দেশের বৈদেশিক মুদ্রার মজুত বা রিজার্ভ উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে বর্তমানে চার মাসের আমদানি ব্যয় মেটানোর মতো রিজার্ভ রয়েছে, যা সাধারণত তিন মাসের গ্রহণযোগ্য মানের চেয়ে বেশি। বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য অনুযায়ী, গতকাল রোববার রিজার্ভের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ৩৬ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন (৩ হাজার ৬৩৯ কোটি) ডলারে। গত ছয় মাসে রিজার্ভ প্রায় ৩ বিলিয়ন ডলার বৃদ্ধি পেয়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংক জানিয়েছে, গত সপ্তাহে রিজার্ভের পরিমাণ সাড়ে ৩৭ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। তবে ১ দশমিক ৩৯ বিলিয়ন ডলারের বিল পরিশোধের কারণে রিজার্ভ কিছুটা কমেছে। এটি মোট মজুতের হিসাব। আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) ঋণের শর্ত অনুযায়ী, মোট রিজার্ভের পাশাপাশি প্রকৃত রিজার্ভের হিসাবও দেওয়া হয়, যা বিপিএম ৬ নামে পরিচিত। এই হিসাবে রিজার্ভের পরিমাণ ৩১ বিলিয়ন ডলারের বেশি (৩ হাজার ৪৭৪ কোটি)।
রাজনৈতিক সরকার দায়িত্ব নেওয়ার পর, অর্থাৎ গত ১৭ ফেব্রুয়ারি বিএনপি সরকার দায়িত্ব গ্রহণের পরও রিজার্ভ বৃদ্ধি পেয়েছে। যথেষ্ট বৈদেশিক মুদ্রা হাতে না থাকলে দেশের খাদ্য, জ্বালানি সহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি ব্যাহত হয়, ডলারের দাম বাড়তে থাকে এবং মূল্যস্ফীতিও বাড়ে। অন্যদিকে, বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে না পারলে দেশ দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকিতে পড়ে, যেমনটি শ্রীলঙ্কার ক্ষেত্রে হয়েছিল।
কয়েক মাস ধরে মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে তেল-গ্যাস ও সারের দাম বেড়েছে। তবে বর্তমানে রিজার্ভে পর্যাপ্ত ডলার থাকায় বাড়তি আমদানি খরচ সামাল দেওয়া যাচ্ছে এবং বিদেশি ঋণ পরিশোধের জন্য ডলারের জোগানও রয়েছে। রিজার্ভ ভালো থাকার অন্যতম কারণ হলো দেড়-দুই বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে এবং রেমিট্যান্স আয় বৃদ্ধি পেয়েছে। ভালো রিজার্ভ থাকার কারণে জ্বালানি পণ্য আমদানিতে বাড়তি তিন-চার বিলিয়ন ডলার খরচ করা সম্ভব হয়েছে এবং বিদেশি ঋণও শোধ করা যাচ্ছে।
তবে কিছু অস্বস্তিও রয়েছে। দেশের বিনিয়োগ পরিস্থিতি অনেকটাই স্থবির এবং বেসরকারি খাতে ঋণপ্রবাহ কম। উদ্যোক্তাদের মধ্যে বিনিয়োগে উৎসাহের অভাবে শিল্পের মূলধনি যন্ত্রপাতি ও কাঁচামাল আমদানির চাহিদাও কম, ফলে ডলার খরচও কম। কিন্তু অর্থনীতি সেভাবে চাঙা হতে পারছে না।
বেসরকারি গবেষণাপ্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর পলিসি ডায়ালগের (সিপিডি) সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, ‘রিজার্ভ ভালো থাকার অন্যতম কারণ হলো দেড়-দুই বছর ধরে বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা সম্ভব হয়েছে। রেমিট্যান্স আয় বেড়েছে। ভালো রিজার্ভ থাকায় জ্বালানি পণ্য আনতে বাড়তি তিন-চার বিলিয়ন ডলার খরচ করতে পেরেছি। বিদেশি ঋণও শোধ করা যাচ্ছে।’
মোস্তাফিজুর রহমানের মতে, যখন আমদানির চাহিদা বাড়বে, তখন রিজার্ভের ওপর চাপ বাড়বে। বিদেশি ঋণ পরিশোধের চাপও বাড়ছে। ২০২৯ সাল নাগাদ প্রায় ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো বিদেশি ঋণ শোধ করতে হবে।
বিদেশি মুদ্রার রিজার্ভ হলো দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের কাছে জমা থাকা বৈদেশিক মুদ্রা ও অন্যান্য বৈদেশিক সম্পদের সঞ্চয়। বাংলাদেশে এই রিজার্ভের প্রধান অংশ ডলার, তবে ইউরো, পাউন্ড, ইয়েন সহ বিভিন্ন বৈদেশিক মুদ্রা ও কিছু সোনাও থাকতে পারে। বাংলাদেশ ব্যাংক এই রিজার্ভ পরিচালনা করে। দেশের রপ্তানি আয়, প্রবাসী আয়, বিদেশি ঋণ ও অনুদান সহ বিভিন্ন উৎস থেকে বৈদেশিক মুদ্রা আসে এবং আমদানি, বিদেশি ঋণ পরিশোধ ও অন্যান্য আন্তর্জাতিক লেনদেনে তা ব্যয় হয়।
২০২১ সালের আগস্ট মাসে রিজার্ভ রেকর্ড ৪৮ বিলিয়ন ডলারে উন্নীত হয়েছিল। তখন করোনা মহামারির কারণে আমদানি চাহিদা কমেছিল এবং প্রবাসীরাও পরিবার-পরিজনকে কোভিডের ধাক্কা সামাল দিতে বেশি ডলার পাঠিয়েছিলেন। আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে রিজার্ভ থেকে বিমান বাংলাদেশ এয়ারলাইনস ও পায়রা বন্দরের রাবনাবাদ চ্যানেলের ড্রেজিং খাতে অর্থ দেওয়া হয়েছিল। এছাড়াও রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল (ইডিএফ) এবং শ্রীলঙ্কাকে দুই কোটি ডলার ঋণ দেওয়া হয়েছিল। আইএমএফ এসব বাদ দিয়ে প্রকৃত রিজার্ভের হিসাব রাখতে বলে, যা বিপিএম ৬ নামে পরিচিত।
২০২২ সালে ইউক্রেন যুদ্ধ এবং বিশ্ববাজারে পণ্যের দাম বেড়ে যাওয়ায় আমদানি খরচ মেটাতে হিমশিম খায় তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার। ডলার-সংকট তৈরি হয় এবং ডলারের দামও বাড়তে থাকে। অব্যবস্থাপনার কারণে ২০২৩ সালে ৮৬ টাকার ডলার ১২৮ টাকায় ওঠে। আমদানির খরচ সামাল দিতে বাংলাদেশ ব্যাংক নিজেদের কাছে থাকা ডলারও বিক্রি করে, ফলে রিজার্ভ কমতে থাকে।
আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের আগে, ২০২৪ সালের আগস্ট মাসে পতনের পূর্বে, ২৫ দশমিক ৯২ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ রেখে গিয়েছিল। সেটি সম্ভব হয়েছিল কঠোর আমদানিনিয়ন্ত্রণ ও দেনা পরিশোধ পিছিয়ে দিয়ে। আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের পর অন্তর্বর্তী সরকার আসার পর ডলার-সংকট ও রিজার্ভ বাড়ানোকে গুরুত্ব দেয় বাংলাদেশ ব্যাংক। বাজার ব্যবস্থার ওপর ডলারের দাম ছেড়ে দেওয়া হয়। পরে প্রবাসী আয় বৈধপথে আসা বৃদ্ধি পায়, ডলারের জোগান বাড়ে এবং রপ্তানি আয়ও বাড়ে। ফলে অন্তর্বর্তী সরকারের ১৮ মাসে রিজার্ভ ৯ বিলিয়ন ডলার বাড়ে। অন্যদিকে সরকার দেনা পরিশোধ শুরু করে এবং আমদানিনিয়ন্ত্রণও কিছুটা কমিয়ে দেওয়া হয়।
বিএনপি সরকার আসার পরও প্রবাসী আয় এবং রপ্তানি আয়প্রবাহের ধারাবাহিকতা অব্যাহত থাকে। ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত টানা ছয় মাস তিন বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রবাসী আয় পাঠান প্রবাসীরা। রপ্তানি আয়েও প্রবৃদ্ধি রয়েছে, ফলে রিজার্ভ আরও বাড়ে। আমদানিতে আগের মতো নিয়ন্ত্রণ রাখেননি নতুন গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান, ফলে আমদানি সহজ হয়েছে এবং পরিমাণে বেড়েছে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র আরিফ হোসেন খান বলেন, ডলারের দাম বাজারভিত্তিক রাখা ও তদারকির ফলে ডলারের বাজার স্থিতিশীল আছে। এখন কেউ ডলার নিয়ে অভিযোগ করছেন না। প্রবাসী আয়ের চাঙাভাব ডলারের জোগান স্বাভাবিক রাখতে সহায়তা করেছে।
রিজার্ভ বৃদ্ধির সবচেয়ে বড় স্বস্তি হলো আমদানি বিল পরিশোধের সক্ষমতা কিছুটা শক্তিশালী হয়েছে। বাংলাদেশকে শিল্পের কাঁচামাল, জ্বালানি, খাদ্যসহ বিভিন্ন পণ্য আমদানি করতে নিয়মিত বিপুল অঙ্কের ডলার ব্যয় করতে হয়। ফলে রিজার্ভ শক্তিশালী থাকলে আমদানি পরিশোধ নিয়ে চাপ কম থাকে।
ইরান যুদ্ধ শুরুর আগে প্রতি ব্যারেল অপরিশোধিত তেলের দাম ছিল ৭০ থেকে ৭৫ ডলার, এখন তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৯৫ ডলারে। ১৪-১৫ ডলারের প্রতি ইউনিট তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাসের (এলএনজি) দাম ২৭-২৮ ডলারে কিনতে হচ্ছে। ফলে একই পরিমাণ জ্বালানি কিনতে সরকারকে অনেক বেশি বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করতে হচ্ছে। গত ২২ আগস্ট ঢাকা চেম্বারের এক অনুষ্ঠানে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী বলেছেন, চলমান মধ্যপ্রাচ্যের সংকটের কারণে সরকারের জ্বালানির বিল পরিশোধে অতিরিক্ত ৪-৫ বিলিয়ন বা ৪০০-৫০০ কোটি ডলার খরচ হয়েছে।
বিশ্লেষকেরা বলছেন, এখন যথেষ্ট রিজার্ভ না থাকলে জ্বালানি কেনা, অন্য পণ্য আমদানি এবং ঋণ পরিশোধ সম্ভব হতো না। বিদেশি ব্যাংকগুলো লেনদেনে নানা শর্ত আরোপ করত। রিজার্ভ আছে বলেই স্বস্তি। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় এখন ডলারের দাম ১২৩–১২৪ টাকার মধ্যে এবং খোলাবাজারে তা ১২৬ টাকার মতো।
রিজার্ভের এই স্বস্তির আড়ালে অর্থনীতির আরেকটি দুর্বল চিত্রও রয়েছে। শুধু সরবরাহ বেশি বলেই ডলার বেঁচে যাচ্ছে, বিষয়টি তা নয়। আমদানি, বিনিয়োগ ও উৎপাদন বাড়ানোর চাহিদাও দুর্বল। অর্থাৎ সমস্যা এখন ডলারের অভাব নয়; বরং অর্থনীতিতে ডলার ব্যবহারের মতো গতি তৈরি না হওয়া। তাই রিজার্ভ বৃদ্ধির খবর যতটা স্বস্তির, ডলারের কম চাহিদার খবর ততটাই ভাবনার। বেসরকারি বিনিয়োগে ভাটা থাকায় মূলধনি যন্ত্রপাতি, কাঁচামাল ও মধ্যবর্তী পণ্য কাঙ্ক্ষিত হারে আমদানি হচ্ছে না। ফলে ডলারের ব্যবহার কম হচ্ছে। এছাড়া চলমান গ্যাস-বিদ্যুতের সংকটের কারণে সামনে নতুন বিনিয়োগ বাড়বে, আমদানি চাহিদা বাড়বে—তাতেও অনিশ্চয়তা আছে।
সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো মোস্তাফিজুর রহমান চারটি বিষয়ের প্রতি নজর দেওয়ার পরামর্শ দেন। এগুলো হলো বিনিময় হার স্থিতিশীল রাখা, বিদেশি ঋণ শোধের চাপ সামাল দেওয়া, বিনিয়োগ চাঙা হলে আমদানি সক্ষমতা ধরে রাখা এবং আন্তর্জাতিক বাজারে জিনিসপত্রের দাম বাড়লে আমদানির চাপ সামাল দেওয়া।
বাংলাদেশ ব্যাংকের তথ্য-উপাত্ত বলছে, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে মূলধনি যন্ত্রপাতি আমদানির ঋণপত্র নিষ্পত্তি আগের বছরের তুলনায় সাড়ে ১০ শতাংশ কমেছে। মধ্যবর্তী পণ্যের আমদানি সাড়ে ৬ শতাংশ কমেছে। আর শিল্পের কাঁচামাল আমদানি কমেছে ৩ দশমিক ৩৩ শতাংশ। অর্থনীতিবিদ ও বাণিজ্য বিশ্লেষকদের মতে, স্বস্তিকর রিজার্ভ যেমন দরকার, তেমনি দরকার প্রয়োজনীয় পণ্য আমদানি।

















