প্রকাশ : ১২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১৩: ৫৮
২০১০ সালের ৫ সেপ্টেম্বর ৬৭ বছর বয়সে সব্যসাচী লেখক আবদুল মান্নান সৈয়দ পরপারের পথে পাড়ি জমিয়েছেন। তার এই অকাল প্রস্থান বাংলা সাহিত্যের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। হৃদরোগে আক্রান্ত হওয়ার পরও জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত তিনি সৃজনশীলতার চর্চায় নিমগ্ন ছিলেন। নতুন ধারার প্রবন্ধ ও পত্রাবলি রচনার মাধ্যমে তিনি বাংলা সাহিত্যে এক নতুন জানালা উন্মোচন করছিলেন, যা তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে আকস্মিকভাবে রুদ্ধ হয়ে গেল। ষাট দশকের অনেক শক্তিশালী লেখকের প্রয়াণের পর মান্নান সৈয়দই ছিলেন আমাদের আশার বড় অবলম্বন।
তার গল্প ও উপন্যাসের সাফল্য নিয়ে বিতর্ক থাকলেও, প্রথাবিরোধী লেখক হিসেবে তাকে অনেক সময় বামপন্থী সমালোচকদের তীব্র আক্রমণের শিকার হতে হয়েছে। তবে এসব প্রতিকূলতা সত্ত্বেও তিনি নিজের লেখনী থামাননি। শুরুর দিকে প্রকাশক না পাওয়ায় নিজের অর্থ ব্যয় করে বই প্রকাশ করতে গিয়ে তিনি আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়েছেন, কিন্তু জীবনের শেষ কয়েক বছরে তিনি সব সম্পাদকের কাছেই একজন চাহিদাসম্পন্ন লেখক হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পেরেছিলেন।
আবদুল মান্নান সৈয়দকে স্মরণের অন্যতম প্রধান কারণ হলো বাংলা কবিতায় তার প্রবর্তিত নতুন রীতি। জীবনানন্দ দাশের ওপর ব্যাপক গবেষণার ফলে তার কবিতায় জীবনানন্দের প্রভাব থাকলেও, তাকে বাংলা সাহিত্যের প্রথম পরাবাস্তব কবি হিসেবে গণ্য করা হয়। তিনি নিজে সচেতনভাবে পরাবাস্তবতার চর্চা করেছেন এবং ‘পরাবাস্তব কবিতা’ নামে কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করে সমালোচকদের বিস্মিত করেছেন। জীবনের শেষ দিকে তার কবিতার গদ্যধর্মী হয়ে ওঠা এক নতুন পরীক্ষা-নিরীক্ষা ছিল কি না, তা জানার আগেই তিনি বিদায় নিলেন।
তার গদ্যের ভাণ্ডার ছিল বিশাল এবং বৈচিত্র্যময়। বুদ্ধদেব বসুর মতো শক্তিশালী গদ্যলেখকের সাথে তার তুলনা চলে। জীবনানন্দ দাশ, মানিক বন্দ্যোপাধ্যায়, কাজী নজরুল ইসলাম, বিষ্ণু দে এবং ফররুখ আহমদের মতো বিপরীতমুখী ঘরানার লেখকদের নিয়ে তিনি অসাধারণ বিশ্লেষণধর্মী প্রবন্ধ লিখেছেন। বিশেষ করে ‘শুদ্ধতম কবি’ গ্রন্থটি তাকে জীবনানন্দ গবেষক হিসেবে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের মতে, অধ্যাপক হওয়া সত্ত্বেও তার আলোচনা ছিল প্রথাগত শিক্ষকের চেয়ে অনেক বেশি গভীর ও বিশ্লেষণধর্মী।
বিষ্ণু দের জন্মশতবার্ষিকীর অনুষ্ঠান উদ্বোধনের জন্য তাকে কলকাতায় আমন্ত্রণ জানানো হয়েছিল, যা তার গ্রহণযোগ্যতার প্রমাণ দেয়। এছাড়াও সৈয়দ ওয়ালীউল্লাহর ওপর তার প্রবন্ধগ্রন্থ এবং ‘বিবেচনা-পুনর্বিবেচনা’য় সংকলিত গ্রন্থ আলোচনাগুলো তরুণ লেখকদের জন্য আজও শিক্ষণীয়। কথাসাহিত্যের ক্ষেত্রে ‘পোড়ামাটির কাজ’ ও ‘অ-তে অজাগর’ উপন্যাসের জন্য তিনি প্রশংসিত হয়েছিলেন। সব মিলিয়ে, তার প্রবন্ধ ও সাহিত্য সমালোচনার বিশাল ভাণ্ডার বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে তাকে দীর্ঘকাল স্মরণীয় করে রাখবে।

















