেন। ১৯৩৪ সালের আগস্টে প্রেসিডেন্ট হিন্ডেনবার্গ মারা যাওয়ার পর হিটলার চ্যান্সেলর ও প্রেসিডেন্ট পদ একীভূত করে নিজেকে জার্মানির ‘ফুয়েরার’ বা সর্বোচ্চ নেতা ঘোষণা করেন এবং একনায়ক হয়ে ওঠেন।
ক্ষমতা নিশ্চিত হওয়ার পর হিটলার তাঁর সাম্রাজ্যবাদী লক্ষ্য পূরণে পদক্ষেপ নিতে শুরু করেন। ১৯৩৬ সালের মার্চে তিনি ভার্সাই চুক্তি লঙ্ঘন করে রাইনল্যান্ডে জার্মানির সামরিক নিয়ন্ত্রণ পুনঃপ্রতিষ্ঠা করেন। এই অঞ্চলটি ভার্সাই চুক্তি অনুযায়ী ‘সামরিকীকরণমুক্ত অঞ্চল’ ছিল। মিত্রশক্তি (ফ্রান্স ও ব্রিটেন) তখন কোনো কঠোর পদক্ষেপ না নেওয়ায় হিটলারের সাহস আরও বেড়ে যায়। এরপর ১৯৩৮ সালের মার্চে তিনি অস্ট্রিয়াকে জার্মানির সঙ্গে যুক্ত করেন এবং সেপ্টেম্বরে মিউনিখ চুক্তির মাধ্যমে চেকোস্লোভাকিয়ার সুদেতেনল্যান্ড অধিগ্রহণ করেন। ১৯৩৯ সালের মার্চে তিনি পুরো চেকোস্লোভাকিয়াই দখল করে নেন। এই সময়ে ব্রিটেন ও ফ্রান্স যুদ্ধ এড়াতে হিটলারকে বারবার ছাড় দিচ্ছিল, যা ‘তুষ্টনীতি’ নামে পরিচিত। কিন্তু এই নীতি হিটলারের আগ্রাসী মনোভাবকে আরও উসকে দেয় এবং তাঁর পরবর্তী লক্ষ্যবস্তু হয় পোল্যান্ড।
ভার্সাই চুক্তির অধীনে জার্মানির ডানজিগ শহর ও এর আশপাশের এলাকা রাষ্ট্রপুঞ্জের (লিগ অব নেশনস) তত্ত্বাবধানে একটি স্বাধীন নগররাষ্ট্র হিসেবে ঘোষিত হয়েছিল। পোল্যান্ডকে একটি করিডরও দেওয়া হয়, যা জার্মানির পূর্ব প্রুশিয়াকে মূল ভূখণ্ড থেকে বিচ্ছিন্ন করে এবং বাল্টিক সাগরে পোল্যান্ডের প্রবেশাধিকার নিশ্চিত করে। হিটলার ১৯৩৯ সালের মার্চে ডানজিগের মালিকানা ফেরত চান এবং পোল্যান্ডের মধ্য দিয়ে পূর্ব প্রুশিয়ায় যাওয়ার জন্য সরাসরি সড়ক ও রেলপথের দাবি জানান। পোল্যান্ড এই দাবি প্রত্যাখ্যান করলে যুদ্ধের আশঙ্কা তৈরি হয়।
অবশেষে, ১ সেপ্টেম্বর ভোররাত ৪টা ৪৫ মিনিটে জার্মানি নৌ ও আকাশপথে পোল্যান্ডের ওপর আকস্মিক আক্রমণ শুরু করে। নাৎসি বাহিনী পোল্যান্ডে নির্বিচার হত্যাযজ্ঞ চালায়, যা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালে সংঘটিত হলোকাস্টের বিভীষিকার পূর্বসূচনা ছিল। হিটলার ভেবেছিলেন যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স সরাসরি সামরিক পদক্ষেপ নেবে না, কিন্তু তাঁর এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়। উভয় দেশ জার্মানিকে অবিলম্বে পোল্যান্ড থেকে সেনা প্রত্যাহারের চূড়ান্ত সতর্কবার্তা পাঠায়।
জার্মানি আলটিমেটামে সাড়া না দেওয়ায় ১৯৩৯ সালের ৩ সেপ্টেম্বর প্রথমে যুক্তরাজ্য, পরে ফ্রান্স জার্মানির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করে। এর মধ্য দিয়ে ইউরোপজুড়ে আনুষ্ঠানিকভাবে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সূচনা হয়। তবে যুদ্ধ ঘোষণা করলেও যুক্তরাজ্য ও ফ্রান্স জার্মানির অগ্রযাত্রা থামাতে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে ব্যর্থ হয়। ফলে ৮ সেপ্টেম্বরের মধ্যেই জার্মান বাহিনী পোল্যান্ডের রাজধানী ওয়ারশর উপকণ্ঠে পৌঁছে যায়। যুক্তরাজ্য তখনো বৃহৎ সামরিক অভিযানের জন্য পুরোপুরি প্রস্তুত ছিল না, আর ফ্রান্সের আক্রমণও দ্রুত থেমে যায়।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে জার্মানির প্রধান মিত্র ছিল ইতালি ও জাপান। এদের সঙ্গে পরে হাঙ্গেরি, রোমানিয়া, বুলগেরিয়া, স্লোভাকিয়া, ক্রোয়েশিয়াসহ কয়েকটি দেশ যুক্ত হয়। ইতালি ১৯৪০ সালে যুদ্ধে নামলেও ১৯৪৩ সালে মিত্রবাহিনীর অভিযানের পর আত্মসমর্পণ করে। জাপান ১৯৪১ সালের ৭ ডিসেম্বর পার্ল হারবারে মার্কিন নৌঘাঁটিতে হামলা চালিয়ে যুক্তরাষ্ট্রকে যুদ্ধে টেনে আনে এবং দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ও প্রশান্ত মহাসাগরীয় অঞ্চলে বিস্তীর্ণ এলাকা দখল করে।
২২ জুন ১৯৪১, অ্যাডলফ হিটলারের নির্দেশে জার্মান বাহিনীর এক বিশাল বহর সোভিয়েত ইউনিয়ন আক্রমণের উদ্দেশ্যে পূর্ব দিকে যাত্রা শুরু করে। তত দিনে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে এবং ইউরোপের দুই-তৃতীয়াংশ হিটলারের দখলে। জার্মান বাহিনীর প্রায় ৩০ লাখ সেনা ইউক্রেন হয়ে রাশিয়ার ইউরোপ অংশের অনেকটা দখল করে ফেলে।
স্তালিনগ্রাদে সোভিয়েত ইউনিয়নের রেড আর্মির সঙ্গে জার্মান বাহিনীর এক ভয়াবহ যুদ্ধ হয়, যা ‘র্যাটেনক্রিগ’ বা ‘ইঁদুরের যুদ্ধ’ নামে পরিচিত। শক্তি ও কৌশলে জার্মান বাহিনী অনেক শক্তিশালী হওয়া সত্ত্বেও রেড আর্মির প্রবল প্রতিরোধের মুখে তারা হেরে যায়। প্রায় ছয় মাস যুদ্ধের পর ১৯৪৩ সালের ৩১ জানুয়ারি জার্মান সেনারা আত্মসমর্পণ শুরু করেন এবং ২ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত প্রায় ১ লাখ জার্মান সেনা আত্মসমর্পণ করেন। এই যুদ্ধে প্রায় দেড় লাখ জার্মান সেনা নিহত এবং আরও প্রায় এক লাখ বন্দী হয়েছিলেন। যদিও সোভিয়েত রেড আর্মির ক্ষয়ক্ষতি অনেক বেশি ছিল, স্তালিনগ্রাদের এই পরাজয় জার্মান বাহিনীর মনোবল ভেঙে দিয়েছিল।
স্তালিনগ্রাদে হেরে যাওয়ার পর জার্মানি আরও দুই বছরের বেশি যুদ্ধ চালিয়ে যায়। ১৯৪৪ সালে সোভিয়েত বাহিনী পূর্ব দিক থেকে এবং যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্ররা পশ্চিম থেকে জার্মানির দিকে অগ্রসর হতে থাকে। ১৯৪৫ সালের এপ্রিলের শেষ দিকে সোভিয়েত বাহিনী বার্লিনে প্রবেশ করে। ৩০ এপ্রিল বার্লিনের ভূগর্ভস্থ বাংকারে আত্মহত্যা করেন অ্যাডলফ হিটলার।
হিটলারের মৃত্যুর পর কার্ল দনিৎসের নেতৃত্বাধীন জার্মান সরকার মিত্রবাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের উদ্যোগ নেয়। ৭ মে ফ্রান্সের রেইমসে জার্মান সশস্ত্র বাহিনী নিঃশর্ত আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে, যা ৮ মে রাত ১১টা ১ মিনিটে ইউরোপে সব জার্মান সামরিক অভিযান বন্ধের নির্দেশ দেয়। ৮ মে বার্লিনে আত্মসমর্পণের আরেকটি আনুষ্ঠানিক দলিলে স্বাক্ষর করা হয়, যার মধ্য দিয়ে ইউরোপে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অবসান ঘটে।
তবে অক্ষশক্তির আরেক দেশ জাপান তখনও অনমনীয় ছিল। জাপানকে পরাস্ত করতে যুক্তরাষ্ট্র ১৯৪৫ সালের ৬ ও ৯ আগস্ট জাপানের দুই শহরে পারমাণবিক বোমা হামলা চালায়। এই ভয়াবহ হামলার পর ১৫ আগস্ট জাপান আত্মসমর্পণের ঘোষণা দেয় এবং ২ সেপ্টেম্বর আনুষ্ঠানিক আত্মসমর্পণের দলিলে স্বাক্ষর করে।
দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলাকালে ১৯৩৯ থেকে ১৯৪৫ সালের মধ্যে সারা ইউরোপ ধ্বংসস্তূপে পরিণত হয়। হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক অস্ত্রের পরিকল্পিত ব্যবহার ইতিহাসে প্রথমবার ঘটে। যুদ্ধে প্রায় ১১ কোটি নারী ও পুরুষ অস্ত্র হাতে নিয়েছিলেন এবং ৬-৭ কোটি মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হন, যাদের বড় অংশই ছিল সাধারণ মানুষ। শুধু সোভিয়েত ইউনিয়নেই প্রায় ২ কোটি ৫০ লাখ, চীনে প্রায় ১ কোটি ৫০ লাখ, জার্মানিতে ৭০ লাখ এবং পোল্যান্ডে ৬০ লাখ মানুষ নিহত হয়েছিলেন। এই যুদ্ধ গোটা আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে আমূল পাল্টে দিয়েছিল, যার ফলে বিশ্বরাজনীতিতে নতুন মেরুকরণ, জাতিসংঘ প্রতিষ্ঠা এবং পরে স্নায়ুযুদ্ধের সূচনা হয়।

















